“হ্যালো স্যার, সালামালাইকুম। আমি শেফালি। একটু আগে নতুন এই ফোণটা পাইছি । এখন থাইক্কা এই নম্বরে ফোন কইরেন। না থাক আমিই করুম ফোন আফনেরে। সময় সুযোগ কইরা। আপনের নম্বরটা ওরা জাইনা গেছে। ওরা ফোন দিলে ধইরেন না। ধরলেও হেতাগরে কিছু কইয়েন না। রাইখলাম স্যার।”
একটানা কথাগুলো শোনার পর উত্তরে কিছু বলার আগেই কেটে গেল ফোন। এদিকে ওপাশের নারীকণ্ঠটি মধ্যযামিনীর নির্জনতায় বউয়ের কর্ণগোচর হওয়াটা খুবই সম্ভব! আপন প্রাণরক্ষার তীব্র তাগিদে দ্রুত বললাম তাই, হায়রে এই তো হইল পুরুষজীবন! বাসেত আলীর লাশ কি ভূমধ্যসাগরের হাঙ্গরের পেটেই গেছে, নাকি ওটা পচে গলে মিশে গেছে সাগরের নোনা জলে, তা নিয়ে কারোই কোন মাথা ব্যথা নাই। বাসেত আলীর কিছু রেখে গেছে কি না, তার দখল নিয়েই ব্যস্ত সবাই।
‘কে ফোন করছিল সেটা বলো? এইরাতে মারফতি কথা বাদ দেও।’ শেফালি বেগম ফোন করছিল। মৃত বাসেত আলীর স্ত্রী। রিয়াদ থেকে আসার পর, তোমার গহনা, সাবিনা ভাবীর স্বর্ণের বারের সাথে একটা স্বর্ণের চেইন আর এক জোড়া কানের দুল তোমাকে দিয়ে বলেছিলাম না যে ঐগুলো একজনকে পৌঁছাইতে হবে, এই হল সেই।
“হ্যাঁ আছে তো ওইগুলি। বাড়ি কোথায় এর? এতো রাতে ফোন করার মানে কী?” বাড়ি তো জানি ফেনী। বেচারি আছে মনে হচ্ছে বেশ ঝমেলায়। সেইজন্যই এক্কেবারে ফোনই নাকি পাল্টাইয়া ফেলছে। এদিকে তার দেবর ভাসুর, নাকি আমার ফোন নম্বর জেনে গেছে। হুম, ভালই যন্ত্রণা পড়তে যাচ্ছি তাহলে!
‘আসলাম মাত্র কয়দিনের জন্য, সাথে আবার কী যন্ত্রণা নিয়ে আসছ? ফেনি যাওয়ার চিন্তা করতেছ নাকি? ওটা হবে না। কেন যে এইসব ফালতু যন্ত্রণা নিয়া আসো, বুঝি না। আসারই দরকার কী তাইলে?’ না না অবশ্যই ফেনি যাবো না। ঘটনা তো পুরা বলার সময় পাই, নাই। শোনই না আগে। তারপর বইলো, ঠিক করলাম? নাকি ভুল? আসার আগের দিনই ঐ চেইনটা, দুল জোড়া আর পাঁচশ ডলার, আমাদের কানাডিয়ান পাকিস্তানি সিএফও আমিন ইব্রাহিম আমাকে দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন, আমি যাতে ওগুলো শেফালি বেগমের কাছে পৌঁছে দেই।
‘তার মানে কী? আমিন ইব্রাহিমের সাথে ফেনির শেফালির কী সম্পর্ক?’ কোনই সম্পর্ক নাই, আবার আছেও। আমিনের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে সে অনেকবারই বলেছে বাংলা সে, ভালই বোঝে। বাঙালী খাবারও সে খেয়েছে অনেক। পছন্দও করে। শুনে, প্রতিবারই জিজ্ঞেস করেছি, সেটা কিভাবে? উত্তরে বলেছে সে, কাহিনী বেশ বড়। সময় নিয়ে বলতে হবে। অতঃপর সে সময় হয়েছে তার এবার আমার ঢাকার ফ্লাইট ধরার দুই দিন আগে। সেদি ঐ ডলার আর গহনাগুলো দিতে দিতে বলেছে ঐ কাহিনী । রিয়াদে আসার আগে, আমিন আমাদের কায়রো অফিসে কাজ করেছে তিনবছর। ওখানে নাকি, তার বাসায় কেয়ারটেকার কাম বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতো ফেনির বাসেত আলী! খুবই ভাল আর কাজের লোক নাকি ছিল বাসেত। খুবই পছন্দ করতো আমিন তাকে। কিন্তু বছর খানেকের বেশী কাজ করার পর, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ একদিন নাকি, বাসেত মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। নাহ, কোন কিছুই চুরি টুরি করে নাই। বরং তার নিজের বেশীরভাগ জিনিসই রেখে গেছে আমিনের বাসায়, তার রুমে। যার মধ্যে ছিল ঐ সোনার কানের দুল জোড়া, আর চেইনটা।
এভাবে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ায়, বাসেতের উপর রাগ হলেও, তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায়নি আমিন। শুধু পুলিশকে জানিয়ে রেখেছিল তার নিখোঁজ সংবাদ। কারণ কোন ক্ষতি তো করে নাই। বরং আমিনের বিশ্বাস ছিল যে, বাসেত ঐ সোনার চেইন, কানের দুল আর তার জিনিসপত্র নিতে ফিরে আসবে কোনদিন নিশ্চয়!
তারপর এই মাস সাত কি আট আগে শেফালি ফোন করে আমিনকে জানায় যে, বাসেতের ইতালি যাওয়ার পথে সমুদ্রে ডুবে হারিয়ে গেছে চিরতরে। বছর চারেক আগে সে নাকি দেশ থেকে বেড়িয়েছিল ইতালির উদ্দেশ্যে। অথচ হায়! আদমব্যাপারিদের কারাসজিতে পৌঁছেছে সে কায়রোতে। কিন্তু অদম্য যুবক, সুয়েজ খালে কিম্বা নীলনদের জলে তার স্বপ্নের, জলাঞ্জলি দিতে মোটেও রাজী নয়। আমিনের বাসা সহ বছর দুয়েক কায়রো তে কাজ করতে করতে ছিল সে তক্কে তক্কে। এর মধ্যে কায়রোর কারা যেন তাকে ইতালি পাঠিয়ে দেবে বলেছিল। সে জন্য টাকার নেওয়ার সাথে শর্ত দিয়েছিল ওরা, এ নিয়ে মুখ খোলা যাবে না। আর সাথেও খুব কিছু নেয়া যাবে না। তাই সে চুপচাপ এককাপড়ে হয়েছিল উধাও। এদিকে ইতালির কথা বলে কায়রোর আদম ব্যাপারিরা তাকে পাঠিয়েছিল আসলে প্রথমে লিবিয়ায়।মাস তিনেক ওখানে দুঃখ কষ্টে কাটানোর পর, একসময় ছোট্ট একটা নৌকায় আরো অনেকের সাথে করেছিল সে তার স্বপ্নযাত্রা ।
নাহ, দুপুরের খাওয়া শেষে সংক্ষিপ্ত একটা ভাতঘুমের জন্যই ড্রয়িংরুমের সোফায় শুয়ে টানছিলাম সিগারেট। কিন্তু মিলেনি দেখা ঘুমের। অতএব নানান কিসিমের জাবর কাটতে কাটতে হল শৈশবও ভ্রমণ। চার টা প্রায় বাজে বাজে। এখন বরং গিয়ে চা বানাই। তারপর রোদের তেজ আরেকটু কমলে সাঁতরাবো কাম্পাউন্ডের সুইমিংপুলে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।











