(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ধরে ছুটছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাইলট বিমানের গতি পুরোপুরি কমিয়ে আনলেন। বিশাল বিমানটি বাসের মতো চলতে শুরু করলো। নির্ধারিত গেটে পৌঁছানোর পর কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে দরোজা খুলে দেয়া হলো। যাত্রীরা সবাই ধীরে ধীরে নেমে এলেন। আমরাও বোর্ডিং ব্রিজ ধরে বিশাল কাচঘেরা টার্মিনালে প্রবেশ করলাম। ঝকঝকে এবং চকচকে অবস্থা দেখে বোঝা যায় এটি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক একটি বিমানবন্দর। প্রশস্ত করিডর, স্বয়ংক্রিয় চলন্ত পথ, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নিখুঁত ব্যবস্থাপনা যাত্রীদের মুগ্ধ করে।
আমি সহযাত্রীদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। লায়ন ফজলে করিম, ডালিয়া ভাবী এবং লায়ন বিজয় শেখর দাশসহ আমাদের বিশাল গ্রুপটির সকলেই ট্রানজিট যাত্রী, একমাত্র আমিই হংকংয়ে থেকে যাচ্ছি। তাই আমাকে যেতে হচ্ছে ইমিগ্রেশনের পথে, অন্যদের ট্রানজিটে। আমাদের ট্যুর অপারেটরকে খুঁজে নিলাম। দেশে ফিরে ওনাকে টিকেটের বাড়তি টাকা পাঠিয়ে দেবো বলে বিদায় নিলাম। তিনি আমাকে হাসিমুখে বিদায় দিয়ে বললেন, টাকার চিন্তা করলে তো এভাবে টিকেট করে দিতাম না। আমি হাসলাম।
আগমনী নির্দেশনা অনুসরণ করে ইমিগ্রেশনের দিকে এগোলাম। এখানে বিভিন্ন ক্যাটাগরির যাত্রীদের জন্য আলাদা লেন রয়েছে। নির্দিষ্ট সারিতে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট অপেক্ষার পর আমার পালা এল। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা মহিলা। মুখটা হাসি হাসি করে আমার পাসপোর্ট নিলেন। পাসপোর্ট উল্টে পাল্টে দেখলেন। আমার পাসপোর্টে ভিসার কপি নেই, প্রিন্ট নেয়ারও সময় পাইনি। স্কিনে দেখানোর জন্য মোবাইলটি এগিয়ে দিতে তিনি বললেন, লাগবে না। আমার সিস্টেমেই তোমার ভিসা আছে। তিনি আমার কাছে ভ্রমণের উদ্দেশ্য, অবস্থানের সময়কাল এবং কোথায় থাকব এমন কয়েকটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করলেন। উত্তর দেওয়ার পর আমাকে প্রবেশের অনুমোদন দিয়ে তিনি পরের জনকে সামনে আসার জন্য ইশারা করলেন। পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন হলো। বিষয়টি এতো শৃঙ্খলাবদ্ধ যে দেখতেই ভালো লাগছিলো।
সিডনি বিমানবন্দরে আমার লাগেজ হংকংয়ের জন্য দেয়া হয়েছে। কিন্তু সাথের সবাই যাবে ঢাকা। এখন আমার লাগেজও গোলমাল করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো কিনা টেনশন হচ্ছিলো। লাগেজ নিয়ে অতীতে বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে।
লাগেজ সংগ্রহের হলে পৌঁছালাম। অনেকগুলো বেল্ট! কোন বেল্টে লাগেজ আসবে তা বিশাল ডিসপ্লে বোর্ডে ফ্লাইট নম্বর উল্লেখ করে ঘোষিত হয়েছে। আমি ডিসপ্লে বোর্ডে আমাদের ফ্লাইট নম্বর মিলিয়ে নির্দিষ্ট বেল্টের সামনে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর একে একে লাগেজ আসতে শুরু করল। আমার লাগেজটি দেখা দিতে বুকের উপর থেকে যেনো একটি পাথর নেমে গেলো।
লাগেজ সংগ্রহ করে কাস্টমস এলাকার দিকে এগোলাম। যদিও এখানে আমার তেমন কোন কাজ নেই। কাস্টমসে ঘোষণা দেয়ার মতো কিছুই আমার কাছে নেই। শপিং টপিং যা করেছি, তা এতো নগণ্য যে এগুলো নিয়ে কোন দেশেরই কাস্টমস মাথা ঘামাবে না।
আমি সবুজ চ্যানেল দিয়ে বেরিয়ে আসলাম। কাস্টমসের কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞেসও করলেন না। অবশ্য কাস্টমস কর্মকর্তারা অনেকেরই ব্যাগ স্ক্যান করছিলেন। আধুনিক এক্স–রে যন্ত্রের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি খুবই দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং লাগেজে কি ধরনের পণ্য আছে তা তাৎক্ষণিকভাবেই শনাক্ত হয়।
এই বিমানবন্দর দিয়ে আমি আগেও হংকং সফর করেছি। বছর কয়েকে বেশ পরিবর্তন হলেও অনেককিছুই চেনা চেনা লাগছিল।
কাস্টমস পার হওয়ার পরই খুলে গেল হংকংয়ের প্রবেশদ্বার। এখন হংকংয়ের যেখানে খুশী সেখানে আমি যেতে পারি।
অ্যারাইভাল লবিতে সারি সারি ব্যাংক, এটিএম, মানি এক্সচেঞ্জ, মোবাইল সিম বিক্রয়কেন্দ্র, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, হোটেল বুকিং ডেস্ক এবং পরিবহন কাউন্টার। এখানে আপনি ডলার চেঞ্জ করে হংকংয়ের মুদ্রা নিতে পারেন, হোটেল বুকিং করে তাদের গাড়িতে হোটেলে চলে যেতে পারেন, কোথায় কোথায় ঘুরতে চান তার প্যাকেজ কিনে পরদিন আপনাকে হোটেল থেকে তুলে নিতে বলতে পারেন, একেবারে বিশ্বস্ত এবং নির্ভরশীল গাড়ি ভাড়া করতে পারেন, যা আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে, ভাড়াও নেবে সরকার নির্ধারিত। সবকিছু এত সুন্দরভাবে সাজানো যে একেবারে নতুন ভ্রমণকারীরও কোথাও কোন ধরনের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
আমি কাউন্টারগুলোর সামনে দিয়ে এক্সিট গেটের দিকে হাঁটছিলাম। এসবের কোনটিরই আমার দরকার নেই। আমার বন্ধু স্বপন আমাকে নিতে আসবে। সে গাড়ি নিয়েও আসতে পারে, আবার আমাকে বাস বা ট্রেনে চড়িয়ে শহরে নিয়ে যেতে পারে। আবার থাকার ব্যবস্থা করতে আমার ভাবী মানে বন্ধু ইউছুপ আলীর স্ত্রীকে সিডনি থেকে অনুরোধ করেছিলাম। অফিসের ম্যানেজারকে দিয়ে একটি হোটেল ঠিক করে রাখবার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তিনি সায় দিয়ে বলেছিলেন, আপনি আসেন, সব আমি ঠিক করে রাখবো।
হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীবান্ধব একটি বৈশিষ্ট্য হলো এর পরিবহন ব্যবস্থা। বিমানবন্দর থেকে শহরের কেন্দ্রস্থলে যাওয়ার জন্য রয়েছে দ্রুতগতির এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস ট্রেন, ডাবল–ডেকার বাস, ট্যাক্সি এবং বিভিন্ন হোটেলের শাটল সার্ভিস। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ট্রেন ছেড়ে যায়, যা অল্প সময়েই যাত্রীদের সেন্ট্রাল, কাওলুন বা হংকং দ্বীপে পৌঁছে দেয়। ছোট্ট দেশ হংকংয়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের যে সুবিধা গড়ে উঠেছে, তা পৃথিবীর বহু উন্নত দেশেও হয়নি। বিষয়টি গতবারই খেয়াল করেছিলাম।
অ্যারাইভাল লবির বিশাল কাচের দেয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বিমান ওঠানামা দেখলাম। পৃথিবীর নানা দেশের পতাকাবাহী বিমান একের পর এক অবতরণ করছে, আবার কেউ উড়ে যাচ্ছে নতুন গন্তব্যে। কত শত বিমান যে এই বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিন ওঠানামা করে কে জানে! কত দেশের কত জাতের মানুষ যে এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন তারও ইয়ত্তা নেই। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের পদচারণায় টার্মিনাল যেন একটি ছোট্ট বিশ্ব। বাইরে বেরিয়ে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ল, তা হলো অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলা। শত শত মানুষ, অসংখ্য গাড়ি, বাস, ট্যাক্সি–কিন্তু কোথাও কোনো হর্ন নেই, নেই ধাক্কাধাক্কি কিংবা বিশৃঙ্খলা। এদিক ওদিক তাকাতেই ছুটে আসলো আমার বন্ধু স্বপন, জড়িয়ে ধরে ধরে বললো, কতক্ষণে এসেছিস, দেরি হয়নি তো। মাত্র বের হয়ে বলে তাকে আশ্বস্ত করলাম। স্বপন আমার প্রাইমারী স্কুলের বন্ধু, পাশাপাশি গ্রামেই আমাদের জন্ম, বেড়ে উঠা। অতি সহজ সরল টাইপের স্বভাবের জন্য স্কুলে হংকং আমার অতিপ্রিয় বন্ধু ছিল। সে দীর্ঘদিন হংকং প্রবাসী, ওখানেরই সিটিজেন। পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস এবং ব্যবসা করে। গতবারও সে আমাকে প্রচুর সময় দিয়েছে, বলেছে বেশ ভালোয় আছে। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।










