জাতিসংঘের আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার শুনানি শুরু

হত্যা বন্ধ করুন : গাম্বিয়া

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে, তাতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশন ভঙ্গ করেছে কিনা, তা বিচার করে দেখবে এই আন্তর্জাতিক আদালত।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, দ্য হেগের পিস প্যালেসে বাংলাদেশ সময় গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টায় শুরু হওয়া এ শুনানিতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির নেত্রী অং সান সু চি, যিনি গণতন্ত্রের দাবিতে অহিংস আন্দোলনের কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। আর আইসিজেতে এই মামলা করা ওআইসিভুক্ত দেশ গাম্বিয়ার পক্ষে এ শুনানিতে প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। খবর বিডিনিউজের।

এদিকে, গতকাল বিচার শুরুর সময় উদ্বোধনী বক্তব্যে আইনমন্ত্রী তামবাদু মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকদেরকে ব্যবস্থা নিতে হবে। গাম্বিয়া চায়, আপনারা মিয়ানমারকে এই কাণ্ডজ্ঞানহীন হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে বলুন। এই বর্বর, নির্মম কর্মকাণ্ড থামান। এ বর্বরতায় মানুষ স্তম্ভিত হয়েছে, মর্মাহত হয়েছে আমাদের সমন্বিত বিবেক।

পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশ গাম্বিয়া সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে নভেম্বরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের ১৫ বিচারকের সঙ্গে প্যানেলে আছেন গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মনোনীত দুই বিচারক। শুনানি শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্ত দেবেন। তাদের প্রাথমিক শুনানি হবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।

রাখাইনের নিপীড়িত রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা এ শুনানি উপলক্ষে দ্য হেগের পিস প্যালেসে উপস্থিত হয়েছেন। শুনানি শুরুর আগে তারা ন্যায়বিচারের জন্য প্রার্থনা করেছেন। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার ছাড়াও বাংলাদেশ, কানাডা এবং ওআইসি ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত রয়েছেন দ্য হেগে।

গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছু অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করা এবং গণহত্যার আলামত সংরক্ষণের আদেশ চাওয়া হয়েছে আইসিজের কাছে। শুনানির প্রথম দিন গতকাল গাম্বিয়া তাদের বক্তব্য আইসিজেতে উপস্থাপন করে। আজ বুধবার মিয়ানমার তাদের বক্তব্য তুলে ধরবে। বৃহস্পতিবার প্রথমে গাম্বিয়া এবং পরে মিয়ানমার যুক্তি খণ্ডন করে নিজেদের চূড়ান্ত বক্তব্য জানাবে। এরপর শুরু হবে সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু স্থাপনায় ‘বিদ্রোহীদের’ হামলার পর রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় সেনাবাহিনীর অভিযান। সেই সঙ্গে শুরু হয় বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রোহিঙ্গাদের ঢল। এরপর গত দুই বছরে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। তাদের কথায় উঠে আসে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাওপোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ, যাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান বলে জাতিসংঘ।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও (আইসিসি) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নালিশ গেছে। তার মধ্যেই গত নভেম্বরে জাতিসংঘের আদালতে এ মামলা করে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। আইসিজের বিধি অনুসারে, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত এক দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ তুলতে পারে। গণহত্যা প্রতিরোধ ও এর শাস্তি বিধানে ১৯৮৪ সালে স্বাক্ষরিত কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। ১৯৫৬ সালে ওই ‘জেনোসাইড কনভেনশনে’ সই করেছিল মিয়ানমার। গাম্বিয়াও এ কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। এই কনভেনশনের আওতায় দেশগুলো শুধু গণহত্যা থেকে বিরত থাকাই নয়, বরং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং এমন অপরাধের জন্য শাস্তি বিধানেও বাধ্য।

জাতিসংঘ গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযানে যে ধরনের অপরাধ হয়েছে আর যেভাবে তা ঘটানো হয়েছে, মাত্রা, ধরন এবং বিস্তৃতির দিক দিয়ে তা ‘গণহত্যার অভিপ্রায়কে’ অন্য কিছু হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সমতুল্য।

আর অং সান সু চির বেসামরিক সরকার ‘বিদ্বেষমূলক প্রচারকে উসকে’ দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ‘আলামত ধ্বংস’ করেছে এবং সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ থেকে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে রক্ষা করতে ‘ব্যর্থ হয়েছে’। এর মধ্যে দিয়ে মিয়ানমার সরকারও নৃশংসতায় ‘ভূমিকা’ রেখেছে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমার বলে আসছে, তাদের সেনাবাহিনীর ওই লড়াই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে, কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে নয়।

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি দ্য হেগের আদালতে যে সেনাবাহিনীর পক্ষ হয়ে লড়ছেন, সেই সেনাবাহিনীই এক সময় তাকে বছরের পর বছর গৃহবন্দি করে রেখেছিল। গতকাল তিনি গাড়িবহরে হেগের পিস প্যালেসে যান এবং তাকে করা সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো জবাবও দেননি। আদালতে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত বর্ণনার সময় সু চিকে অনেকটাই ভাবলেশহীন দেখা গেছে।

আদালতের বাইরে এসময় ন্যায়বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে রোহিঙ্গারা। অন্যদিকে, মিয়ানমারের বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গনে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে সু চির সমর্থনে সমাবেশ করেছে হাজার হাজার মানুষ। ‘দেশের মর্যাদা রক্ষায় মাদার সুএর পাশে দাঁড়াও” স্লোগান দিয়েছে তারা।

x