টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি

পাহাড় ধস ও পানিতে তলিয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সাজেকে আটকা পাঁচ শতাধিক পর্যটক, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ

আজাদী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার , ৯ জুলাই, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

টানা কয়েক দিনের ভারী ও অতি ভারী বর্ষণে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃজেলা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র খুলে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাজেক ভ্যালিতে পাঁচ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। তাদের জন্য বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আমাদের খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, টানা ও অতি ভারী বর্ষণের ফলে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দীঘিনালাসাজেক সড়কের কবাখালী, বাঘাইহাট বাজার ও মাচালং বাজার এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকের সঙ্গে খাগড়াছড়ির যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে রুইলুই ও কংলাক পর্যটনকেন্দ্রে প্রায় ৫ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন।

সাজেক কটেজ রিসোর্ট মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক জিয়াউল হক বলেন, সড়কের কয়েকটি অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে রুইলুই ও কংলাকে প্রায় ৫ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। তাদের জন্য রুম ভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা আকতার বলেন, পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের কারণে বাঘাইহাট ও মাচালং বাজার এলাকায় সড়ক ডুবে গেছে। এতে প্রায় ৫ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। সড়কের পানি নেমে গেলে তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হবে। এদিকে খাগড়াছড়িদীঘিনালালংগদু সড়কের মেরুং অংশ এবং দীঘিনালাসাজেক সড়কের কবাখালী অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মেরুং ইউনিয়নের হেডকোয়ার্টার ব্রিজ এবং সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে চলে গেছে। বড় মেরুং, আটারকছড়া ও তেঁতুল এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সড়ক ডুবে থাকায় গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে দীঘিনালার সঙ্গে লংগদুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অনেক বাসিন্দাকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।

জেলার মাইনী ও চেঙ্গী নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন ছড়া ও খাল উপচে পড়ে একাধিক উপজেলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক সড়ক ও বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। মানুষ ও গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা টিম গঠন করা হয়েছে। মেরুং রাজার সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলায় মোট ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্ট সদস্যদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাবার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

টানা বৃষ্টিতে খাগড়াছড়িমহালছড়ি সড়কের সিন্দুকছড়ি এবং গুইমারা সড়কে পাহাড় ধসের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ জানিয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, জেলায় ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

এদিকে রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, টানা চার দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। বিলাইছড়ি, বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বহু ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। পাহাড় ধসের আশঙ্কায় অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছে। সাজেক ভ্যালিবাঘাইহাট সড়কের মাচালং এলাকায় ব্রিজ ও সড়কের দুটি অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সোমবার ও মঙ্গলবার ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকেরা ফিরে আসতে পারছেন না। সেখানে প্রায় ৫ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি সুর্পণ দেববর্মণ বলেন, সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় প্রায় ৬০০ পর্যটক সাজেকে আটকা পড়েছেন। বৃষ্টি কমে পানি না নামা পর্যন্ত তারা ফিরতে পারবেন না। আটকে পড়া পর্যটকদের কাছ থেকে রুম ভাড়া নেওয়া হবে না। তারা শুধু পানির খরচ দিয়ে থাকতে পারবেন।

বৈরী আবহাওয়া ও পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে প্রশাসন সাময়িকভাবে সাজেক ভ্যালি পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে।

রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে ১৪টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। মধ্যমপাড়ার বাসিন্দা আনন্দ মালা চাকমা জানান, বাড়ির নিচে পাহাড়ের মাটি সরে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীন চাকমা বলেন, ইউনিয়নে প্রায় ৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে, বাকিরা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে চালসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান বলেন, উপজেলায় ৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ উঠেছে এবং শতাধিক পরিবার এখনও পানিবন্দি রয়েছে। বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন জানান, উপজেলার চারটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২০টিতে এখন পর্যন্ত এক হাজার ১৪৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারীদের প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পানিবন্দি পরিবারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিতে রাঙামাটিচট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক, রাঙামাটিখাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটিবান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের অন্তত ১৫ থেকে ১৬টি স্থানে ছোটবড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, ধসে পড়া মাটি দ্রুত অপসারণ করে অধিকাংশ স্থানে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে রাঙামাটিখাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের একটি অংশ এখনও পানির নিচে থাকায় মঙ্গলবার থেকে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইরানে কঠোর আঘাত হানব, যুদ্ধবিরতি বাতিল ঘোষণার পর ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
পরবর্তী নিবন্ধ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর দপ্তর ভূজপুর