দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ২৫ মার্চ, ২০২০ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ
44

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
হোটেলের বিশাল লবিতে জমজমাট আড্ডা চলছিল। লায়ন সদস্যদের আড্ডা। আড্ডার বিষয়বস্তু ভিন্ন হলেও সবকিছু ছাপিয়ে চলছিল লায়নিজম। লায়ন্সের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন, ইসামি ফোরাম এবং ইয়ুথ ক্যাম্পের এই আড্ডার সুখ্যাতি রয়েছে। দেশে কিংবা বিদেশে। যেখানেই হোক না কেন লায়ন সদস্যরা জমজমাট আড্ডা বসান হোটেলের লবিতে। রাতের ডিনারের পর শুরু হওয়া এই আড্ডা চলে আড়াইটা তিনটা পর্যন্ত। ধুমায়িত কফির কাপে চুমুক দেয়ার পাশাপাশি নানা বিষয়ে চলে জমজমাট আলোচনা। এই সময় টুকটাক খাওয়া দাওয়াও চলে। চট্টগ্রামের লায়নিজমের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত প্রবীণ সদস্যদের পাশাপাশি নবীন সদস্যরাও সামিল হন আড্ডাতে। সাবেক গভর্নর কিংবা সদ্য লায়নিজমের যোগ দেয়া সদস্যরা একই আসরে বসেন। একই সাথে গল্প করেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই সেবা সংগঠনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। লায়নিজমের অন্যতম লক্ষ্য ফেলোশিপ ঝালাই হয় এই আড্ডাতে। উপহার বিনিময়, খাওয়া দাওয়া কিংবা আরো নানা বিষয়ে জম্পেশ আড্ডা চলতে থাকে। কিভাবে আরো বেশি বেশি মানুষের কাছাকাছি যাওয়া যায় তা নিয়েও ঠিক করা হয় কর্মপন্থা। প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে বেশ জ্ঞান লাভ করা যায় এসব আড্ডায়। প্রবীণেরা উজ্জীবিত করেন,উৎসাহ দেন। নবীনেরা শিখেন।
গতবছর ইসামি ফোরাম বসেছিল দুবাইতে। আমরা বিপুল সংখ্যক লায়ন সদস্যের ঠাঁই হয়েছিল দুবাই’র নভোটেল হোটেলে। রাতভর আড্ডা দিয়ে সময় পার করতাম আমরা। এবার ইসামি ফোরামের আসর বসেছে ভারতের চেন্নাইতে। আমরা উঠেছি হোটেল রামাদা প্লাজায়। হোটেল লবিতে প্রথম দিনেই যথারীতি আসর বসে গেছে। শুরু হয়েছে জমজমাট আড্ডা। রামাদা প্লাজা হোটেলের লবিটি বিশাল। বেশ সুনশান। সাজানো গোছানো। সোফা সেট রয়েছে। রয়েছে ডিভাইন টাইপের ফার্নিচারও। চেয়ারও পেতে রাখা হয়েছে। আমাদের কেউ সোফায়, কেউবা ডিভাইনে। আবার কেউ কেউ আসন পেতেছেন চেয়ারে। একদল প্রাণোচ্ছ্বল মানুষের উপস্থিতি রামাদার লবিতে যেন প্রাণের মেলা বসিয়ে দেয়। রকমারি গল্পের পাশাপাশি আনন্দ, কৌতুক, হাসি-ঠাট্টা এবং হৈ হুল্লুড়ে ভিন্ন এক আবহ লবি জুড়ে। আমাদের হাসি আনন্দের ঝলক যেন ছলকে ছলকে উঠছিল হোটেলের রিসিপশনেও। রিসিপশন ডেঙ বসা তামিল মেয়েগুলোও ক্ষণে ক্ষণে হাসছিল। তারা বুঝি আগে কখনো এমন মানুষ দেখেনি। এমন বুড়ো বুড়ো মানুষগুলোও যে জীবনকে এমন করে উপভোগ করতে পারেন তা বুঝি তাদের অজানা ছিল। আমাদের আড্ডা চলছিল বাংলা ভাষায়। মাঝে মাঝে ঝলকে উঠছিল চাঁটগাইয়া। রিসিপশনের মেয়েগুলো একটি শব্দও বুঝার কথা নয়। অথচ তারা হাসছিল। আমাদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিজেদের মতো করে কুটিকুটি হচ্ছিল। তাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল তারা আমাদের সব ভাষা বুঝতে পারছে! আড়চোখে মেয়েগুলোকে দেখছিলাম। বেশ টের পাচ্ছিলাম তাদের আনন্দ। আহা, আনন্দের বুঝি কোন ভাষা নেই। উচ্ছ্বলতার বুঝি কোন বর্ডার নেই। পৃথিবীর সবদেশের সব ভাষার আনন্দ বুঝি একই সুরে কথা বলে! আমাদের কারো কারো বসার জায়গা হচ্ছিল না। দাঁড়িয়ে শরিক হয়েছিলেন আড্ডায়। রিসিপশনের মেয়েগুলো আমাদের বসার জন্য বাড়তি চেয়ারেরও ব্যবস্থা করে দিলেন। হাসি আনন্দের জমকালো আড্ডায় মাতোয়ারা আমাদের সময়ের দিকে কোন খেয়ালই ছিল না। রাত যে কখন গভীর হয়ে উঠেছিল তা যেন কারোরই খেয়াল ছিল না।
সকালে ঘুম ভাঙলো বেশ বেলা করে। কোন তাড়া নেই। সকালে আমাদের কোন কাজ নেই। শহর দেখতে যাওয়ার একটি প্রোগ্রাম থাকলেও আমার খুব বেশি আগ্রহ নেই। মাস ছয়েক আগে ঘুরে গেছি। দেখে গেছি পুরো শহর। গতবারও সাথে ছিল প্রিয়তমা স্ত্রী। তারও সব দেখা হয়ে গেছে। এতে করে নতুন করে পথে নামার তেমন কোন আগ্রহ আমাদের দুজনের কারোরই নেই। এক্ষেত্রে এ্যাপোলো হাসপাতালের কাজটি সকাল সকাল সেরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলেও আমার মনে হচ্ছিল। তবে সবার আগে সকালের নাস্তাটা সেরে নেয়াই জরুরী মনে হলো।
পাঁচ তারকা হোটেলের সকালের ব্যুফে নাস্তার আয়োজন রীতিমতো আলীশান ব্যাপার। এই সময়টাকেও দারুণ উপভোগ করি আমি। বিশেষ কোন তাড়া না থাকলে রয়ে সয়ে নাস্তা করার মজাটা আলাদা। শত শত রকমের খাবার। যেটি ইচ্ছে যেভাবে ইচ্ছে খাওয়া যায়। চেন্নাইর খাবার দাবারের সাথে আমাদের বেশ সমস্যা রয়েছে।দক্ষিণ ভারতীয় এসব খাবারের অধিকাংশই আমরা খেতে পারি না। মুখে রুচে না। খেতে বেশ কষ্ট হয়। মন এবং পেট কোনটাই ভরে না। তবে কিছু কিছু খাবার রয়েছে বেশ শানদার। ধোসা এবং ইডলির মতো খাবারের সাথে আমাদের সম্পর্ক পুরানো না হলেও বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন তারকাখচিত রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমরা ধোসার অর্ডার করে অপেক্ষা করি। তৃপ্তি নিয়ে খাই। তাই সেই ধোসার দেশে এসে হাত গুটিয়ে রাখার কোন মানে হয় না। হরেক রকমের খাবারের মাঝে আমি ধোসার অর্ডার করে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ডিম পোজ থেকে শুরু করে আরো কিছু খাবার তুলে নিলাম প্লেটে। স্ত্রীকেও প্লেটে করে এনে দিলাম নানা খাবার। বেচারী খুবই স্বল্পাহারী। তাছাড়া খাবার নিয়ে রয়েছে বেজায় বাছবিচার। অবশ্য ধোসা এনে দেয়ায় কিছুটা খুশী হলো বলে মনে হলো। আমি স্যুপ নিলাম। স্যুপের সাথে ইচ্ছেমতো কাঁচা মরিচ মিশিয়ে তাতে সেদ্ধ নুডলস দিয়ে বিশেষ ধরনের খাবার তৈরি করে চুক চুক করতে লাগলাম। ধোসা ছিঁড়ে মুখে পুরে বেশ তৃপ্ত ঘরনী। কিন্তু আমার নুডলস স্যুপের দিকে এক পলক তাকিয়ে মহাবিরক্তি নিয়ে বললো, কি যে খাও! অথচ দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের যাতনায় আমার এই নতুন ধরনের স্যুপ নুডলস দারুণ উপভোগ্য লাগছিল। নানা খুনসুঁটিতে নাস্তা সারলাম আমরা। কিছু খেলাম। কিছু ফেলে রাখলাম পাতে। কত খাবার যে নষ্ট করলাম! কলেজে মাস্টারি করতে করতে আমার উপরও মাস্টারির দারুণ এক স্বভাব রপ্ত করেছে ঘরণী। যখন তখন শাসাতে থাকে। নাস্তার টেবিলে চারদিকে মানুষের জন্য মনভরে শাসাতে না পারলেও চাপা স্বরে কড়া ধমক দিয়ে বললো, এত খাবার নষ্ট করছো কেন! খবরদার, আর কিছু নিবে না। জানো, পৃথিবীতে একশ’ কোটি মানুষ প্রতিদিন রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায়! এক রত্তি খাবারের জন্য কত মানুষের জীবন বিপন্ন!! তুমি না খেলে এই খাবার কেউ না কেউ খেতো! এখন সবই ডাস্টবিনে যাবে।’ প্লিজ, আর খাবার নষ্ট করিও না। মাস্টারি করিও না বলে আমি নিজের চরকায় তেল দিতে লাগলাম!!
হোটেল রামাদা প্লাজা থেকে উবার নিয়ে এ্যাপোলা হাসপাতালে পৌঁছলাম। খুব বেশি দূর নয়। ভাড়াও বেশি নয়। ভালোয় ভালোয় হাসপাতালে পৌঁছে মনটি ফুরফুর করছিল। আমাদের দুজনেরই আগে রেজিস্ট্রেশন করা আছে। সুতরাং ডাক্তার দেখাতে খুব বেশি সমস্যা হবে না। তাছাড়া ফলোআপ রোগী হওয়ায় কিছুটা বাড়তি সুবিধাও আশা করছিলাম। নির্দিষ্ট ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে রিসিপশনে ফাইল জমা দিলাম। দুই তামিল তরুণী ব্যস্তভাবে সবদিক সামাল দিচ্ছেন। তারা আমাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বললেন। আমরা একপাশে সরে গেলাম। জনা পঞ্চাশেক রোগী এবং রোগীর আত্মীয় স্বজন বসে আছেন রিসিপশনে। চেয়ারগুলো সবই তাদের দখলে। আমি এবং আমার স্ত্রী একপাশে গিয়ে দেয়াল হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অপেক্ষমান রোগীদের অধিকাংশই বাংলাদেশের। কয়েকজনকে দেখলাম চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছেন। আমি কারো সাথে কোন কথা বলছিলাম না। চুপি চুপি স্ত্রীর সাথে টুকটাক আলাপ করলেও আমার কান পড়েছিল অদূরে। যেখানে অসুখী মানুষগুলো নিজেদের নানা কষ্টের কথা নিজেদের সাথে শেয়ার করছেন।
চেন্নাইর এ্যাপোলো অনেক বড় একটি হাসপাতাল। বিভিন্ন বিষয়ে হরদম চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে এই হাসপাতালে। স্ত্রীকে নিয়ে মাস ছয়েক আগে ঘুরে গেছি। বেশ কয়েকদিন ছিলাম এখানে। এই হাসপাতালের অধিকাংশ রোগী বাংলাদেশের। এদেশের হাজার হাজার রোগী প্রতিদিন হাসপাতালটিতে ভীড় করেন। এই হাসপাতালে যেসব রোগী চিকিৎসা করাতে আসেন তার অন্তত আশি শতাংশ বাংলাদেশের। এর একটি বড় অংশই চট্টগ্রামের। ভারতের চেন্নাই এ্যাপোলোর মতো একটি হাসপাতালকে শুধু টিকিয়ে রাখা নয়, ফুলে ফলে ভরে উঠার ক্ষেত্রে আমাদের যেই অনন্য ভূমিকা তাতে বেশ গর্ব বোধ করছিলাম (?)!। আহা, কার পাপের ফল এটি! কাদের কারণে আমাদের শত শত কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা চেন্নাই এ্যাপোলোতে ঢালতে হচ্ছে!!
ডাক্তারের মুখোমুখি বসে আছি। তিনি নানা ফাইল ঘেঁটেঘুটে দেখছেন। দেখছেন আমার স্ত্রীকে। বুড়ো ডাক্তারটি প্রথম দিন, আমার স্ত্রীকে মা ডেকেছিলেন। সেই ডাক এখনো অবশিষ্ট আছে দেখে ভালো লাগলো। বয়স্ক ভদ্রলোক তামিলনাড়ুর স্থায়ী বাসিন্দা। বেশ অভিজ্ঞ। কাটাকুটি করে তিনি যেমন হাত পাকিয়েছেন, তেমনি টাকা পয়সায়ও। ছোট্ট একটি অপারেশন করতে উনি ছয় অংকের বেশ বড়সড় একটি সংখ্যা এত অবলীলায় কাগজের কোনে লিখে দিয়েছিলেন যে, আমার কলজেটি মুচড়ে উঠেছিল! মনে হয়েছিল একটি হার্টবিট মিস করেছিলাম! সেসব পুরানো কথা। সেই ধকল সামলে উঠেছি। ভালোয় ভালোয় অপারেশন সম্পন্ন এবং প্রিয়জনের সুস্থ হয়ে উঠা অনেক বড় প্রাপ্তি বলেও মনে হচ্ছিল। মনে হয়েছিল চেন্নাই এ্যাপোলো ছিল বলেই হয়তো আমার স্ত্রীর চিকিৎসা এত সুন্দরভাবে করতে পেরেছি। এমন সুন্দর ব্যবহারের ভালো ডাক্তার ছিলেন বলেই হয়তো আমার স্ত্রীর শরীরে অস্ত্রোপচার নির্বিঘ্ন হয়েছে।
কিন্তু এই ধরনের একটি হাসপাতাল কি বাংলাদেশে গড়ে তোলা যায় না! চট্টগ্রামে! এমন মায়াভরে মা ডাকবেন এমন ডাক্তার আমাদের হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয় না কেন!! চেন্নাই এ্যাপোলো কিংবা ভারতের অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য কোটি কোটি টাকা ঢালেন। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ফতুর হচ্ছেন বহু মানুষ। চেন্নাইর মসজিদ মন্দিরগুলোর ফ্লোরে ফ্লোরে রয়েছে এদেশের হাজারো মানুষের চোখের নোনাজল। পেট ভরে খেতে পান না বহু মানুষ। একটু ভালো জায়গায় শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না অসংখ্য মা। প্রিয় সন্তানের জন্য একটি ভালো কাপড় না কিনে ওষুধ কিনেন অনেক বাবা। পকেটের শেষ কড়িটিও খরচ করে কিনে আনেন কোর্সের সব ওষুধ। এই শেষ কড়িটিও কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রায় পাওয়া। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন আমার প্রবাসী শ্রমিক ভাই, দিনান্ত পরিশ্রম করে যেই মুদ্রা দেশে আনেন আমার গার্মেন্টস শ্রমিক বোন। অথচ চিকিৎসার জন্য, ওষুধের জন্য সেই মহামূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আমরা এসব হাসপাতালগুলোতে দিয়ে আসি। দিতে বাধ্য হচ্ছি। শুধু একটি হাসপাতাল যে আমাদের কত শত কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারে, শুধু কিছু মানবিক ডাক্তার এবং নার্স যে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা কিভাবে রক্ষা করতে পারেন তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে বলেও মনে হচ্ছিল। (চলবে) লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী