দূরের দুরবিনে

আশা জাগানিয়া হারমোনিয়াম

অজয় দাশগুপ্ত | সোমবার , ১৭ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:১০ পূর্বাহ্ণ

ঘটনাটা এ রকম: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ কনসার্টে গান গাওয়ার সময় দর্শকসারি থেকে ছুড়ে মারা হয় পানির বোতল। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলেও সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আর্ক ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হাসান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, মঞ্চে গান পরিবেশনার মাঝেই দর্শকসারি থেকেই মঞ্চের দিকে বোতল ছুড়ে মারা হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে শুরু হয় নানা আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া।তবে বিষয়টি বড় করে দেখেননি হাসান। নিজের শান্ত প্রতিক্রিয়ায় হাসান বলেন, ‘আমি কিছুই মনে করি নাই, হয়তো কেউ ভুল করে ফেলছে! ভবিষ্যতে আর কারো ওপর যেন এ রকম না হয় এই কামনা রইলো।’

এ ঘটনার পর দেশের সংগীতাঙ্গনের অনেক শিল্পী ও তারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে মতামত জানিয়েছেন। তারা কনসার্টে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এবং এ ধরনের আচরণকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। তাদের অনেকেই বলেন, মতের অমিল বা ব্যক্তিগত অপছন্দ থাকতেই পারে, কিন্তু কোনো শিল্পীর প্রতি এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হঠাৎ করে আমাদের দেশের তারুণ্য বেশ অস্থির আর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে এই অধৈর্য ক্রমেই এক ধরনের অসুস্থতার জন্ম দিচ্ছে। কেন এই প্রবণতা? আগে আমরা যদি সমাজের পরিবর্তন ও নতুন ধারার দিকে চোখ রাখি দেখব, মানুষ ক্রমাগতভাবে অস্থিরতার শিকার হচ্ছে। এই অস্থিরতার নানাবিধ কারণ আছে। বাজার দর, বন্যার মতো পানির ঢল, যানজট বেকারত্ব সব মিলিয়ে মানুষ দিশেহারা। ইদানীং সামাজিক মাধ্যমে দেখছি গ্যাসের সংকট চরমে। মনে রাখা উচিৎ সমাজ সুস্থ বা সবল না থাকলে মানুষের মনে এ ধরনের উন্মাদনা বাড়বেই। কারো সাধ্য নাই এর গতি রোধ করে দাঁড়ায়।

হাসানকে নামে জানি। দু একটা গানও শুনেছি। তার কনসার্টে এমন একটা বাজে ঘটনা কি আসলেই বিচ্ছিন্ন কিছু? না সেটা বলা যবে না। কারণ শুদ্ধ সঙ্গীত ও শিল্পের আধার নামে পরিচিত ছায়ানটও রেহাই পায় নি। রেহাই মেলে নি বাম ঘরানার উদীচীর। কারণ তাদের গানে মানুষ জাগে। মানুষ জাগলে যারা ভয় পায় তারা যে মানুষকে অন্ধ রাখতে চায় এটা বলার দরকার পড়ে না। সে সময় কোন দেয়াল বা প্রতিরোধ ছিল না। ছিল না দেশময় কোন প্রতিবাদ। এর মানেটা পরিষ্কার যে কেউ বা যারা ইচ্ছে চাইলেই হামলা করতে পারে। আর করলে যে তাদের শাস্তি হবে এমন কোন গ্যারান্টি নাই। ফলে একটি অপরাধ বা অশাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধ আরেকটি অপরাধকে টেনে আনবে এটাই তো স্বাভাবিক। ঠিক এই মুহূর্তে এ কথা বলা যাবে না সঙ্গীত বা গান বন্ধ করার জন্য এই হামলা চালানো হয়েছিল। তবে এটা বলা সম্ভব যে ভয় লাগানোর জন্য এটা করা হয়েছিল। ভয় লাগানোর একটা সংস্কৃতি কিন্তু বহু বছর থেকে চলে আসছে।

যাদের ফ্যাসিস্ট বলে বিদায় করা হয়েছে তারাও ভয় লাগাতো। তাদের ভয় লাগানোর তরিকা আর আজকের ভয় পাইয়ে দেয়ার তরিকা আলাদা। তারা ভিন্নমত বা বিরোধিতা সহ্য করতো না। সবকিছু বগলদাবা করতে করতে একমসয় বগলটাই নাই হয়ে গেল তাদের। আর এখন কোন এক অজানা কারণে সাহিত্য সংস্কৃতি গান বাজনা ভয়ের নিশানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। না, হাসান এমন কোন কাজ করেন নি বা এমন কোন গান গান না যা কারো ভীতির কারণ হতে পারে। তবু তার কনসার্টে বোতল ছুঁড়ে মারা কি আমাদেরকে সতর্ক করে না? টোট্যালি বিষয়টা ভয় পাইয়ে দেয়ার পাশাপাশি আমাদের সংস্কৃতির প্রতি হুমকি। যারা চায় না দেশের গানবাজনা আগে বাড়ুক তারা শুরুতে ছায়ানটকে টার্গেট করলেও এখন কাওয়ালি জাতীয় গান ছাড়া বাকী গুলোকেও ছাড় দিচ্ছে না। তাহলে কী ধরে নেব আমরা? কোন একটি বিশেষ মহল বা দেশের গান বাজনা ছাড়া বাংলা বাঙালির সংস্কৃতি ভয়ের মুখে গুটিয়ে যাবে? সেটি হবার নয়। বাংলাদেশের সবচাইতে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান আর প্রকৃতি। এই দেশের আকাশে বাতাসে গাছে পাতায় বাড়ির ছাদে গান। মানুষ আপন মনে গান গায়। যে কোন উৎসবে আনন্দ বেদনায় গান মানুষের শক্তি। সে শক্তিকেই ভয় পাচ্ছে এরা।

মজার বিষয় এবং পরিতাপের ব্যাপার হলো যে সব মানুষ বা প্রতিষ্ঠান রুখে দাঁড়াতে পারে বা পারতেন তাঁরা ভয়ে বা নানা কারণে গুটিয়ে আছেন। আশ্চর্যজনক ভাবে কবরের স্তব্ধতার মতো এক নীরবতা চলছে সমাজে। অথচ আমরা কবিতায় পড়েছি : ‘মৃত্যুর জানাজা মোরা কিছুতেই করিব না পাঠ/ কবরেরও ঘুম ভাঙে জীবনের দাবী আজ এতই বিরাট।’

উপায় ক্রমেই কমে আসছে তবে আশা যায় না। আশা আবার ফিরে ফিরে আসে। মন ভালো করা একটি খবর শেয়ার করি:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে স্বপ্নপূরণ হলো রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী রায়ের। অনুশ্রী রায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পূর্ব নবনিদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক২০২৬ প্রতিযোগিতায় দেশের গানে প্রথম এবং নজরুলসংগীতে তৃতীয় স্থান লাভ করে অনুশ্রী। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মাবাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুশ্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে একটি হারমোনিয়াম উপহার দেন।

অনুশ্রী প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি লিখেছিল। সে তার কবিতার মতো কথাবার্তায় বলেছে এই চিঠি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাবে কি না সে জানতো না। চিঠি পৌঁছেছে এবং তারেক রহমান তাকে একটি হারমোনিয়াম দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। এর চাইতে সুসংবাদ আর কী হতে পারে? আশাহীনতার বিপরীতে আশা জাগানিয়ে অনুশ্রীর হারমোনিয়াম আমাদের বলে দেয়, নাই নাই ভয় হবে হবে জয়

গান থামে না। সঙ্গীত আকাশের গায়ে তার চিহ্ন রেখে যায়। বাংলাদেশ বুক বাঁধে আনবার তার বাউল ফকির থেকে হাসান বা অনুশ্রী সবাই গান গাইবে । মানুষ শুনবে মানুষ ভালোবাসবে এইতো আমাদের স্বদেশ।

লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট, কবি ও সাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅপরাধীর সংশোধনে প্রবেশন : মানবিক প্রয়াস বনাম বাস্তবতার সংকট
পরবর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ-এর অন্ত্যমিল