আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে এশিয়া–ইউরোপ, এশিয়া–যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যগামী বিভিন্ন রুটে কন্টেনার পরিবহনের স্পট ভাড়া ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো রুটে কন্টেনার পরিবহনের ভাড়া দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে তেলবাহী ট্যাংকার ও বাল্ক ক্যারিয়ারের ভাড়াও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাণিজ্যে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের অর্থনীতিতে। আমদানি ব্যয় বাড়ায় ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা, কৃষ্ণসাগরে হামলা বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্যে অস্থিরতা, ঘুরপথে পাড়ি জমানো এবং বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে মৌসুমি অতিরিক্ত চাপের কারণে জাহাজের কার্যকর সক্ষমতা কমে গেছে। অনেক শিপিং লাইন এখনো সুয়েজ খাল ব্যবহার না করে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। এতে প্রতিটি যাত্রাপথে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং হাজার হাজার নটিক্যাল মাইল বেশি পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি ব্যয়, বীমা ব্যয় এবং জাহাজ পরিচালনার মোট খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট শিপিং ব্যবসায়ীরা বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সাংহাই–যুক্তরাষ্ট্র রুটে ৪০ ফুট কন্টেনার পরিবহনের স্পট ভাড়া এক লাফে দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ব কন্টেনার ভাড়ার সূচকও প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক শিপিং কোম্পানি অতিরিক্ত পিক সিজন সারচার্জ এবং জেনারেল রেট ইনক্রিজ (জিআরআই) আরোপ করেছে। বিশ্বের বৃহৎ কন্টেনার পরিবহন কোম্পানিগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আগের তুলনায় দীর্ঘ রুট ব্যবহার করায় একই সংখ্যক জাহাজ দিয়ে কম ট্রিপ করতে হচ্ছে। ফলে জাহাজের কার্যকর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে বাজারে জাহাজের সংকট তৈরি হওয়ায় ভাড়া আরো বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে বন্দর ও জাহাজে হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় শস্য, জ্বালানি ও বিভিন্ন কাঁচামালের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে। এর প্রভাব বাল্ক ক্যারিয়ার ও ট্যাংকার বাজারেও পড়েছে। যুদ্ধঝুঁকির কারণে বীমা প্রিমিয়াম বেড়েছে কয়েক গুণ। অনেক জাহাজকে বিকল্প রুটে চলাচল করতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের আমদানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্য ও রাসায়নিক বিদেশ থেকে আসে। আন্তর্জাতিক ভাড়া বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় আরো বাড়বে। বিশেষ করে এলসি খরচ, ফ্রেইট চার্জ এবং বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে ভোজ্যতেল, ভোগ্যপণ্য, শিল্প কাঁচামাল, ইস্পাত, রাসায়নিক, প্লাস্টিক, টেঙটাইলের বাজারে।
মোহাম্মদ মুনির উদ্দীন নামে একজন আমদানিকারক গতকাল আজাদীকে বলেন, চীন থেকে কাঁচামাল এনে আমরা কারখানায় উৎপাদন করি। চীন থেকে আগে ১ হাজার থেকে ১২শ ডলারে একটি কন্টেনার চট্টগ্রামে পৌঁছাতে পারতাম। এখন তা তিন হাজার থেকে বত্রিশশ ডলার গুণতে হচ্ছে। জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং সংকট তৈরি হওয়ায় সময়মতো কন্টেনার আনা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ফ্রান্স থেকে আমাদের এক কন্টেনার পণ্য আসার কথা। গতকাল ছিল জাহাজিকরণের দিন। অথচ কন্টেনার জাহাজিকরণ হয়নি। এতে আমরা নানাভাবে লোকসানের মুখে পড়ি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চেকপয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন দীর্ঘমেয়াদি চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে সুয়েজ, হরমুজ ও বাব আল–মান্দেব করিডোর স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক শিপিং বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
তারা বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। এর সিংহভাগ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়ার এই ঊর্ধ্বগতি দেশের আমদানি ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। এর খেসারত সাধারণ ভোক্তাদের দিতে হবে।












