‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই!’ দীর্ঘকায় বাঙালী রায় বাবুর ‘হীরক রাজার দেশে’কে এখন পর্যন্ত দেখা সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করি। দেখেছিও তাই অসংখ্যবার। সুযোগ করে দেখি এখনো বারবার।
১৯৭৮/৭৯ সনের দিকে দেখেছিলাম প্রথম সিনেমাটি, বি টি ভি র সৌজন্যে। সেসময় স্কুলের শেষ দিকের ছাত্র আমার, বড়ই মনে ধরেছিল সংলাপটি। ওটাই হয়ে উঠেছিল পড়াশোনা ফাঁকি দেবার যাদুকরী মন্ত্র!
এরপর কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়ে টের পেয়েছি যখন, ফাঁকিবাজি করেও মোটামুটি ওজনের সার্টিফিকেট যা করেছি অর্জন, কোনই কাজে আসছে না সেসব। তাতে ঐ বাণীর যথার্থতা হয়েছিল প্রমাণিত ফের। কপাল বড়ই ভাল যে, একইসাথে এও বুঝেছিলাম, জীবনের ইঁদুরদৌড়ে জিততে হলে, না জানলে কোনই উপায় নাই! সেই থেকে আছি তাই নিরন্তর জানার চেষ্টায়। ‘আমি যাই বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে’ প্রবাদটি সপ্রমাণ করে, এই মরুতে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ভ্যাক্সিন ব্যবসার দায়িত্ব কাঁধে চাপার পর প্রতিদিনই বুঝতে ও জানতে শুরু করেছি, কী ধুন্দুমার কাণ্ডই না ঘটে হজ উপলক্ষে; সৌদি স্বাস্থ্যবিভাগে। প্রতিবছর! কাগজেকলমে হজের প্রস্তুতি শুরু হবার কথা, ঐ বছরের হজ শেষ হবার পর পরই। কিন্তু ভাবেসাবে মনে হচ্ছে কার্যত তারা নড়াচড়া শুরু করে রোজারঈদের পর থেকেই। অতএব দম ফেলার ফুসরত নাই এখন তাদের। তদুপরি রাঙাচ্ছে চোখ এবার শুওর ফ্লু মানে সোয়াইন ফ্লু! বেশ কিছুকাল ধরেই মিডিয়ায়, ডব্লিউএইচও সহ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানান প্রতিষ্ঠান যে এ বিষয়ে নানান মাত্রার সতর্কতা জারী করে আসছিল, দেখেছি তা। এক্কেবারেই দেইনি পাত্তা তাও। প্রথমত, আমাদের দেশে ফ্লু কে তো আমরা তিনদিনের জ্বর ধরে নিয়ে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকি। তদুপরি পবিত্র দেশ সৌদিতে শুওরেরতো প্রবেশাধিকারই নাই। ভেবেছি তাই, নো চিন্তা! তবে অচিরেই পড়েছিল মনে সৌদিদের তো অবাধ যাতায়াত ঐসব দেশে, যেখানে পর্ক খাওয়া সহ আর সব ইসলামনিষিদ্ধ কর্ম চলে অবাধে। ভাইরাস তো জাত, পাত, ধর্ম কিছুই মানে না। নাস্তিক ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস পবিত্র অপবিত্র স্থানের বাছবিচারও করে না। উপরন্তু গেল মাসেই ঐ ভাইরাস আক্রান্ত একজনের খোঁজ পাওয়া গেছে এখানে। হজ উপলক্ষে টনক নড়েছে বেজায় তাই সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের। এসব শুনলে আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিক ওয়াজিয়ানরা নিশ্চয় বলবে, এসবই ইহুদি নাসারা কাফেরদের ভাওতা। তা যদি হয়ও, কী আছে করার? খোদ ইবনে সিনাকেই তো গবেষণা শিকেয় তুলে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালাতে হয়েছিল! সে যাক স্বাস্থ্যবিভাগ ঐ শুওর ভাইরাসটি পবিত্রভূমিতে আনার দায় চাপিয়েছে, ফিলিপিনো এক নার্সের ঘাড়ে।রিয়াদের এক হাসপাতালে কর্মরত বেচারি গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে গিয়েছিল দেশে। ফেরার সময় নাকি বয়ে এনেছে সে ঐটিকে!
ডব্লিউএইচও আর নানান বিশ্বখ্যাত কাফের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নাকি কুপরামর্শ মোতাবেক, বিশেষ ধরনের প্যানডেমিক মোকাবেলার জন্য শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এখন। হজ ব্যাপারটিকে এ মূর্খ, নিতান্তই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিষয় বলেই ধরে নিয়েছিলাম। সিন্দাবাদের দৈত্যের মতোই আচমকা ভ্যাক্সিন দায় কাঁধে চেপে বসায়, হয়েছে নতুন বোধোদয়! বিশ্বের নানান কোন থেকে মক্কামুখি যে ঢল নামে মুসলিমদের এসময়, তাতে আদতে স্বরাষ্ট্র, পর্যটন, স্বাস্থ্য, বিমান, সড়ক যোগাযোগ, টেলিকমিউনেকশন সহ প্রায় প্রত্যেক বিভাগ, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়েই শুরু হয় হুলস্থুল তোগলঘি কাণ্ড! প্যানডেমিক মোকাবেলার নিমিত্তে, বেশ কিছু ভিসা রেস্ট্রিকশন ঘোষণা করেছে সৌদি ইমিগ্রেশন এরই মধ্যে। ১২ বছরের নীচের আর ৬৫ বছরের বেশী কাউকে হজ ভিসা দেয়া হবে না এবার। পড়েছেন ভিসা খড়গের নীচে গর্ভবতী নারীরাও! উপরন্তু বাড়তি সতর্কতা হিসাবে, বিশেষত জেদ্দা এয়ারপোর্টে প্রতিটি হাজীর তাপমাত্রা মাপার ও প্রয়োজনে শুওর ভাইরাসে সম্ভাব্য আক্রান্তকে তাৎক্ষণিক কোয়ারেন্টাইন করার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা নিয়ে ব্যস্ত স্বাস্থ্যবিভাগ। পাশাপাশি নিশ্চিত করছে ভাইরাস নিরোধক ঔষধের বিপুল মজুদ! কোন এন্টিভাইরাল নাই আমাদের। কিন্তু সদ্য আবিষ্কৃত আমাদের একটা ভ্যাক্সিন সোয়াইন ফ্লু নিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে, প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তড়িঘড়ি দাঁড়াতে হয়েছে আমাকেও ১০০ মিটার স্প্রিন্টে।
নাহরাওয়ির সহযোগিতায় মেনিনজাইটিস ভ্যাক্সিন টেন্ডার জিতে যেই না একটু, হাঁফ ছাড়ব ভাবছিলাম, হলো না আর তা। দৌড় শুরুর লাইনে দাঁড়িয়েই পেয়েছি টের, ঐতিহাসিকভাবে এ ব্যবসায়ে গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইন চ্যাম্পিয়ন। নাহরাওয়ির মতো টেন্ডার ব্যবসার ঝানু পাণ্ডার সহায়তা পাওয়ার পরও মনে হচ্ছে, আছি জলবিরল এই ম্রুতেও সখাত সলিলে। আশান্বিত হওয়ার মতো অগ্রগতি হয়নি কোন। ঐদিকে ছুটছে সময় পাগলা আরবি ঘোড়ার গতিতে।
আসলে ভ্যাক্সিন উৎপাদন একটি উচ্চপ্রাযুক্তিক নাজুক বিষয়। ফলে মোটামুটি নিশ্চিত অর্ডারের ভিত্তিতেই বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলো ঐ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করে। একবার সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে, তারপর কোন দেশ বা সংস্থা ঐ ভ্যাক্সিনের জন্য মাথা কুটেও মরে যদি, লাভ হয় না কোন! সপ্তাহখানেক অবিরল দৌড়ঝাপ করেও, কোন চাহিদাপত্র বের করতে পারেনি নাহরাওয়ি। স্বভাবতই কিঞ্চিৎ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ! চাহিদাপত্রের যে ডেডলাইন দিয়েছে হেডকোয়ার্টার, তা থেকে আছে হাতে, মেরে কেটে সাতদিন। বেঁধেছি বুক তারপরেও অলিক আশায়! দেখি না ছিঁড়ে কি না কপালে শিকা। এদিকে, ভ্যাক্সিন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে, বিশেষত ঐ প্যানডেমিক মোকাবেলার হুলস্থুল দৌড়ঝাঁপ দেখে, একটা প্রশ্ন মারছিল ঘাই অবিরল নিউরনে। তা হল
আমাদের বিশ্বখ্যাত ও সৌদিতে জনপ্রিয় ব্যথার যে ঔষধ আছে, সেটি নিয়ে এসময়ে আমার কিছু করছি না কেন? আগেই বা কেন এ নিয়ে হজ মৌসুমে মক্কায়, মদিনা এবং জেদ্দায়, কিছু করা হয়নি? প্রচুর বয়স্ক লোকও তো আসেন হজে। বয়সের কারনে নানান ধরনের ব্যথা বেদনা হল যাদের নিত্যসঙ্গী। উপরন্তু হুড়োহুড়ি করে হজের নানান কর্তব্য পালন করতে গিয়েও অনেকেই হন আঘাতপ্রাপ্ত। এমতাবস্থায় মক্কায় হারেম শরিফের আশেপাশে, মদিনায় মজসিদে নববির কাছে ধারে এবং জেদ্দার এয়ারপোর্টে, তিনটা অস্থায়ি পেইন ক্লিনিক মানে ব্যথা নিরাময়কেন্দ্র জাতীয় কিছু যদি বসাই, তাতে তো হাজীদের উপকার হয়! আইডিয়াটির বুদবুদ উঠতেই, সংশ্লিষ্ট প্রোডাক্ট ম্যানেজার মোহামেদ হাশিশকে বলেছিলাম ডেকে।
হা হতোম্মি! আচমকা মাথায় ঝিলিক মারা ঐ আইডিয়াটির টগবগ উত্তজেনায় হাশিশ দিয়েছিল ঢেলে নিমিষেই বরফশীতল জল, এক বোতল। নতুন কিছু করার বদলে প্রথাগত কাজে নিবেদিতপ্রাণ হাশিশ, ঘ্যানঘ্যান জুড়েছিল এমন সব বিষয়ে, যেগুলো এরই মধ্যে আমি বন্ধ করে দিয়েছি। যার অন্যতম হল, প্রথমত চিকিৎসকদের মাঝে বেহুদা গিফট বিতরণ। দ্বিতীয়ত সায়েন্টিফিক সেমিনারের ছদ্মবেশে ওমরাহ কাফেলা নিয়ে মক্কা মদিনাগমন।
বাধ্য হয়েই তাই কঠোরভাবে বলতে হয়েছে, যা বলেছি তা হল তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রজেক্ট। বছর শেষের পারফর্মেন্স ইভালুয়েশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে তার, এটিই। ইনোভেশনের জন্য যে কোম্পানির জগতজোড়া নাম, তাতে সবাইকেই যার যার কাজে নতুন কিছু করার মতো উদ্ভাবনী স্পিরিট নিয়েই এগুতে হবে। নাহ, কাজের চাপে, হাশিশের খোঁজ নিতে পারিনি এ ক’দিন। দেখি, যাই; উঁকি দেই তার রুমে। চলবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।












