তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে হবে : প্রধানমন্ত্রী

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধের প্রস্তাব

আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ৩০ জুন, ২০২৬ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ

ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দ্রুত দেশে ফেরত আনার বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের করভার লাঘব, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং দেশীয় শিল্প ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষার প্রসারে একাধিক জনবান্ধব সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া তিনি বলেন, এই সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।

গতকাল সোমবার সকালে জাতীয় সংসদে ২০২৬২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। দেশ পুনর্গঠনে ঘুরে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন,

সরকার তার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে জনগণের আশাআকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে এগিয়ে চলছে। তবে এটি বহু কঠিন একটি পথ। বাংলাদেশের মানুষ আমরা প্রত্যেকে গ্রামগঞ্জে ঘোরা মানুষ, মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করা মানুষ। বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী মানুষ, যা আমরা নিজেদের চোখে দেখেছি। আমাদের তরুণসমাজ মেধাবী; কৃষকরা উৎপাদনশীল; প্রবাসীরা দেশপ্রেমিক এবং আমাদের উদ্যোক্তারা সম্ভাবনাময়। সুতরাং আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। খবর বাসস ও বিডিনিউজের।

সংসদ সদস্যদের মুহুর্মুহু টেবিল চাপড়ানোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এই মহান সংসদের সব সদস্যকে আহ্বান জানিয়ে বলতে চাই, এই বাজেট শুধু সরকারের বাজেট হিসেবে নয়, আসুন আমরা সকলে এ বাজেটকে একটি পুনর্গঠনের বাজেট হিসেবে দেখার চেষ্টা করি ।

সংসদ নেতা বলেন, আমি বলতে চাই, আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার; জনগণের কষ্ট লাঘব; আর্থিক খাতে আস্থা ফেরানো; কৃষক, শ্রমিক, তরুণ, নারী ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্নে আমরা সকলে ইনশাআল্লাহ ঐক্যবদ্ধ থাকব । এই বাংলাদেশে আর যেন কোনো ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার কায়েম হতে না পারে, এই বাংলাদেশকে যেন আর কেউ তাদের তাবেদার রাষ্ট্র বানাতে না পারে, এই হোক আমাদের আজকের প্রত্যয়।

পাচারের অর্থ ফেরত প্রসঙ্গে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ থেকে ফ্যাসিবাদের আমলে মানুষের লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গিয়েছিল। সেই পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানাতে চাই, সব সাংসদ অত্যন্ত খুশি হবেন যে, বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্টেন্ট রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্ট ট্রিটি চূড়ান্ত হয়েছে। অনেকগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে ৬০টির বেশি নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট সই করে ফেলেছে। আমরা বাংলাদেশের আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে থেকে যত দ্রুত সম্ভব দেশের মানুষের সম্পদ ইনশাআল্লাহ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসব ।

করের বোঝা বৃদ্ধি নয় : প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনগণ আমাদেরকে ভোট দিয়ে এই সংসদে পাঠিয়েছে। এই বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়েই আমরা সরকার গঠন করেছি। সেজন্যই করের বোঝা বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়। করের বোঝা বাড়িয়ে নয়, বরং হয়রানি কমিয়ে করের ভিত্তিকে বাড়িয়ে শাসন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফেরানোর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করতে চায়। এখানে করদাতা যারা আছেন, বিভিন্ন রকম বিষয় আছে, বাস্তবতা আছে, আমি অত বিস্তারিত বলব না, কিন্তু বাস্তবতার বাইরেও আমরা থাকতে পারব না এবং সে কারণে সরকার এমন একটা রাজস্ব ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চায়, যেখানে করদাতারা কর দিয়ে উন্নয়নে অংশীদার হবেন এবং প্রাউড ফিল করবেন, গর্ববোধ করবেন সে রকম একটা সিস্টেম তৈরি করতে চাই। স্বচ্ছ এবং আধুনিক করতে চাই এই কর ব্যবস্থাকে।

বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার অন্যতম শর্ত হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে আমরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া সরকারের নেওয়া লিগাল এইড কর্মসূচির ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছি। গত বছরের তুলনায় এবারে বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই সংসদে আমি বিচারকদের আবাসন সমস্যার সমাধান, গবেষণা ও আদালত ভবনের যে সংকট রয়েছে, সেগুলো নিরসনের জন্য, বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আরো একশ কোটি এবং আইন মন্ত্রণালয়কে আরো ৫০০ কোটি অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার জন্য মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি

তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে হবে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইনশাআল্লাহ এই সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে । পদ্মা ব্যারেজ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি কৃ ষি বা কৃষিবান্ধব সরকার। বিএনপি সরকার যখনই সুযোগ পেয়েছে, চেষ্টা করেছে দেশের মানুষের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে এবং সে কারণে বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে যে অতিরিক্ত পানি আমাদের কাছে আসে, সে পানি আমরা ধরে রাখব, যেন শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের বাকি সময়টা আমরা কৃষকসহ সকলের কাছে পানি সরবারহ করতে পারি।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধের প্রস্তাব : প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আরো কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্ককর কমানোর পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার করতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে তাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই। করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ার কারণে করদাতাদের হয়রানি কমাতে ওই বিধান আনা হয়েছিল। তবে অনেকে বিষয়টিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখায় প্রস্তাবিত ওই বিধান প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন সংসদ নেতা ।

ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী । সে কারণে তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি।

তবে শর্ত দিতে হবে যে, করসুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ বাড়াতে হবে। পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য করসুবিধা আরো সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের তিনটি পার্বত্য জেলায় বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ব্যক্তিদের যে বেতন এবং তাদের আর্থিক পরিসম্পদ খাতে যে অর্জিত আয়, এটা ছাড়া পার্বত্য জেলার পরিচালিত যে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আয় করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে উপস্থাপিত বাজেট। আমি মাননীয় অর্থ এবং পরিকল্পনামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ রাখতে চাই যে, পার্বত্য জেলার যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আছে, তাদের করমুক্ত আয়ের এই সুবিধাটা আরেকটু বাড়িয়ে তাদের ব্যবসা, কৃষি খাতসহ অন্যান্য আয়ের পাশাপাশি বেতনের আয়কেও করমুক্ত করা। এটা পাহাড়ি এবং সমতল উভয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা আছেন, উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

চিংড়িশিল্পের প্রসার ও রপ্তানি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন। এছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, ওষুধ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত মধু আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। পাশাপাশি পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড রোলড শিট, রোল প্রোডাক্টের অইডসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক কমাতে বা প্রত্যাহার করতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চির বিদায়
পরবর্তী নিবন্ধসাতকানিয়ায় পুকুরে ভাসছিল নিখোঁজ বৃদ্ধের লাশ