যুক্তি নির্ভর বিতর্ক চর্চা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ঘটায় এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যকে শ্রদ্ধা জানানোর মানসিকতা গড়ে তোলে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসিটি ও শিক্ষা) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান। তিনি বলেন, যারা বিতর্ক চর্চা করে তাদের চিন্তার ধারা সাধারণের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ও গঠনমূলক হয়। বিতার্কিকরা যেকোনো বক্তব্য দেওয়ার আগে তার পেছনের তথ্য, উৎস ও যুক্তি যাচাই করে; এতে তাদের যে মানসিকতা তৈরি হয় তা জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে কাজ করে। কেবল নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং যুক্তি দিয়ে ভিন্নমতকে বোঝা এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলে বিতর্ক।
তিনি গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ডিবেটিং সোসাইটি আয়োজিত ‘কলেজিয়েট স্কুল জাতীয় বিতর্ক উৎসব–২০২৬ এর পুরস্কার’ বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ তজল্লী আজাদ–এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েটস–এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তাক হোসাইন, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের মডারেটর জাফর আহম্মদ।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পাঠান মো. সাইদুজ্জামান শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারা ও সঠিক যোগাযোগ দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানান। এসময় তিনি ভালো ফল অর্জনের পাশাপাশি ভালো মানুষ ও যোগ্য নাগরিক হয়ে ওঠার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের অনেক সময় ক্রমাগত পড়াশোনার চাপে রাখা হলেও বাস্তব জীবনে সামাজিক ইন্টারঅ্যাকশন বা যোগাযোগের শিষ্টাচার কম শেখানো হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জনের পরেও অনেকে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে যোগাযোগহীনতায় ভোগেন।
পাঠান বলেন, যে স্কুল সিস্টেমের ভিতর দিয়ে আমরা যারা বের হয়ে আসছি, সেখানে কিন্তু আমাদের খুব কম শেখানো হয় কিভাবে আমরা সোসাইটির বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথে কথা বলব। আমি একজন রিকশাচালককে যখন হায়ার করব, তার সাথে কীভাবে ইন্টারঅ্যাকশন করা উচিত? এই রিকশা এদিকে আয়, আবার যাওয়ার সময় হয়ত ভাই তুই–তুকারি করে চলে গেলাম; এটা আমরা অনেকেই অজান্তে করে ফেলি। কিন্তু আসলে কী এভাবে বলা উচিত? রিকশা থেকে নামার সময় তাকে ধন্যবাদ দিলে কি আমি ছোট হয়ে যাব? না। ধন্যবাদ দিলে তার মধ্যে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করবে। যদি সুযোগ থাকে এ বিষয়টি স্কুলে চর্চা করা উচিত।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েটস–এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তাক হোসাইন বিতর্ক মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি চিন্তাশক্তিকে ধারালো করে এবং অন্যকে সহ্য করার মানসিকতা তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় জীবনে যে অস্থিরতা দেখতে পাই তার প্রধান কারণ হচ্ছে আমরা অন্যের মতামতকে সহ্য করতে পারি না। যদি সমাজের জন্য একটি সহনশীল সোসাইটি দাঁড় করাতে হয়, একটি সহনশীল সমাজ গড়তে হলে সবার মতামতকে সেখানে একমোডেট করতে হবে। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বিতর্ক আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। একইসঙ্গে একটি যুক্তিবাদী সমাজ তৈরিতে বিতর্ক অনেক সহযোগিতা করে। বিতর্ক মানুষের জ্ঝানের পরিধিকে অনেক বেশি সামনের দিকে অগ্রসর করে। মেধাকে ধারালো করে।
মোস্তাক হোসাইন বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধার কোনো কমতি নেই। তবে শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা বা উদ্দেশ্যহীন জ্ঞান আমাদের শিক্ষার্থীদের একপ্রকার রোবটে পরিণত করছে। শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন। তা না হলে আমরা প্রকৃত মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হব।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ তজল্লী আজাদ বলেন, বিতর্ক কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি যুক্তি, জ্ঞান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সহনশীলতা অর্জনের এক অনন্য চর্চাক্ষেত্র। একজন দক্ষ তার্কিক কেবল নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতেই শেখে না, বরং অন্যের মতামতকে সম্মান জানাতে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। তিনি বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক নেতৃত্বে গড়ে তুলতে বিতর্ক চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম বলেও মন্তব্য করেন।
প্রধান শিক্ষক বলেন, আজকের তরুণদের সত্য ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চায় এগিয়ে আসতে হবে। যুক্তিনির্ভর বিতর্ক চর্চার মধ্য দিয়েই একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও আলোকিত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। জয়–পরাজয় বড় কথা নয়, এই চর্চায় যুক্ত হওয়াটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।
জাফর আহম্মদ বলেন, বিতর্ক মানেই কেবল মঞ্চে উঠে কথা বলা নয়; বরং অন্যের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, অন্যের মতামতকে সম্মান জানানো এবং যুক্তি দিয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাই বিতর্কের মূল উদ্দেশ্য।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ডিবেটিং সোসাইটি জানায়, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ৩০টি দল অংশ নেয়। গত দুইদিন ধরে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। স্কুল শাখায় ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন ও চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল রানার্স আপ হয়। উন্মুক্ত শাখায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন ও সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজ রানার্স আপ হয়।












