বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আমরা বহু বছর ধরে সম্ভাবনার কথা বলে আসছি। সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, হাওর, দ্বীপ, জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ অসাধারণ। কিন্তু শুধু সম্পদ থাকলেই পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হয় না। সেই সম্পদকে কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা যায়, তার ওপরই নির্ভর করে পর্যটনের ভবিষ্যৎ। আজ তাই বাংলাদেশের পর্যটনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ‘আরও পর্যটক’ নয়, আরও টেকসই পর্যটন। বিশ্বের পর্যটনচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পর্যটক এখন শুধু একটি স্থান দেখতে চান না; তাঁরা প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে চান, স্থানীয় সংস্কৃতি জানতে চান, মানুষের জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হতে চান এবং নতুন ও অর্থবহ অভিজ্ঞতা নিতে চান। ফলে ইকো–ট্যুরিজম ও টেকসই পর্যটন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইকো–ট্যুরিজম মানে শুধু পাহাড়, বন বা নদী দেখতে যাওয়া নয়। প্রকৃত ইকো–ট্যুরিজম হলো এমন পর্যটন, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। আর টেকসই পর্যটনের বৃহত্তর দর্শন হলো পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতির এমন সমন্বয়, যাতে আজকের পর্যটন আগামী দিনের পর্যটনসম্পদকে নষ্ট না করে। অর্থাৎ পর্যটন হবে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের, প্রকৃতির ওপর আধিপত্যের নয়। প্রকৃতিই বাংলাদেশের পর্যটনের মূল সম্পদ। বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো কংক্রিটের স্থাপনা নয়; আমাদের প্রকৃতিই আমাদের প্রধান পর্যটন সম্পদ। কক্সবাজারের আকর্ষণ তার সমুদ্র ও সৈকত। সুন্দরবনের আকর্ষণ তার বন, নদী ও জীববৈচিত্র্য। পাহাড়ি অঞ্চলের আকর্ষণ তার পাহাড়, ঝরনা, বন এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। হাওরের আকর্ষণ তার জলরাশি, পাখি, নৌকা ও মানুষের জীবনযাত্রায়। অর্থাৎ প্রকৃতি আছে বলেই পর্যটন আছে।
এই সত্যটি ভুলে গিয়ে যদি প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে পর্যটন গড়ে তোলা হয়, তাহলে সেটি হবে নিজের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা। পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে, নদী–জলাশয় ভরাট করে কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনায় কোনো গন্তব্যকে সাজানো হয়তো স্বল্পমেয়াদে আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সেই গন্তব্যের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে। একসময় পর্যটক যে কারণে সেখানে গিয়েছিলেন, সেই কারণটিই আর অবশিষ্ট থাকে না।
বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাই একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা জরুরি উন্নয়ন মানেই সব জায়গায় আরও বেশি স্থাপনা নির্মাণ নয়। কখনো কখনো একটি গন্তব্যের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন হতে পারে তার স্বাভাবিক পরিবেশকে অক্ষুণ্ন রাখা। বেশি পর্যটক মানেই বেশি পর্যটন নয়। আমাদের পর্যটনচিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। একটি গন্তব্যে কত মানুষ গেলেন শুধু এই সংখ্যা দিয়ে পর্যটনের সাফল্য বিচার করা যায় না। ছুটির দিনে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের বিপুল সমাগম হয়। এতে স্থানীয় ব্যবসা ও অর্থনীতি কিছুটা উপকৃত হয়, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ে বর্জ্য, পানির চাপ, যানজট, শব্দদূষণ এবং পরিবেশের ওপর চাপ। পর্যটকের সংখ্যা যখন একটি গন্তব্যের ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে, তখন পর্যটনই হয়ে উঠতে পারে সেই গন্তব্যের জন্য হুমকি।
একটি ছোট পাহাড়ি ঝরনা, বনাঞ্চল, দ্বীপ কিংবা হাওরের ধারণক্ষমতা আর একটি বড় শহর বা বিস্তৃত সমুদ্রসৈকতের ধারণক্ষমতা এক নয়। তাই ‘যত বেশি পর্যটক, তত বেশি আয়’ এই ধারণা সব জায়গায় কার্যকর নয়।
বরং আমাদের প্রয়োজন ঐরময–াধষঁব, খড়–িরসঢ়ধপঃ ঞড়ঁৎরংস্তঅর্থাৎ তুলনামূলক কম পরিবেশগত চাপের মাধ্যমে বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা।
একজন পর্যটক যদি কয়েক ঘণ্টা একটি স্থানে থেকে চলে যান, তাঁর অর্থনৈতিক অবদান সীমিত হতে পারে। কিন্তু তিনি যদি কয়েক দিন থাকেন, স্থানীয় আবাসনে অবস্থান করেন, স্থানীয় খাবার খান, স্থানীয় গাইড ও পরিবহন ব্যবহার করেন এবং স্থানীয় পণ্য কেনেন, তাহলে তাঁর ব্যয় বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়। এখানেই টেকসই পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তি পর্যটকের সংখ্যা নয়, পর্যটন ব্যয়ের স্থানীয় প্রবাহ এবং তার স্থায়িত্ব। স্থানীয় মানুষ ছাড়া ইকো–ট্যুরিজম অসম্পূর্ণ একটি গন্তব্যের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার পাহাড়, নদী, বন বা সৈকতে নয় সেই এলাকার মানুষও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি, খাবার, পোশাক, হস্তশিল্প, লোকগান, উৎসব ও ঐতিহ্য একটি গন্তব্যকে অন্য গন্তব্য থেকে আলাদা করে। তাই স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে কোনো পর্যটন গন্তব্যের টেকসই উন্নয়ন কল্পনা করা কঠিন। স্থানীয় যুবক একজন গাইড হতে পারেন, স্থানীয় নারী ঐতিহ্যবাহী খাবার বা হস্তশিল্পের উদ্যোক্তা হতে পারেন, কোনো পরিবার তাদের বাড়ির একটি অংশকে গৃহভিত্তিক আবাসন হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এভাবে পর্যটনের অর্থ স্থানীয় অর্থনীতির ভেতরেই ঘুরতে থাকে।
বাংলাদেশের লুকায়িত গন্তব্য: বাংলাদেশের পর্যটনের আরেকটি বড় শক্তি হলো আমাদের অগণিত লুকায়িত গন্তব্য (Hidden Tourism Destinations)। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অসংখ্য স্থান রয়েছে, যেগুলো স্থানীয়ভাবে পরিচিত হলেও জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে এখনও যথেষ্ট পরিচিত নয়। কোথাও পাহাড়ি ঝরনা, কোথাও নদী ও চর, কোথাও হাওর–বিল, কোথাও বনাঞ্চল; আবার কোথাও রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প কিংবা স্বতন্ত্র জীবনধারা।
এসব গন্তব্যের বিশেষত্ব হলো এগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ থেকে মুক্ত। এই স্বাভাবিকতা ও স্বাতন্ত্র্যই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই লুকায়িত গন্তব্যকে জনপ্রিয় করার অর্থ সেখানে নির্বিচারে পর্যটনের চাপ সৃষ্টি করা নয়। বরং এমন পর্যটন প্রয়োজন, যা গন্তব্যের নিজস্ব চরিত্রকে অক্ষুণ্ন রেখে মানুষের কাছে তার সৌন্দর্য তুলে ধরে। আজ যে জায়গাটি তার নীরবতা, স্বাভাবিকতা কিংবা স্থানীয় জীবনধারার কারণে আকর্ষণীয়, আগামীকাল অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের কারণে যেন সেই বৈশিষ্ট্যই হারিয়ে না ফেলে এই প্রশ্নটি আমাদের পর্যটনচিন্তার কেন্দ্রে থাকা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ সম্ভাবনা :
বাংলাদেশের ইকো–ট্যুরিজমের কথা বলতে গেলে চট্টগ্রাম ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, দ্বীপ এবং বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের যে সমন্বয় এই অঞ্চলে রয়েছে, তা বাংলাদেশের পর্যটনসম্পদের একটি অনন্য উদাহরণ। কক্সবাজারের সমুদ্র কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের পরিচিত গন্তব্যের বাইরেও এই বিস্তীর্ণ এলাকায় রয়েছে অসংখ্য অপেক্ষাকৃত অজানা প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে গন্তব্যের নিজস্ব চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখা। পাহাড়ের সৌন্দর্য যদি পাহাড় কেটেই নষ্ট হয়, বন যদি অবকাঠামোর চাপে সংকুচিত হয় কিংবা কোনো স্থানীয় সংস্কৃতি পর্যটনের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তার নিজস্বতা হারায়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত পর্যটনের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল পর্যটনের গুরুত্ব আরও বেশি। এখানে পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি মানুষের জীবন, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
পর্যটকেরও দায়িত্ব আছে। টেকসই ইকো–ট্যুরিজম শুধু পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় মানুষ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়। একজন পর্যটকের আচরণও একটি গন্তব্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। প্রকৃতিতে ময়লা না ফেলা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত না করা, শব্দদূষণ না করা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখানো এসবই দায়িত্বশীল পর্যটনের অংশ।
আমরা যখন একটি পাহাড়ে যাই, তখন শুধু পাহাড় দেখতে যাই না; একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করি। যখন কোনো স্থানীয় বা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর এলাকায় যাই, তখন শুধু একটি সংস্কৃতি দেখতে যাই না; মানুষের জীবন ও ঐতিহ্যের একটি অংশের সঙ্গে পরিচিত হই। এই উপলব্ধি থেকেই তৈরি হয় দায়িত্বশীল পর্যটনের সংস্কৃতি।
ভবিষ্যতের পর্যটন প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের পর্যটনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো আমাদের স্বাভাবিক সম্পদকে নতুনভাবে দেখা। আমাদের প্রয়োজন এমন পর্যটন, যেখানে প্রকৃতি হবে পর্যটনের প্রাণ, স্থানীয় মানুষ হবে তার অংশীদার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হবে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পর্যটন যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে, তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। পর্যটন যদি স্থানীয় মানুষকে বাদ দেয়, তাহলে তার সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। আর পর্যটন যদি শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে একসময় গন্তব্যের আকর্ষণই হারিয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই আমাদের ভাবতে হবে আমরা কেমন পর্যটন চাই?
শুধু ভিড় নয়, অভিজ্ঞতা চাই। শুধু সংখ্যা নয়, মূল্য চাই। শুধু উন্নয়ন নয়, সংরক্ষণ চাই। শুধু পর্যটক নয়, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ চাই। শুধু আজকের আয় নয়, আগামী দিনের পর্যটনসম্পদও চাই। বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে গন্তব্যের বৈচিত্র্য, প্রকৃতির সুরক্ষা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল পর্যটন সংস্কৃতির মধ্যে। টেকসই ইকো–ট্যুরিজম কোনো বিলাসিতা নয়। এটি বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি অপরিহার্য দর্শন। বেশি গন্তব্য, কম চাপ; বেশি স্থানীয় সুফল, অক্ষুণ্ন প্রকৃতি এই হোক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পর্যটনের দর্শন।
লেখক: ডিরেক্টর, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)











