রবিউল আউয়ালের গুরুত্ব: ইসলামি বর্ষের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। কুরআন, হাদীস ও প্রামাণ্য সীরাত বিষয়ক গ্রন্থ সমূহের আলোকে এ মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতি বিজড়িত মাস রবিউল আউয়াল শরীফ। এই মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য। এ মাসের আগমনে মুমিন মুসলিমরা ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়। নবীজির প্রতি অধিকহারে দরুদ সালাম প্রেরণ, নবীজির অনুপম জীবনাদর্শের চর্চা, সীরাত চর্চার মাধ্যমে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও অকৃত্রিম ভালোবাসা নিবেদন মুসলমানদের ঈমানী চেতনাকে জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
দরুদ সালাম নিবেদন করা একটি বরকতময় আমল: মহান আল্লাহর অন্যতম পরিচয় তিনি “খালেক” স্রষ্টা, আমরা তাঁর “মাখলুক” সৃষ্টি। তিনি স্রষ্টা, তিনি পূতপবিত্র, তিনি অমুখাপেক্ষী, তিনি আমল করেন না। আমরা তাঁরই মুখাপেক্ষী, আমরা আমল করি। নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইবাদত বন্দেগী, আল্লাহরই জন্য আদায় করি। তিনি কোনো আমল করেন না। তবে তিনি তাঁর প্রিয় মাহবুব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ সালামের মতো বরকতময় আমলের হাদিয়া উপহার প্রেরণ করেন পাঠ করেন, আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন, হে ঈমানদারগণ, তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা। (সূরা: আল–আহযাব, ৩৩:৫৬)
হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত প্রেরণ করেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪০৮)
রাসূলুল্লাহর আগমন বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর সর্বোত্তম নিয়ামত: মহান আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনকে মু’মিনদের ওপর আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হিসেবে ঘোষণা করেছেন, আল কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি মহা অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, তিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াত সমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন, এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতোপূর্বে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে ছিল। (সূরা: আলে ইমরান, ৩:১৬৪)
বর্ণিত আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহর প্রেরণ কে মুমিনদের জন্য “মহা অনুগ্রহ” মহা নেয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অন্য আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহ ও নেয়ামত প্রাপ্তিতে নেয়ামতের স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ শরীয়ত সম্মত খুশী উদযাপন ও আনন্দ প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, (হে প্রিয় মাহবুব) বলুন! আল্লাহর অনুগ্রহ রহমত প্রাপ্তিতে তারা আনন্দ প্রকাশ করুক। তারা যা সঞ্চয় করে তার চেয়ে এটিই উত্তম। (সূরা, ইউনুস: ১০:৫৮)
আয়াতে বর্ণিত “ফালয়াফরাহু” শব্দের আরবি প্রতিশব্দ ঈদ। শরয়ী পরিভাষায় বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন, বরকতময় আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত আনন্দ উৎসবের দিনকে ঈদ বলা হয়, ঈদ শব্দটি আরবিতে বারবার ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা অর্থে ব্যবহার হয়। যেহেতু প্রতি বৎসর মুসলিম উম্মাহর দ্বারপ্রান্তে রহমত শান্তি কল্যাণ ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে ফিরে আসে। এ দিনেই বিশ্বমানবতার অগ্রদূত, কল্যাণের মূর্ত প্রতীক, শাফায়াতের কাণ্ডারী, মুক্তির দিশারী, রাহমাতুল্লীল আলামীন ধরাধামে শুভাগমন করেন। রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্মদিন স্মরণ করেছেন, পালন করেছেন, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু কাতাদাহ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবার দিবসে রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটি সেই দিন যেদিন আমি জন্ম গ্রহণ করেছি এবং যে দিন আমার উপর ওহী নাযিল হয়েছে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬২)
সুতরাং এ দিনে নবীজির জন্ম ও আগমনকে স্মরণ করে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, জশনে জুলুস উদযাপন করা, দরুদ সালাম পাঠ করা, কিরআত, হামদ, নাত প্রতিযোগিতার আয়াজন করা, নবীজির সমগ্র জীবনাদর্শের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা, গরীব, মিসকীন, অসহায়দের মধ্যে খাবার বিতরণ করা, দান–সাদকা করা, মানুষকে সুন্নতের দিকে আহবান করা, ভালোকাজের প্রতি উৎসাহিত করা, মন্দ ও শরীয়ত বিরোধী কাজ থেকে বিরত রাখা। এ পদ্ধতিতে মিলাদুন্নবী নামে মাহফিল আয়োজন করার বৈধতা কুরআন হাদীস, তাফসীর ও নির্ভরযোগ্য কিতাবের বর্ণনার আলোকে প্রমাণিত।
বিশ্ব মানবতার প্রতি তাঁর রহমত: আল্লাহর প্রিয়নবী দোজাহানের সরদার, সমগ্র জগত বাসীর কল্যাণের মূর্ত প্রতীক, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রহমতের ব্যাপকতা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি। (সূরা: আল আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)
বর্ণিত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য তাফসীর সমূহে “ রাহমাতুল্লীল আলামীন” হওয়ার ব্যাপকতা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লামা শিহাবুদ্দীন আলুসী (রহ.)’র প্রণীত তাফসীরে রূহুল মা’আনীতে উল্লেখ করেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যা অত্যন্ত ব্যাপক, তাঁর মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন শরীয়ত বিধান ও নির্দেশনাসহ পাঠানো হয়েছে যেগুলো দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের মাধ্যম, সুতরাং তিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমত। তিনি (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিশ্ব জগতের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, এ ব্যাপারে মানব জাতি, জ্বীনজাতি, ফেরেস্তারাজি, মু’মিন ও কাফিরদের মধ্যে পার্থক্য নেই। মক্কী জীবনে কাফির মুশরিকরা নবীজির উপর অসহনীয় জুলুম নির্যাতন নিপীড়ন নিষ্পেষণ অত্যাচার অবিচারের কোনো পন্থা অবশিষ্ট রাখেনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে অভিশাপ দেননি। নবীজি এরশাদ করেছেন, “আমি অভিশাপকারী হিসেবে প্রেরিত হইনি বরং আমি রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। (সহীহ মুসলিম)
প্রখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী (রহ.) এর প্রণীত রূহুল বয়ান এ বর্ণিত আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র জাহানের জন্য রহমত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দর ও চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, হে মুহাম্মদ আপনাকে শরীয়তের বিধান এবং ইহকাল পরকালের সৌভাগ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়সমূহ এমন অবস্থায় প্রেরণ করা হয়েছে যে, আপনি সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত। (তাফসীর রূহুল বয়ান, সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নং আয়াত সংশ্লিষ্ট তাফসীর।)
তায়েফের ময়দানে রহমাত, হিদায়ত ও কল্যাণকামনা ছিল নবীজির চরিত্র: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “রাহমাতুল্লীল আ’লামীন” কেবল মু’মিনদের জন্য নয় তিনি ইসলামের চরম শত্রু মুশরিকরা তাঁকে অমানবিক নির্যাতন করার পরও তাদের জন্য বদদোয়া করেননি, তায়েফের হৃদয়স্পর্শী মর্মান্তিক ঘটনা এর বাস্তব দৃষ্টান্ত। বুখারী শরীফে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো দিন কি আপনার ওপর এসেছিল। নবীজির তখন তায়েফের ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, তিনি বলেন, তিনি ইবনে আবদে ইয়ালীলের কাছে দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু তারা তাঁর আহবানে সাড়া দেয়নি, তারা নবীজিকে চরমভাবে নির্যাতন করেছিল, নবীজি ব্যথিত অন্তর নিয়ে ফিরে আসেন ফেরেস্তারা অনুমতি চাইলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনি চাইলে আমরা তাদের উপর পাহাড় চাপিয়ে ধ্বংস করে দেব। নবীজি বললেন, বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন লোক বের করবেন যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবেনা। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২৩১, সহীহ মুসলিম হাদীস: ১৭৯৫) যারা নবীজিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, নানাবিধ কষ্ট দিয়েছে, চরমভাবে অপমানিত করেছে, সেই মহান নবী তাঁদের ধ্বংস কামনা না করে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঈমান ইসলাম ও হেদায়াতের আশা করেছেন, দুআ করেছেন। নবীজির দুআ বৃথা যায়নি।
ওহুদের ময়দানে রক্তাক্ত হওয়ার পরও হেদায়ত কামনা করেছেন:
৩য় হিজরিতে অনুষ্ঠিত ওহুদের যুদ্ধে কাফিরদের আঘাতে নবীজি চেহারা মুবারক ও দেহ মুবারক রক্তাক্ত হয়েছিল, তাঁর দাঁত মুবারক আহত হয়েছিল, সাহাবায়ে কেরাম কাফিরদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করার অনুরোধ করা সত্বেও নবীজি তাদের জন্য বদদোয়া করেননি, অভিশাপ দেন নি বরং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, এরশাদ করেছেন, হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন কারণ তারা জানেনা। হিংসা, প্রতিহিংসা চর্চা করা, অভিশাপ দেওয়া নবীজির নীতি ছিলনা। তিনি ব্যবহারিক জীবনের আদর্শ, মানবিকতা, রহমত হিকমত ধৈর্য ও হেদায়াতের আকাঙ্খাকে ধারণ করে ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন, নবীজি বললেন, “আমি রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছি” তিনি নবুওয়াতের মিশনকে অভিশাপ নয় রহমত হিসেবে ঘোষণা করেছেন, হাদীসের শিক্ষা হলো, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু বর্তমানের বিরোধিতা দেখেননি বরং তিনি অপরাধীর ভবিষ্যত দেখেছেন, নবীজির দূরদৃষ্টি ছিলো, হয় তো এমন সময় আসবে তখন আজকের বিরোধিতা কারীদের ভবিষ্যৎ সন্তানরা দ্বীনের কলেমা পাঠ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেবে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তোমার প্রিয় হাবীবের ওসীলায় দয়া, অনুগ্রহ ও রহমত থেকে বঞ্চিত করোনা। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।












