জুম’আর খুতবা

কুরআন ও হাদীসের আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্ব মানবজাতির অনুকরণীয় আদর্শ

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২৮ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

আল কুরআনের আলোকে

রাসূলুল্লাহর আদর্শ অনুসরণ:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূর্ণাঙ্গ জীবন বিশ্বমানব জাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তার জন্য যে, আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে। (সূরা: আলআহযাব, ৩৩:২১)

প্রখ্যাত তাফসীরকার ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহর কথা, কাজ, অনুমোদন, সিদ্ধান্ত, সর্বাবস্থায় তাঁেক অনুসরণ করা অপরিহার্য। এ আয়াতে করীমা এ বিষয়ে মৌলিক দলীল হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে আহযাবের যুদ্ধে তাঁর ধৈর্য, দৃঢ়তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যের অপেক্ষা করার মধ্যে উম্মতের জন্য আদর্শ রয়েছে। (ইবনে কাসীর, বর্ণিত আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর)

ইবনে কাসীর (রহ.) আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এ মহান আয়াত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা কাজ ও অবস্থাসমূহে তাঁকে অনুসরণ করার একটি মূলনীতি। নবীজিকে ভালোবাসার পূণর্তা হলো তাঁর সুন্নাহকে জীবনে আদর্শ হিসেবে সর্বোতভাবে গ্রহণ করা। বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যা তাফসীর রুহুল মা’আনী’র অনুসৃত নীতি। তাঁর মতে আয়াতের ব্যাখ্যা ব্যাপক এর পরিধি বিস্তৃত।

ইবাদতে আদর্শ:

নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত, প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীজির অনুসৃত সুন্নাহ উম্মতের জন্য আদর্শ।

চারিত্রিক আদর্শ:

আল্লাহ তা’আলা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুমহান চরিত্রের প্রশংসা করেছেন, এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। (সূরা: আল কলম, ৬৮:)

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা সিদ্দীকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, “তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭৪৬)

হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি সম্পর্কে জানাবো না? আমরা আরজ করলাম কেন নয়, ইরশাদ করেন, সেই ব্যক্তি যে তোমাদের মধ্যে উত্তম চরিত্রের অধিকারী। (আত্‌ তারগীব ওয়াত তারহীব, কিতাবুল আদব, হাদীস: ৪০৭১)

পরিবারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র আদর্শ:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পারিবারিক আদর্শ ছিল অনুকরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারের সদস্যদের সাথে কখনো কঠোর আচরণ করতেন না। তিনি অত্যন্ত কোমল ও সুন্দর ব্যবহার করতেন, এরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বাধিক উত্তম। (জামে আত্‌ তিরমিজি, হাদীস: ৩৮৯৫)

হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত দিয়ে কাউকে প্রহার করেননি। কোনো নারীকেও না। কোনো খাদেমকেও না। (বুখারী, ৩৫৬০, মুসলিম: ২৩২৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরোয়া কাজে অংশগ্রহণ করতেন:

হযরত আসওয়াদ (রা.) বলেন, আমি হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকাকালীন সময়ে কী কাজ করতেন! তিনি জবাবে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের লোকদের কাজে সহযোগিতা করতেন। আর নামাযের সময় হলে নামায আদায়ের জন্য বেরিয়ে যেতেন। (বুখারী: ৬৭৬)

ব্যবসাবাণিজ্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন, একজন সফল আদর্শ ব্যবসায়ী। নবীজি এরশাদ করেছেন, সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীগন সিদ্দীকগন ও শহীদগনের সঙ্গে থাকবে। (তিরমিজি, কিতাবুল বুয়ু, হাদিস: ১২০৯)- শুধু ব্যবসা করলেই এ মর্যাদা পাওয়া যাবেনা বরং সত্যবাদিতা এ আমানতদারি ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া অপরিহার্য। একজন সৎ ব্যবসায়ী, পণ্যের দোষ গোপন করবেনা। মিথ্যাচার করে মূল্য বৃদ্ধি করবেনা। ওজনে কম দিবেনা। নকল পণ্য কে আসল পণ্য বলে বিক্রি করবেনা। মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিবেনা। ব্যবসার ক্ষেত্রে অসৎ উপায় অবলম্বন করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে সততা আমানতদারি রক্ষা করে ব্যবসা পরিচালনা করে সে প্রকৃত অর্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শের অনুসারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৈশব হতে চাচা আবু তালিবের সাথে কয়েকবার ব্যবসা বানিজ্যের কাজে সিরিয়া, বসরা ও ইয়েমেন সফর করেন, ব্যবসায়িক লেনদেনে নবীজির যথেষ্ট দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল। ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে তাঁর সততা ও আমানতদারিতার কারণে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার ও ক্রেতা সংশ্লিষ্ট সকলেই তাঁকে “আল আমীন” বিশ্বস্ত, সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত করেন। সাহাবী হযরত সায়েব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহর দরবারে আগমন করেন, উপস্থিত সাহাবাগন তাঁর প্রশংসা করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আমি তাঁর সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে বেশী জানি। তখন হযরত সায়েব বলেন, আমি আরজ করলাম, আমার পিতা মাতা আপনার প্রতি উৎসর্গিত হোক। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য বলেছেন। তিনি নবুওয়ত ঘোষনার পূর্বে আমার সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন করেছেন। আমি দেখেছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যবসায়িক লেনদেন এতোবেশি পরিচ্ছন্ন ছিলো যার কারণে আমার সাথে তাঁর কোন ধরনের উচ্চবাক্য কিংবা অসদাচরণ সংঘটিত হয়নি। (সুনানে আবু দাউদ, ২য় খন্ড, পৃ: ৩১৭, আল্লামা আবদুল মুস্তফা আযমী (.) সীরাতুল মুস্তফা, পৃ: ৯৬)

দরিদ্র ও অসহায়ের প্রতি সদয় আচরণে রাসূলুল্লাহর আদর্শ: ইসলাম মানুষের প্রতি দয়া, সহানুভূতি, মানবিকতা ও কল্যানের ধর্ম। সমাজের দরিদ্র অসহায় বিধবা মিসকীন দূর্বল মানুষের প্রতিও নবীজির উত্তম আদর্শ অনুসরণীয়। রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি বিধবা ও দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করে সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর ন্যায়। অন্য বর্ণনায় এসেছে, অথবা সে এমন ব্যক্তির ন্যায় যে রাতে অবিরত নামায পড়ে এবং দিনে অবিরত রোজা রাখে। (সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬০০৬, সহীহ মুসলিম: ২৯৮২)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরিদ্র মানুষের সঙ্গে বসতেন, তাদের কথা শুনতেন তাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতেন, তিনি শ্রেণি বৈষম্য করতেন না। তাঁর মজলিসে ধনী, দরিদ্র, দুর্বলসবল, সকলে সমান মর্যাদা পেতেন।

ন্যায় বিচারে অনুকরণীয় আদর্শ:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি বিচার কার্য পরিচালনায় কোনো প্রকার পক্ষপাত করতেন না, তিনি দৃপ্তকন্ঠে ঘোষণা করেন, “আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত তাহলেও আমি তার হাত কর্তন করতাম। (সহীহ বুখারী: ৩৪৭৫, সহীহ মুসলিম: ১৬৮৮)

ন্যায় বিচারে ক্ষেত্রে দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়তা, প্রভাব প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, অনৈতিক হস্তক্ষেপ সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য। এটাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ। মু’মিনদের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অনুকরণীয় আদর্শ হলেন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুমহান চরিত্র ও আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

 

[ইসলাম সম্পর্কিত পাঠকের প্রশ্নাবলি ও নানা জিজ্ঞাসার জবাব দিচ্ছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি। আগ্রহীদের বিভাগের নাম উল্লেখ করে নিচের ইমেলে প্রশ্ন পাঠাতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

Email : azadieditorial@gmail.com

মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক

চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: মিলাদে “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম”এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কিয়াম করা (দাঁড়ানো) জায়েজ কিনা? জানালে কৃতার্থ হব।

উত্তর: মিলাদে নবীজির সম্মানের উদ্দেশ্যে কিয়াম করা (দাঁড়ানো) জায়েজ বরং এটি মুস্তাহাব ও মুস্তাহাসান। বনু কুরাইযার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য হযরত সাদ ইবনে মু’য়াজ (রা.) আসছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের বলেছিলেন, “তোমরা তোমাদের নেতার জন্য দাঁড়িয়ে যাও।”(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩০৪৩)

ভালোবাসা ও সম্মানের কারণে দাঁড়ানো জায়েজ। হযরত ফাতিমা (রা.) যখন রাসূলুল্লাহর কাছে আসতেন তিনি তাঁর জন্য দাড়াতেন, আবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত ফাতেমা (রা.) এর কাছে যেতেন তিনিও তাঁর জন্য দাঁড়াতেন। (আবু দাউদ: ৫২১৭)। ফতোওয়া শামীতে রয়েছে, যদি এমন ব্যক্তি হয় যে, সম্মান পাওয়ার যোগ্য তাঁর সম্মানে দাঁড়ানো জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ৩৮৪)। ইমাম আহমদ রেযা, ফতোওয়া রযভিয়্যার মধ্য বলেন, মিলাদ শরীফ পাঠের সময় সাইয়্যিদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানে দাঁড়ানো নি:সন্দেহে মুস্তাহাব মুস্তাহাসান। (ফতোওয়ায়ে রযভিয়া,খন্ড: ২৬, পৃ: ৫০৭)

পূর্ববর্তী নিবন্ধমানববিদ্যা চর্চার প্রয়োজনীয়তা