জনশক্তি রপ্তানি : সর্বমুখী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে

| বৃহস্পতিবার , ৪ জুন, ২০২৬ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দেশে জনশক্তি রপ্তানিতে ধস নেমেছে। চট্টগ্রাম থেকেও জনশক্তি রপ্তানি কমে গেছে। এবিষয়ে একটি প্রতিবেদন গত ২ জুন দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশ প্রবাসী হিসেবে বসবাস করেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সব চেয়ে বেশি প্রবাসীর বসবাস। চট্টগ্রামের বহু মানুষই মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে চাকরি কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য করছেন। পরিবারের একজন বিদেশ যেতে পারলে পরেরজনকেও টেনে নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষ প্রবাসে জীবন কাটাচ্ছেন। চট্টগ্রামের মানুষের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন বেশ জনপ্রিয় গন্তব্য। অবশ্য বাহরাইনে বহুদিন ধরে ভিসা বন্ধ করে রেখেছে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও অনেকেই বাহরাইন যেতে পারছেন না। এছাড়া বিভিন্ন সময় দেশগুলো ভিসা বন্ধ করে রাখে, ফলে জনশক্তি রপ্তানিতে ভাটার সৃষ্টি হয়। আবার যখন ভিসা চালু করে তখন রপ্তানি বাড়ে। চট্টগ্রামসহ সারাদেশের লাখ লাখ প্রবাসীর পাঠানো রেমিটেন্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম এবং নিখাদ মাধ্যম। কার্যত এই সেক্টরই দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সহায়তা করে। এতে করে সরকার নানাভাবে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করে। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেয়াসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকজন যাতে বিদেশ যেতে পারেন সে জন্যও নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এই অস্থিরতার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে যেতে চাচ্ছেন না।

নগরীর আগ্রাবাদস্থ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি ব্যুরোর এক কর্মকর্তা জানান, গেলো বছর চট্টগ্রাম জেলা থেকে বিদেশ যাওয়ার জন্য ডাটা ব্যাংকে নাম নিবন্ধন করেছেন ৬৮ হাজার ১৫৪ জন, অথচ বিদেশ যেতে পেরেছেন ৪১ হাজার ৮২৯ জন। চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে সামপ্রতিক সময় পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ, অথচ বিদেশ যেতে পেরেছেন দশ হাজার জনের মতো। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে নিবন্ধন করলেও অনেকেই যেতে পারেননি বলেও জানান।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে দক্ষ জনশক্তির কোনো বিকল্প নেই। গত ২০ বছরে বিশ্বে দ্রুত প্রযুক্তিগত বিকাশ বিগত ১০০ বছরকে ছাড়িয়ে গেছে। পরবর্তী ৫ বছরে এ পরিবর্তনের ধারা গত ২০ বছরকেও ছাড়িয়ে যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ৭৫ শতাংশ নিয়োগকারী দেশসমূহের বাংলাদেশি জনশক্তির কারিগরি দক্ষতার ওপর কোনো আস্থা নেই। যার কারণে বাংলাদেশিরা ভালো কাজে অগ্রাধিকার না পেয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্নমান ও নিম্ন আয়ের কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। তাছাড়া সৌদি আরব সরকার ‘সৌদিকরণ কর্মসূচি’ (প্রতি কারখানায় ২০শতাংশ সৌদি নাগরিক থাকা বাধ্যতামূলক) করেছে যার ফলে প্রবাসীদের জন্য ১২ধরনের চাকরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ভিশন ২০৩০ অনুযায়ী সৌদি সরকার তাদের শ্রমবাজারে ৭০ শতাংশ সৌদি নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে যার ফলে দেশটিতে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার সংকুচিত হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি দীর্ঘদিন যাবৎ প্রায় বন্ধ। কুয়েতে মানবপাচার সংক্রান্ত ঘটনায় বাংলাদেশি জনশক্তি প্রেরণের বিষয়টি প্রায় হুমকির মুখোমুখি। কাতার, লেবানন ও আরও কিছু মধ্যপ্রাচ্যের দেশে নানামুখি জটিলতার কারণে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার অনেকটা অনিশ্চিত। তাঁরা বলেন, এখন প্রবাসী আয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াতে অনেক বেশি চলে গেছে। সরকারি হিসাবের বাইরে হুন্ডি দিয়ে আসছে। এটা ফিরিয়ে আনতে হলে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা কোনো দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ব্যবস্থা না। টাকার বিনিময় হার বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখাটাই কাজের কথা। তাঁরা বলেন, এখন অর্থনীতি যে চাপের মধ্যে আছে এটা সবাই বুঝে। গুরুত্বপূর্ণ হলোআগে আর্থিক খাতে দুর্বলতা ছিল এবং বৈদেশিক খাত শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন বৈদেশিক খাতও দুর্বল হয়ে গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির দুই ইঞ্জিনের মধ্যে এক ইঞ্জিন একটু শক্তিশালী ছিল, এখন দু’টো ইঞ্জিনই দুর্বল হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে অর্থনীতিতে একটি সংকট বিকাশমান। এখন এটার সমাধান হলোএই সংকটকে স্বীকার করে নিয়ে সর্বমুখী যথাপযুক্ত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাই তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির দিকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জনশক্তি রপ্তানি নতুন গতি পাবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধবাসু চ্যাটার্জী : চলচ্চিত্র পরিচালক