চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকার ছয়টি বার্থে বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ মুহূর্তে আটকে গেছে। প্রায় ২৬৪ কোটি টাকার দরপত্র সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় অনুমোদন না পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। এর ফলে অপারেটর নিয়োগে আরো কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এ সেবা অব্যাহত রাখতে বিদ্যমান অপারেটরদের দিয়ে বার্থ পরিচালিত হবে নাকি নতুন কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা ঠিক করা হয়নি।
বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থে দায়িত্ব পালনকারী বর্তমান ছয়জন বার্থ অপারেটরের চুক্তির মেয়াদ মাসদুয়েক আগে শেষ হয়েছে। বর্তমানে পুরনো অপারেটররা বার্থ পরিচালনা করছে। নতুন করে বার্থ অপারেটর নিয়োগের লক্ষ্যে এক ধাপ দুই খাম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে ছয়টি লটে মোট ১২টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। এর মধ্যে ১১টি দর প্রস্তাব কারিগরি মূল্যায়নে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। পরবর্তী মূল্যায়ন শেষে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন দরদাতা ও গ্রহণযোগ্য ছয়টি প্রতিষ্ঠানের জন্য সুপারিশ করে।
দরপত্রে অংশ নেওয়া সুপারিশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বার্থ নম্বর ২ এর জন্য মেসার্স রুহুল আমিন অ্যান্ড ব্রাদার্স ৪৪ কোটি ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা, বার্থ নম্বর ৩ এর জন্য এ ডব্লিউ খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডকে ৪৩ কোটি ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ টাকা, বার্থ নম্বর ৪ এর জন্য ইউনাইটেড ট্রেডিং কোম্পানিকে ৪৪ কোটি ১ লাখ ৪ হাজার ২০০ টাকা, বার্থ নম্বর ৫ এর জন্য মেসার্স কসমস এন্টারপ্রাইজকে ৪৪ কোটি ৩২ হাজার টাকা, বার্থ নম্বর ৭ এর জন্য মেসার্স ফোর জুয়েল স্টিভিডোরিং সিন্ডিকেট লিমিটেড ৪৪ কোটি ২৪ হাজার টাকা এবং বার্থ নম্বর ৮ এর জন্য মেসার্স পঞ্চরাগ উদয়ন সংস্থা লিমিটেড ৪৪ কোটি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪০০ টাকা দরপত্র প্রদান করে।
উপরোক্ত ৬টি প্রতিষ্ঠানের সকলে বর্তমানে বার্থ অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। দরপত্রে পুনরায় তাদেরকে কোয়ালিফাই করা হয়। এছাড়া কন্টেনার বার্থের অপারেটর এ এন্ড জে, ফজলে এন্ড সন্স, মেসার্স বশির আহমেদ, এফকিউ খান, এম এইচ চৌধুরী, এভারেস্ট পোর্ট এন্ড লজিস্টিক এবং এমএইচ চৌধুরী টেন্ডার দাখিল করে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী সকল আনুষ্ঠানিকতা, মূল্যায়ন এবং অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। পরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ও প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটিতে প্রেরণ করে।
২২ জুলাই সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়–সংক্রান্ত বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বানের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে ফাইলটি ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
অভিযোগ করা হয়েছে, মূলত জেনারেল বার্থে কাজ করা ৬টি প্রতিষ্ঠানের সাথে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের ৬টি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান মিলেমিশে এই টেন্ডারে অংশ নেয়। নতুন করে কাউকে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি বর্তমানে বন্দরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে যারা কাজ করছেন তারা টেন্ডারের শর্তের কারণে অংশ নিতে পারেনি। বৈঠকে আলোচনার সময় সুপারিশপ্রাপ্ত দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন অভিযোগও উত্থাপন করা হয়।
অভিযোগ করা হয়েছে, জিসিবির ছয়টি বার্থ পরিচালনার জন্য উন্মুক্ত দরপত্রে ১২টি প্রতিষ্ঠান নামে থাকলেও কার্যত বর্তমানে বার্থ পরিচালনাকারীরাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উক্ত টেন্ডারে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া টেন্ডারে দরও অনেক বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত আর্থিক প্রস্তাব ছিল প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা।
অপরদিকে ২৯ জুলাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এক অফিস আদেশে দরপত্রটি পর্যালোচনা করে নতুন দরপত্র আহ্বানের বিষয়ে সুপারিশ দিতে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন সচিব, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো বন্দরে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পৌঁছেনি। চিঠি পাওয়ার পর সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ দীর্ঘদিন ধরে দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানে কন্টেনারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্রেক–বাল্ক, প্রকল্প যন্ত্রপাতি, স্টিল, সার, ক্লিংকার, খাদ্যশস্যসহ নানা ধরনের পণ্য ওঠানামা করা হয়। এসব বার্থে দক্ষ অপারেটর নিয়োগের ওপর জাহাজের অবস্থানকাল, পণ্য খালাসের গতি এবং বন্দরের সার্বিক উৎপাদনশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন এবং অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। এতে বর্তমান ব্যবস্থাপনায় মেয়াদ, অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালনা বা নতুন ব্যবস্থা গ্রহণসহ সার্বিক বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য পরিচালনা করে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বন্দর ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৮৪১ টিইইউএস কন্টেনার, ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার টন খোলা পণ্য এবং ৪ হাজার ৩২৪টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে। এই কর্মযজ্ঞে জেসিবির ৬টি বার্থের বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জিসিবির বার্থগুলোর অপারেটরের কর্মদক্ষতার উপর জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ও পণ্য খালাসসহ সার্বিক কার্যক্রম অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে দক্ষ অপারেটর নিয়োগের উপর গুরুত্বারোপ করে বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেছেন, অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি স্পর্শকাতর। অতীতে অপারেটর নিয়োগে নানা ধরনের সমঝোতা এবং গোঁজামিলের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র বলেছে, উচ্চপর্যায়ের কমিটি তাদের সুপারিশ দেওয়ার পর নতুন দরপত্রের শর্ত, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সময়সূচি নির্ধারণ করবে। এরপর আবার দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন এবং সরকারি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে অপারেটর নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ফলে জিসিবির ছয়টি বার্থে নতুন অপারেটর নিয়োগ আপাতত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এক্ষেত্রে বার্থগুলো কি বর্তমান অপারেটররা পরিচালনা করবে নাকি নতুন করে কোনো বিকল্প ভাবা হবে তা নিয়ে জল্পনা–কল্পনা চলছে।












