তারুণ্যকে উন্নয়নে যুক্ত করতে হবে

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

একটি দেশের সামগ্রিক অবস্থা ও উন্নয়নের বিষয়ে চিন্তা করলে বুঝতে হবে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রাকৃতিক সম্পদের চাইতেও বড়, তা হলো জনসংখ্যা। আর এই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হলো তরুণ সমাজ। আগামী দিনের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, প্রশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বড় অংশ নির্ভর করবে নতুন প্রজন্ম কিশোর–কিশোরীদের ওপর। বাস্তবতা হলো এ সময়ে কিশোর অপরাধের পরিবর্তিত চিত্র আমাদের সামনে একটি গভীর সামাজিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। আমরা কি আমাদের সম্ভাবনাময় কর্মশক্তির একটি বড় অংশকে অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে ফেলছি? প্রশ্নটি আজ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও মানবসম্পদের প্রশ্ন।

বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই নাজুক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতিনিয়তই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার এমন চিত্রকে চরম উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সংঘর্ষ এবং নতুনভাবে মব সংস্কৃতির বেশ কিছু ঘটনা গত কয়েক দিনে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে। এসব ঘটনা সরকারের জন্যও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এক শ্রেণির মানুষ পুলিশ প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছেন না। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়ে গেছে। সামান্য কারণেই খুনের ঘটনা ঘটছে। সমাজ, পরিবার বা প্রতিবেশীর সুসম্পর্ক কমে গেছে। দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বাইরে প্রতি বছর ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রে প্রাণ দিতে হচ্ছে গড়ে হাজার হাজার মানুষকে। সরকারি হিসাবে কম হলেও খুন হচ্ছে বহু মানুষ। এ কেবল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক।

কোনো দল–মত নয়, অপরাধীকে অপরাধীর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। গ্যাংভিত্তিক বড় বড় সন্ত্রাসী, অপরাধী জামিনে বেরিয়ে গিয়ে তারাও নিজের গ্রুপ বা দল বড় করছে। প্রভাব বাড়াচ্ছে। এসব গ্যাং লিডারের গ্রুপে উঠতি তরুণ–কিশোর সন্ত্রাসী বা ছিনতাইকারী–ডাকাতরা যুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়গুলোতে বাড়তি নজর দিতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যেন কোনো বিচারবহির্ভূত অপরাধ সংঘটিত না হয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যেন না ঘটে। পুলিশের মনোবল শতভাগ বৃদ্ধি করতে হবে। তা না হলে তাদের নিকট থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়। বড় বড় শহরগুলোতে দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। যে যার মতো করে ঘর থেকে, অফিস ও বিভিন্ন স্থান থেকে লোক উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার ন্যায় মব সংস্কৃতি কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। অপরাধ দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বেশিরভাগ বস্তি মাদকের ডেরা ও আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সন্নিহিত এলাকায় রেললাইন–সংলগ্ন বস্তিতে মাদকের রমরমা ব্যবসা, সন্ত্রাসী ও গ্যাংস্টারদের শক্তি হচ্ছে ওইসব মাদক চোরাকারবার। পুলিশ খুব ভালোভাবেই অবগত এসব বিষয়গুলো, কিন্তু কখনোই সেসব ডেরা বা আস্তানা হতে মাদক–সন্ত্রাসীদের আটকিয়েছে?

আগেই উল্লেখ করছি দেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তরুণ সমাজ। তারাই আজকে হতাশায় নিমজ্জিত। ফলে তাদের মাঝেই বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধপ্রবণতা। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়েনি। অনেক তরুণ বেকারও অলস সময় পার করছে, বিশাল তরুণ অংশকে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কীভাবে অংশগ্রহণ করানো যায়, তা সরকারকেই ভাবতে হবে।

বিদেশে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সেখানেও বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বিদেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ সেক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। বিদেশমুখী তরুণদের বেশিরভাগই অদক্ষ কর্মী। সে কারণে চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজারে বাংলাদেশ এগোতে পারছে না। দেশীয় শ্রমবাজারে নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। স্থানীয় শ্রমবাজার সৃষ্টির জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ খুবই জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে বিনিয়োগ করেন সেটাকে নিশ্চিত করার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের।

বর্তমান সময়ে ব্যবসার পরিবেশে ঘাটতি আছে। আজকাল বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং অফিস–আদালতে সর্বত্র বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদার চোখে পড়ে। এমন সব মানুষ, যাদের কোনো কাজের দক্ষতা নেই, কোনো জ্ঞান নেই, তারা এখানে একধরনের প্রভুত্ব বিস্তার করছে। প্রভুত্ব বিস্তারে তারা তরুণ প্রজন্মকে ব্যবহার করছে। যে কারণে সক্ষম জনশক্তির প্রচণ্ড অভাব তৈরি হয়েছে। তাই নানারকম অশুভ প্রভাব থেকে কিশোর–তরুণদের রক্ষা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে সরকারকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সন্ত্রাসী চক্রের অপরাধ সংঘটনের কৌশল থেমে থাকেনি, তারা সুকৌশলে রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর রয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে অপরাধ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকটাও লক্ষ্য রাখতে হবে। জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে, দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তরুণ শক্তি। এ তারুণ্যের বৃহৎ অংশই যদি আজ অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু আজকের নয়; তার প্রভাব পড়বে দেশের আগামী দিনের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর। তরুণদেরকে কর্ম, শিক্ষা, দক্ষতা ও আশার সঙ্গে যুক্ত করে দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ রক্ষা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক–শিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরে একটি অতিরিক্ত প্ল্যাটফর্ম কেন গুরুত্বপূর্ণ
পরবর্তী নিবন্ধড. পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর ‘শিশুসাহিত্যের ভূমিকা’