জ্ঞান- সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের এক প্রাণবন্ত সাহিত্য উৎসব

নিজামুল ইসলাম সরফী | সোমবার , ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:১২ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতার চেতনা বাঙালির আত্মপরিচয়ের মূলভিত্তি। সেই চেতনাকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত করতে বইয়ের বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ‘স্বাধীনতার বই উৎসব ২০২৬’ এক অনন্য আয়োজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শৈলী প্রকাশনের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির সহযোগিতায় আয়োজিত এ উৎসব শুধু একটি উৎসবই নয়, বরং জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। এই উৎসবের মাধ্যমে স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং সাহিত্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরা হয়েছে। বইকে কেন্দ্র করে পাঠক, লেখক, এবং সাহিত্যপ্রেমীদের একত্রিত করার এই প্রয়াস জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই প্রত্যাশা। বিভিন্ন পর্ব সাজানো ছিলো এ উৎসব। লেখকপাঠককে দিয়েছে এক অনন্য তৃপ্তি ।

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে দুই দিন ধরে যে আবহ তৈরি করেছিল, তা কেবল একটি আয়োজনের সীমায় আটকে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে স্বাধীনতার স্মৃতি, সাহিত্যের অন্তর্গত সুর ও প্রজন্মথেকেপ্রজন্মে বয়ে চলা ভাষার দায়বদ্ধতার এক সম্মিলিত উচ্চারণ। শৈলী প্রকাশনের উদ্যোগ আর বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই মিলনমেলা প্রমাণ করেছে বই কেবল কাগজের ভাঁজ নয়, তা সময়ের শ্বাস, আর সেই শ্বাসকে নতুন প্রজন্মের বুকের ভেতর পৌঁছে দেওয়ার জন্য উৎসবের মতো সামাজিক আচার দরকার।

কিশোর কবিতা উৎসব, ছড়া উৎসব, স্বাধীনতার গান, নতুন বইয়ের পাঠ উন্মোচন, আবৃত্তি ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতাসহ বর্ণিল আয়োজনে ২৭২৮ মার্চ চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দুদিন ব্যাপী স্বাধীনতার বই উৎসব।

উৎসবের উদ্বোধনী ভাষণে দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক যখন বলেন, ‘সাধারণ হতে পারাটা একটি অসাধারণ কাজ’, তখন কথাটি কেবল নীতিবাক্য হয়ে থাকে না; বরং তা উৎসবের অন্তর্নিহিত নন্দনতত্ত্বকে স্পষ্ট করে সাধারণের মধ্যে অসাধারণকে খুঁজে পাওয়ার সাধনাই সাহিত্যের কাজ। তিনি ফুলের বদলে বই উপহার দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন, আলেকজান্দ্রিয়ার ষোলো তলা গ্রন্থাগারের স্মৃতি টেনে আনেন, এবং মনে করিয়ে দেন যে একটি ভালো বই বন্ধুর সমান, আর একজন ভালো মানুষ পুরো লাইব্রেরির সমান। এই উচ্চারণগুলো উৎসবের ভাষাকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা থেকে তুলে এনে এক নৈতিক নান্দনিকতায় স্থাপন করে, যেখানে পাঠক ও লেখকের সম্পর্ক কেবল বিনিময় নয়, পারস্পরিক আলোকিত হওয়ার প্রক্রিয়া। বই উৎসবের আহ্বায়ক নেছার আহমদের সভাপতিত্বে এবং শৈলীর প্রকাশক আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম, ব্যাংক এশিয়ার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়েস চৌধুরী, প্রাবন্ধিক কাজী রুনু বিলকিস, অধ্যাপক ফাতেমা জেবুন্নেসা, গীতিকার জসিম উদ্দিন খান। স্বাগত বক্তব্য দেন উৎসবের সদস্যসচিব নিজামুল ইসলাম সরফী। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা।

দুই দিনের বিন্যাসে কিশোরকবিতা, ছড়া, গল্প, গান, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনের যে বহুস্তরীয় উপস্থাপনা ছিল, তা শিল্পের বহুকণ্ঠী স্বরকে এক সুতোয় গাঁথে। সকাল সোয়া এগারোটায় কবি অরুণ শীলের উদ্বোধনে শুরু হওয়া কিশোরকবিতা উৎসবের আসরে কবিদের কণ্ঠে স্বাধীনতার শব্দ যখন উচ্চারিত হয়, তখন তা কেবল ছন্দের খেলা থাকে না; তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সংলাপ। কবি আজিজ রাহমানের সভাপতিত্বে কবিতা পাঠ করেন কবি আবুল কালাম বেলাল, আনোয়ারুল হক নূরী, জাকির হোসেন কামাল, আকাশ আহমেদ, ওবায়দুল সমীর, অমিত বড়ুয়া, ইসমাইল জসীম, সনজিত দে, প্রদ্যোত কুমার বড়ুয়া, আখতারুল ইসলাম, কানিজ ফাতিমা, সুবর্ণা দাশ মুনমুন, লিটন কুমার চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কবি অঞ্জলি বড়ুয়া।

বিকেল সাড়ে ৩ টায় আবৃত্তি ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন শিক্ষাবিদ প্রফেসর রীতা দত্ত। বাচিকশিল্পী আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনায় তিনি বলেন, শিশুদের সৃজনশীলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির আলো দেয়, আর এই স্বীকৃতিই তাদের ভবিষ্যৎ পাঠাভ্যাসের ভিত্তি গড়ে। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রাবন্ধিক রিটন কুমার বড়ুয়া।

এরপর স্বাধীনতার গান পরিবেশন করেন বিশ্বভরা প্রাণ, চট্টগ্রাম জেলা কমিটির শিল্পীরা। পরিচালনায় ছিলেন শিমলী দাশ। পরে অনুষ্ঠিত ‘আমার লেখায় আমার স্বাধীনতা’ শীর্ষক আলোচনায় সভাপতি ছিলেন কবি অভীক ওসমান। আলোচক ছিলেন লেখক নাসের রহমান, দীপক বড়ুয়া, বিচিত্রা সেন, রশীদ এনাম। পরে অনুষ্ঠিত স্বাধীনতার কবিতা উৎসব পর্ব১ এর উদ্বোধন করেন কবি খুরশীদ আনোয়ার। সভাপতিত্ব করেন কবি আকতার হোসাইন। সন্ধ্যায় স্বাধীনতার গল্প পাঠের উদ্বোধন করেন কবি ওমর কায়সার। অংশ নেন গল্পকার কাসেম আলী রানা, ইফতেখার মারুফ, রুনা তাসমিনা, লিপি বড়ুয়া। কীভাবে বইয়ের পাঠক বাড়ানো যায় শীর্ষক পর্বে সভাপতিত্ব করেন মো. মাজহারুল হক। আলোচনায় অংশ নেন প্রফেসর নারায়ণ বৈদ্য, . উজ্জ্বল কুমার দেব, . শ্যামল কান্তি দত্ত, রেজাউল করিম স্বপন, মোহাম্মদ জহির, সালাউদ্দিন শাহরিয়ার, শাহেদ আলী টিটু। স্বাধীনতার ছড়া উৎসব পর্ব১ এর উদ্বোধন করেন বিপুল বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার।

নতুন বইয়ের পাঠ উন্মোচন পর্বে কবি রাশেদ রউফের সঞ্চালনায় এবং প্রাবন্ধিক কাঞ্চনা চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে লেখকদের মধ্যে ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক এম নাসিরুল হক, ছন্দা চক্রবর্তী, গোফরান উদ্দীন টিটু, জিএম জহির উদ্দীন, লুনা দাশগুপ্তা, নাজনীন লাকী, নিগার সুলতানা, সৈয়দা সেলিমা আক্তার। উৎসবে যাঁদের বইয়ের পাঠ উন্মোচন হয়, তাঁরা হলেন : এম নাসিরুল হকযুদ্ধদিনের প্রেম, ছন্দা চক্রবর্তী-‘শিক্ষা সংস্কৃতি ও সমাজ‘, গোফরান উদ্দীন টিটুনির্ঝরের স্বপ্ন, জিএম জহির উদ্দীনএক মুঠো প্রেম, লুনা দাশগুপ্তাজোনাক জীবন, নাজনীন লাকীআত্মউপলব্ধি ও সামাজিক সংকট, নিগার সুলতানামনের সাতকাহন, সৈয়দা সেলিমা আক্তারজিনাত আজম স্মারকগ্রন্থ, কাসেম আলী রানারোল নম্বর সাত, লিপি বড়ুয়া শিউলি ফোঁটা ভোর, শিউলী নাথআমাদের নেই কোনো ভয়, নাসের রহমানতিন্নি মিন্নি, সৈয়দা করিমুননেসা– ‘ইশ যদি পাখি হতাম’, স্বপ্না রানী বড়ুয়াকাননে হারানো ফুল।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনে ২৮ মার্চ আবৃত্তি ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অধ্যক্ষ তহুরীন সবুর ডালিয়া। প্রাবন্ধিক সাইফুদ্দিন আহমেদ সাকীর সভাপতিত্বে আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম একাডেমির মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর মিঞা, মুহম্মদ মহসীন চৌধুরী, এস এম আবদুল আজিজ, আরিফ রায়হান। বিকেল ৫টায় স্বাধীনতার ছড়া উৎসবের উদ্বোধন করেন ছড়াশিল্পী উৎপলকান্তি বড়ুয়া, সভাপতিত্ব করেন কবি মর্জিনা আখতার।

এরপর স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি উৎসবের উদ্বোধন করেন কবি সুলতানা নুরজাহান রোজী। আবৃত্তি করেন সৌভিক চৌধুরী, সিমলা চৌধুরী, শুক্লা, মলিনা মজুমদার, রিনিক মুন, এস টিএফ যুঁথী, সুপ্রিয়া বড়ুয়া, এনায়েত হোসেন পলাশ।

সন্ধ্যা ৭ টায় স্বাধীনতার গান ২য় পর্বের উদ্বোধন করেন ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী। সংগীত পরিবেশনায় ছিলেন শিউলী নাথ, কাকলী দাশগুপ্ত, মিতা দাশ, সত্যজিৎ দাশ কাঞ্চন, কুমুদিনী কলি।

স্বাধীনতার কবিতা উৎসব পর্ব২ এর উদ্বোধন করেন রিজোয়ান মাহমুদ। সভাপতিত্ব করেন কবি মৃণালিনী চক্রবর্তী। সমাপনী অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন মোহাম্মদ জহির, রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, খনরঞ্জন রায়।

চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত “স্বাধীনতার বই উৎসব২০২৬” সত্যিই হয়ে উঠেছিল এক প্রাণময় মিলনমেলা। দুই দিনজুড়ে কবিতা, গল্প, গান আর আলোচনায় ভরপুর এই আয়োজন বইপ্রেমী, লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের এক অভিন্ন ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল। শুরু থেকেই ছিল উৎসবের আবহ উদ্বোধনের প্রাণচাঞ্চল্য, কিশোরদের উচ্ছ্বাস, আবৃত্তির আবেগ, গানের সুর আর সাহিত্যচর্চার গভীরতা মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আলোকোজ্জ্বল।

নতুন বইয়ের পাঠ উন্মোচন, কবিতা ও গল্প পাঠ, ছড়া ও কিশোরকবিতা উৎসব, নানা আলোচনা সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এক জাগরণের নাম। বিশেষ করে শিশুকিশোরদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে দিয়েছে আলাদা এক সৌন্দর্য। সমাপনী সন্ধ্যায় শিশুদের হাতে পুরস্কার ও বই তুলে দেওয়ার মুহূর্তটি প্রতীকী হয়ে ওঠে যেখানে প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হয় উত্তরাধিকার। পুরো আয়োজনে যে বহু কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সংগীতশিল্পীর অংশগ্রহণ ছিল, তা প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার চেতনা কোনো একক কণ্ঠের নয়; তা বহু স্বর, বহু ছন্দ, বহু রঙের সমবায়। এখানে কবিতা শুধু আবেগের প্রকাশ নয়, ছড়া শুধু ছন্দের খেলা নয়, গান শুধু সুরের বিস্তার নয়্তসবই মিলিতভাবে একটি সম্মিলিত স্মৃতি ও প্রতিশ্রুতি নির্মাণ করে, যেখানে স্বাধীনতা মানে কেবল অতীতের গৌরব নয়, বর্তমানের দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ। সব মিলিয়ে ‘স্বাধীনতার বই উৎসব ২০২৬’ সাহিত্যের নান্দনিকতাকে সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি দেখিয়েছে, উৎসব যখন পাঠকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, তখন তা কেবল আনন্দের উপলক্ষ্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ যেখানে বই আলোর প্রতিশব্দ, আর আলোই স্বাধীনতার প্রকৃত ভাষা।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম থেকে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের চ্যালেঞ্জ ও বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে