ড. ফাতিমা নারগিস চৌধুরী : শিক্ষা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়

অঞ্জন নন্দী | সোমবার , ১৩ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

একটা সময় ছিল যখন এই বাংলায় শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান ছিল অনেক পেছনে। তেমন এক সময়ে ১ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানার সম্ভ্রান্ত পরিবার বহদ্দার বাড়িতে ড.ফাতিমা নারগিস চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা মেরিন ফিশারিজের সাবেক পরিচালক জনাব শামসুল হক চৌধুরী এবং মা খাদিজা চৌধুরী। তাঁর স্কুল জীবন কাটে কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং চট্টগ্রামের ডা.খাস্তগীর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণীতে কেন্দ্রীয় বৃত্তি পরীক্ষায় ও অষ্টম শ্রেণীতে জুনিয়ার বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পান। ১৯৬৩ সালে কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। তখন স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ চালু না হওয়ায় তাঁকে মানবিক বিভাগে পড়তে হয়। চট্টগ্রাম কলেজে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬৫ সালে কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সম্মিলিত মেধা তালিকায় সকল বিভাগের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ড.ফাতিমা নারগিস চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণীতে অনার্সসহ প্রথম শ্রেণীতে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন এবং ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেলেও পারিবারিক কারণে সেখানে যোগদান করেননি।

.ফাতিমা নারগিস চৌধুরী ১৯৭৩ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তিসহ উচ্চ শিক্ষার্থে ক্যানাডা যান। সেখানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এস ও ম্যাকগীল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তত্ত্বীয় নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচ ডি ডিগ্রী লাভ করেন। ইউরোপ, ক্যানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নালে তাঁর গবেষণামূলক রচনা প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে দেশে ফিরে তিনি সরকারি আই আই (বর্তমান সরকারি মহসিন) কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম কলেজে পদায়ন পান। ড. ফাতিমা নারগিস ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি পেয়ে যথাক্রমে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজে শিক্ষকতা করেন। অনার্স ও মাস্টার্স শ্রেণীতে পাঠদানের পাশাপাশি কলেজের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৮ সালে তিনি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক লাভ করেন।

. ফাতিমা নারগিস চৌধুরী চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং কুমিল্লার গৌরীপুর মুন্সি ফজলুর রহমান সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ পদে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। প্রত্যেকটি কলেজে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রসারে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বারোটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করার জন্য সরকার ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি লাভ করেন। একইভাবে তিনি চট্টগ্রাম কলেজে ইসলামী শিক্ষা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করার সরকারি অনুমোদন পান। তিনি বিভিন্ন টার্মে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল এবং সিনেট কমিটির সদস্য ছিলেন এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষা কমিটির সদস্য ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ২০০৩ সালে জাতীয় শিক্ষক দিবসে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কর্তৃক তিনি জেলার কলেজ পর্যায়ে কৃতী শিক্ষক হিসেবে সংবর্ধিত হন। বাংলাদেশ স্কাউটস কর্তৃক ড.ফাতিমা নারগিস চৌধুরী স্কাউট আন্দোলনের সার্বিক উন্নয়ন ও সমপ্রসারণে তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথমে মেডেল অব মেরিট এবং পরবর্তীতে বারটুদিমেডেল অব মেরিট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন।

দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বৎসরের অধিককাল যাবৎ শিক্ষক এবং শিক্ষকপ্রশাসক হিসেবে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৫ সালে তিনি অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে যান। পরবর্তীতে সরকার তাঁকে পুনরায় চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেন। সে সময় তিনি চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকারি অনুমোদন লাভ করেন। সরকারি চাকুরী শেষে তিনি কিছুদিন নগরীর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কসমোপলিটন কলেজে অধ্যক্ষ পদে চাকরি করেন। ড. চৌধুরী বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক ২০১০২০১৩ সালের জন্য চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহসভাপতি পদে মনোনীত হন এবং দক্ষতা ও সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চট্টগ্রামে নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে সোসাইটি ফর প্রমোশন অব একাডেমিক রিসোর্সেস অ্যান্ড নলেজ‘ –এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক মনোনীত হয়ে চট্টগ্রাম নগরীর ওমর গনি এমইএস কলেজ পরিচালনা পরিষদে বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ড. ফাতিমা নারগিস চৌধুরী একজন সফল স্ত্রী ও আদর্শ জননী। স্বামী প্রয়াত মো. মাহফুজুর রহমান চৌধুরী চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনিও ২০০২ সালে শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন। ১৯৯৫ সালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসার পথে তিনি মারাত্মক বাস দুর্ঘটনায় পতিত হন। সেই দুঃসময়ে নারগিস ম্যাডাম অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় স্বামীর সুচিকিৎসা ও আন্তরিক সেবার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন।

. ফাতিমা নারগিস চৌধুরী এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী। কন্যা ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃত্বিত্বের সাথে বিবিএ ও এমবিএ পাস করেন। বর্তমানে স্বামী ও পুত্রসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ড. চৌধুরীর পুত্র চুয়েট থেকে বি.এসসি (ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এস (ইলেকট্রনিক ও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং) ডিগ্রী অর্জন করেন। এম এস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ জিপিএ ৪.০০ পেয়ে তিনি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাইস চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডাল লাভ করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সাইন্সেস এ কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি i2D কমিউনিকেশনস লিমিটেডএ ডিরেক্টর হেড অফ অপারেশনস হিসেবে কর্মরত এবং এই সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিটির একজন শেয়ারহোল্ডার।

কর্মসূত্রে আমি বিভিন্ন সময়ে ম্যাডামের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। তিনি অনেকবার আমার হেড এক্সামিনার এবং ব্যবহারিক পরীক্ষায় ইন্টারনাল পরীক্ষক ছিলেন। অধ্যক্ষ হিসাবে চট্টগ্রাম কলেজে তাঁর অধীনে চাকরি করার সুযোগে বুঝতে পারি তিনি যে কোন কাজ আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন করেন। বিভাগের ক্লাস রুটিন এবং অধ্যক্ষ থাকাকালীন কলেজের সার্বিক রুটিন করতে কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করতেন। কম্পিউটার পরিচালনায় তিনি ছিলেন দক্ষ। যে কোন কাজ তিনি অগ্রিম পরিকল্পনা করে রাখতেন এবং আমাদেরকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতেন। কাজ যত জটিল বা সমস্যাপূর্ণ হোক না কেন, তাঁকে কখনো রাগ করতে দেখিনি। ধীরস্থিরভাবে সব সমস্যা সমাধান করতেন।

একজন সৎ, আত্মবিশ্বাসী, কর্মনিষ্ঠ, বিনয়ী এবং অন্যায়ের বিরদ্ধে আপসহীন প্রফেসর ড. ফাতিমা নারগিস চৌধুরী শিক্ষক সমাজের জন্য প্রেরণার উৎস, যা ভবিষ্যতে আরও সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী ও উদ্যোগী নারী কর্মকর্তা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করি। প্রফেসর ফাতিমা নারগিস চৌধুরী গত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি. দুপুর ২.৩০মিনিটে ৭৮ বছর বয়সে চট্টগ্রামে পরলোকগমন করেন। মাতৃসমা এই মহীয়সী নারীর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক; অধ্যক্ষ (অব:), সরকারি হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅর্থ আইন-২০২৬ (আয়কর)-এর কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনসমূহ
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : বর্জ্য নয়, এটি একটি ভুল জায়গায় পড়ে থাকা সম্পদ