অবিরল গড়াচ্ছে জল, আপেলগোলাপি গালে। নাহ কোনরকম শব্দ করছে না। ফোঁপাচ্ছেও না। দাঁড়িয়ে আছে স্থির সাড়ে তিন বা চার বছরের ফুটফুটে বাচ্চাটি, চারপাশে ঝুলতে থাকা পোশাকের মাঝে। একটা কোণে। পরিষ্কার আতঙ্কের আভাস চেহারায়, দেহভঙ্গিতে! নাই তো কেউ আশেপাশে!
দ্রুত এগিয়ে সামনে হাঁটু গেড়ে বসে জিজ্ঞেস করি, হয়েছে কী তোমার বাবু? কোন দেশের বাচ্চা যে, তা তো বুঝতে পারছি না। জানালে তা, বলতে যে পারবো তার ভাষা, তাও তো নিশ্চিত নই। দু তিন বার আদুরে ভঙ্গিতে ইংরেজিতেই জিজ্ঞেস করার পর, কথা আমার বুঝুক না বুঝুক, মনে হলে অর্জন করতে পেরেছি আস্থা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে কি যে বলল? তার সব না বুঝলেও, বুঝলাম শুধু ‘মাম্মি।’
ঠিক আছে আসো। দেখি খুঁজে মাম্মিকে, বলতে বলতে, কোলে তুলে নিতে গিয়েও তুললাম না। বিদেশে অবশ্য পালনিয় বিশেষ সাবধানতা হিসেবে। কোমলভাবে হাত ধরে চারদিকে ঝুলতে থাকা পোশাকের আড়াল থেকে বেরিয়ে দাঁড়ালাম দুজনে, মামলাকা টাওয়ারস্থ মার্কস স্পেন্সারের সুবিশাল স্টোরের নানান সেকশনের মাঝে যে সব হাঁটা পথ আছে, তারই একটাতে।
আগেও বলেছি রোজায় রিয়াদ জেগে উঠে ইফতারের পরই। তুমুল সরগরম হয় তখনি সকল রাস্তা, শপিং মল এমনকি খেলার মাঠও। এসময়ে, তাই বিচিত্র বণের্র লতাগুল্ম শোভিত বিশাল মরূদ্যানের মতো বুক চিতিয়ে থাকা স্টোরটি করছে খাঁ খাঁ ই। তারপরেও, যে দু তিন জন মহিলা এলেন দৃষ্টির গোচরে, তাদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, জিজ্ঞেস করলাম, ইজ দ্যাট ইউর মাম্মি ?
উত্তরে, তার ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি অনুবাদ করে বুঝলাম, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন বাচ্চাটি। হ্যাঁ বা না; বলছে না সে কোনটাই। বলবেই বা কী করে? বোঝার তো উপায়ই নাই, আপাদমস্তক কালো বোরকার মোড়ানো কোনজন তার মা?
করলাম ভুল তবুও। ডানে দিকের পোশাকগুলোর মাঝে, একজনের উপস্থিতি টের পেয়ে, ঐদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। তাতে মোহতারেমার ঝট ঘুরে যাওয়ার ভঙ্গিতে প্রকাশিত হল তুমুল বিরক্তি! একইসাথে কপালের নীচের বোরকার সামান্য ফাঁক গলে বর্ষিত হল অগ্নিদৃষ্টি। গেলাম ঘাবড়ে! সমস্যা কী? আশেপাশে নজর বোলাতেই দেখি, আছি দাঁড়িয়ে মেয়েদের অন্তর্বাস সেকশনের কাছে! এটাই কি তবে জনাবার ঐ বিরক্তির কারণ? নাকি মনে করেছেন উনি, এ অধমই হলাম শিশুচোর! হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল শিরদাড়া বেয়ে। ঐ নারী কি তবে আমার নামে অভিযোগ করার জন্যই এগুচ্ছেন নাকি স্টোরের কাস্টমারকেয়ারে? হন্তদন্ত হয়ে এগুতে এগুতে ভাবি, নাহ তার আগেই হতে হবে হাজির কোন না কোন কাউন্টারে। আসলেই বেকুবের হদ্দ বেকুব আমি। বাচ্চা হারিয়ে ফেলা মা কী এরকম নিশ্চিন্তে ঘুরবেন নাকি? দেখালাম আমি যাদের ছিলেন তো তাঁরা বড়ই নিশ্চিন্ত। কে জানে স্টোরের কোন অংশে, পাগলিনী মা খুঁজছেন তার বুকের ধনকে? নাহ, তার মুখোমুখিও হওয়া যাবে না। কেলো ভূতো চেহারার এই অধমের হাতে ধরা বাচ্চাকে দেখে, আহত বাঘিনীর যাবতীয় ক্রোধ তো পড়তে পারে আমারই উপর ঝাঁপিয়ে। বাচ্চাটাই বা যে কী বলে? তারও তো নাই ঠিক ঠিকানা! বাঙ্গালীর যা ইমেজ এখানে তাতে এই কেস্টাকেই চোর সাব্যস্ত করাই স্বাভাবিক!
ঘাম দিয়ে ছাড়লো জ্বর। একটু এগিয়ে ডানে বাঁয়ে তাকাতেই, বাঁয়ে মিলল দেখা কাউন্টারের। ফিলিপিনো ক্যাশিয়ারের কাছে দ্রুত বাচ্চাটিকে সপে দিয়ে, খুঁজতে শুরু করলাম মার্কসস্পেন্সারের পুরুষ সেকশন। আগে একবারই এসেছিলাম। এরই মধ্যে ঈদের কারনে সেজেছে স্টোর নতুন সাজে। তদুপরি সময়ে সময়ে এরা অবস্থান বদলায় নানান সেকশনের। উপরন্তু হলাম তো নিজে, দিককানা । এই সবমিলিয়ে পাচ্ছি না খুঁজে, ৮০/৯০ ভাগ নারী সামগ্রীর মাঝে কোথায় কোনঠাঁসা হয়ে আছে এর পুরুষঅংশটি।
সৌদি আরব তো ট্যাক্স ফ্রি। বড় আশা করে এসেছিলাম প্রথমবার, এইভেবে যে এদেরই সিঙ্গাপুর স্টোরে বছর খানেক আগে পছন্দ হলেও দামের কারনে কিনিনি যা, কিনবো সেগুলোই ঢের ঢের কম দামে। কিন্তু হা হতোম্মি। ট্যাক্স ফ্রি সৌদিতে দেখলাম, দামে কোনই ছাড় নাই। রাগ হয়েছিল তাতে বড়ই। লক লক করছিল বিট্টিশ বেনিয়াদের লোভের জিহ্বাটি, চোখের সামনে।
সাথে সাথেই সেসময় অবশ্য ভেতরের পেশাদারটিও জেগে উঠেছিল। বলেছিল, আরে বোঝ না কেন? আজকালকার তুমুল দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশ্বে, এ গ্রহের যে কোন কোনেই, একই পণ্যের দামে বড় রকমের হের ফের হলে, যাবে সবই কালবাজারিদের পেটে। ভোক্তার কপালে থাকবে যেই লাউ, সেই কদুই। এমনিতেই তো আছে ভোক্তা নকলের ফাঁদে।
তারপরও, মানে মাসখানেক আগে প্রথম এসেছিলাম যেদিন, জামাকাপড় না কিনে কিনেছিলাম হালাল পারফিউম, শেভিংলোশন এখান থেকে সেদিন। এলকোহলের ছোঁয়া আছে এমন কোন পণ্য ব্যাগে থাকলে, পড়তে পারি এয়ারপোর্টে কাস্টমসের খড়গের নীচে, এই ভয়ে নিত্যব্যবহার্য ঐসব তো ফেলে এসেছিলাম দেশে। এ বিষয়ে শুরুতেই ফিল সতর্ক করেছিল, সৌদিতে বেড়াতে আসা তাঁর স্ত্রীর এক অভিজ্ঞতার গল্প বলে।
কোম্পানির বাসেল হেডকোয়ার্টারে কর্মরত তাঁর স্ত্রী, সৌদিতে স্বামীর সাথে ছুটি কাটাতে আসছিলেন সেবার প্রথম। স্যুটকেসে ছিল ওনার পছন্দের সুইস ভিনেগার। পড়েছিলেন তাতেই কাস্টমস ঝঞ্ঝাটে। সমস্যা, ঐ ভিনেগারের ব্র্যান্ড নামের মধ্যে থাকা ওয়াইন শব্দটি!
নিশ্চিত ছিলেন বস, সাদা চামড়া আর পাসপোর্টের কারণেই পড়বে না হাতকড়া, তাদের হাতে। উপরন্তু হলেন তো উনি, চ্যালেঞ্জই যদি না থাকলো, তাহলে মজার আর থাকলোটা কী? মার্কা চ্যালেঞ্জ খুঁজে বেড়ানো লোক। অতএব যতই কাস্টমস জিজ্ঞেস করে, কেন ওয়াইন আনা হল এই পবিত্রভূমিতে?
হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছেন, ‘আরে বাবা বিশ্বাস না হয়, খেয়েই দেখো না। না হয় পাঠাও ওটা রসায়নাগারে। তবে যাই করো, বোতলের বাকিটা কিন্তু ফেরত চাই। এই ভিনেগার না থাকলে, বউ আমার উপোষ থাকবে তোমাদের মরুতে। এটা মনে রেখো!’ এরপর ঘণ্টা দেড়েক ধরে কাস্টমস দুজনেরই ব্যাগের যাবতীয় জিনিষ পই পই করে পরীক্ষা করে, ঐ বোতলটি আসলেই পরীক্ষাগারে পাঠানোর জন্য রেখে দিয়েই দিয়েছিল ছাড়পত্র দু’জনকে।
যাক, পেলাম অবশেষে বিশাল এই নারিস্থানের এককোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষঅংশটি। আনন্দের বিষয় হল, ৮/৯ মাস আগে সিঙ্গাপুরের স্টোরে যে শার্ট, ট্রাউজার আর পলো শার্ট ধরেছিল মনে সে গুলোতেই দিয়েছে দেখছি বিশাল মুল্য ছাড়! দেবেই তো। ঈদ উপলক্ষেতো এসেছে নতুন চালান। এরই মধ্যে ফ্যাশন বদলে শার্টের কলার হয়েছে কিছুটা ছোট। প্যান্টের ঘেরও হয়েছে সামান্য চাপা। কবি সুকান্ত তো বলেছেনই -‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’।
আমার আর কী? দাম কম হলেই খুশি। কে যাচ্ছে মাপতে স্লাইড ক্যালিপার্স নিয়ে কলারের দৈর্ঘ বা প্যান্টের ঘের। মার্কস স্পেন্সার মার্কাই গুরুত্বপূর্ণ। কিনছিও খোদ তাদেরই স্টোর থেকে। অতএব দ্রুতই, অনেক দিন পর নিজের জন্য নিজেই রিয়াদে ঈদ শপিং করে বেরুলাম রাস্তায়, ঘরে ফিরে ইফতার ধরার উদ্দেশ্যে। (চলবে)
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।













