চূড়ান্ত শব্দের ভ্রমণ

নৈরিৎ ইমু | শুক্রবার , ২৯ জুলাই, ২০২২ at ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ

`…those whose thinking and teaching go no farther than a knowledge and exposition of rhyme schemes, scansions, authors, story and even style of a poem are almost certainly missing the true essence of poetry’- P. Gurrey. [The Appreciation of Poetry]
আমি তো সিজোফ্রেনিয়া রোগী, সৃষ্টির প্রথম নদী পিশোন তীরে বসবাসরত এক কুঁজো বুড়ি আমাকে খুন-টুন করার পরিকল্পনা সাজাচ্ছে, শিশি থেকে শিশিতে ঢেলে মিশ্রণ বানাচ্ছে বিষাক্ত রঙ্গিন শরবত। জনঅরণ্যের কোনো ভাষায় আমি বলি না কথা। অসুর দেশের সর্প-শ্বাসের মতো অবিরত একটা কণ্ঠ আমার কানে ফিসফিস করে। যে সাপ কোনোকালে আমার বন্ধু ছিলো, প্যাঁচিয়ে ছিলো সারা গায়। অনতিদূরে ক্রমে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া প্রজাপতি উড়ে, ছোট্টবেলায় যেটি আমার মা এঁকে দিয়েছিলেন বক্ষজুড়ে। ছায়ার মতো যা আমাকে অনুসরণ করে আর তাকে ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হই আমি। ধরতে পারলেই মিলিয়ে নেয়া যেতো জন্মকুষ্টি, সেই ব্রক্ষ্মকিট জানে আমার মৃত্যুর দিন।
ছুটে যাই, খসে পড়ে বসন-ভূষণ। কুম্ভভিড়ে সাধুদের দলে গিয়ে মিশি। ভেক ধরি। কেন’বা নয়? ছক কাটা ঘরে, কোত্থেকে বিধাতা বলে দাবী করে কে আমাকে চালায় গুটি! অবশেষে কিছুটা ঊর্ধ্বলোকে চা চুমুকে ধর্মতর্ক চলে জরাথুস্ট্রর সাথে। মুখভর্তি শ্মশ্রুরাশি, রুদ্ধদ্বার ঘরে সূর্যের ক্ষীণ আলোয় স্মৃতিকাতর হয়ে ঘুমফুল ঘেঁটে ঘেঁটে ছুটি দিই সমস্ত কৃষ্ণপ্রিয়তা। ফলে প্রত্যুষে ঘষতেঘষতে Clr হলুদ দাঁত, একটা হুইসেলকে গুঁড়ি করি কানে। পকেটে হাত দিতেই অনুভব করি পেঁজা তুলো। এইখানে কোথাও হারিয়ে ফেলেছি মূল্যবান বৈদূর্য মনি। অথচ মেইলবক্সে জমা হয় পাপড়িডানা। মস্তিষ্কে কেউ ফুঁকে দিচ্ছে এনেস্থিসিয়া মন্ত্র। বিমূর্ততায় অবিচ্ছেদ্য সময়ের দৃশ্য ঝাপটে পড়ে রেটিনায়, আলোহীন মঞ্চে কেউ জ্বালাচ্ছে সিগারেট! নৃশংস ধোঁয়া চিনে ফেলছে শ্মশানঘাট। ফ্রেমের আয়তাকারে পূর্বজন্ম ঠেসাঠেসি। ধুর শালা, কে বাজায় ধুমধারাক্কা রবীন্দ্ররিমিক্স? লিখি অর্কিড, আগ্রহীরা বলে বিদ্যুতের বনে স্পেসময় আর কোনো অনাবৃতাপুষ্প হবে না। আমি শ্বেতহীম রিহার্সেলে জমে জমে শিশিরাক্রান্ত হই, জ্বরকে প্রেমিকার মতো আদর লাগে। গুচ্ছগ্রামে দেখা সাইকেল চালিয়ে আদিবাসী যে মেয়েটি ব্রাক ইশকুলে যেতো, তার বুশবুশে গায়ের গন্ধ নাকে আসে। বস্তিপাড়ায় জিনিয়া দোকানের ছোকড়া, যার তৃষ্ণা নিভায় কারো গার্গলের জল, আমি তো সেই সমাজের, সেই পৃথিবীর দ্বিপদী।
লিখি পেচ্ছাপের গন্ধ, রেবেকার ছেঁড়া ব্লাউজ, এক দলা থু, বোটকা গন্ধের হরিপদ, প্লাস্টিক পুতুলের মতো ছিঁড়ে ফেলা লাশের নাড়িভূড়ি। অভিযুক্ত আমি, কাঠখোট্টা বলে দাবী। হাহা করে উড়ন্ত বুলেট। উন্মাদ ভ্রমণ শেষে মাংশসমেত কঙ্কাল নিয়ে ফিরি, আসি সৃষ্টির সম্মুখে। এলিমিনেশনই আশ্রয়, বাক্যের কাব্যরূপে নিতান্ত শব্দার্থের অতিরিক্ত আভাসে ভাসি। আভাসের জন্য খুঁটে যাই নিজের যোগ্যতা। অযোগ্য নগণ্য আমি। দুরূহতার কপাট খুলতে অনুষঙ্গের অন্তর্নিহিত অর্থ, ছায়া দেখে মনে হয়- আরে, একে তো আমি চিনি! হঠাৎ কাঁপুনি জাগে, ঘোর ঘোর সব আবার মনে হয় চিনি না, জানি না ওকে। প্রকট অ্যালিয়েনেশন, আদম রিপু হতে বাস্তব কি অবাস্তব সংকেত ও ইঙ্গিতে হুট করে সযত্নে ডুব। কানে বাজে বহুমাত্রিক চিৎকার, আমার সাড়া আসে না। তন্নতন্ন করে খুঁজি পশ্চাৎপট, উপকরণ, মিশ্রণ-ক্রিয়া বা শারীর সন্ধিবিদ্যা; মানস মিথষ্ক্রিয়ায় ঘনিষ্ঠতা অথচ সামান্য গ্রীন সংযোগ সিগন্যাল কম কী! কাটিছাটি বারবার, বহুবার। চিন্তার প্রবাহ ধরে শব্দের অনুষঙ্গের অর্গল মুক্ত হবার সাথে সাথে খসে পড়ে যত অবগুন্ঠন, মিটে যায় দুর্লঙ্ঘ ব্যবধান। আমি কি আদৌ কোন ব্যবধানে ছিলাম? অর্ধেক বিস্কুট খেয়ে বাকী অর্ধেক পকেটে পুরে রাখি। ক্ষুধা ক্রমে ঠেলে নিয়ে যায় বিষ্ঠার স্বাদ পর্যন্ত। বুঝি, মানুষ সব খায়, খাবেও। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, গুণ দা নিজের উকুন খান। রসিকতা বৈকি!
শয্যাসময়ে ভূকম্পনের কবলে পড়ি, ঘূর্ণায়মান ছাদ উড়ে যায় সুদূর গগনপানে। চারটা দেয়াল-আবদ্ধ পাঁচ বাই পাঁচ ফিট ঘর হয়ে যায় যিশুর এদোন বাগান। একা একা ঘুরে নতুন কিছু দেখি। স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অব পাওয়ারফুল ফিলিংস এবং অন্যদিকে অরিজিন অব ইমোশান রিকালেক্টেড ট্রাংকুইলিটি- এই দুইভাবে ওয়র্ডসওয়র্থের কবিতা নাকি সনাক্তকরণ চলে। অভিজ্ঞতার বৃত্তস্থিত বিষয়বস্তু এবং ছাড়িয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বৃত্ত, কেন্দ্রবিন্দুতে আবিষ্কার করি অম্লান, সুবাসে অটুট কাব্যতা। তাৎক্ষণিক অর্থের অতিরিক্ত গভীরতর অর্থগুলোর অফুরান রেলিভ্যান্স। স্বাভাবিক প্রসঙ্গ আসে ধীর উন্মোচনের, আর নতুনত্ব। মরে না বারবার পাঠ আগ্রহ, দেখা মিলে মৃত্যুঞ্জয়ীর। নতুনত্বে গিয়ে আবার প্রশ্নবোধ। যতসব প্রচলিত রীতি, ভাষা-ভাবনা, বিষয়ের বাইরে চর্চায় বিভ্রান্তি। নতুনত্বের অভ্যুদয়ের বিভ্রাট। আমি তো বর্বর যুগের লোক, পারমাণবিক যুগে এসে নিজের জং ধরা তলোয়ার লুকিয়ে ফেলি লজ্জায়। আচমকা শব্দে বক্ষ নিরীক্ষা করি। অনুভবের চেষ্টা করি লোহিত উষ্ণ স্রোত। পরক্ষণেই হয়ত বেজে উঠে রিক্সার বেল, চামচ যাদুসুর চায়ের কাপে। আমি আর দূষিত বাতাস বয়ে যাই সমান্তরাল। আরও একবার নিজেকে কাঠখোট্টা বানিয়ে একটু পেছনের কথা কপচাই- ‘লিভস অব গ্রাস্‌’ ওয়ালট হুইটম্যান রচিত কাব্যসংকলন। কার্ল স্যানডবার্গ লিখিত ভূমিকা হতে দেখি এক ঝলক সমালোচনা- `This book should find no place where humanity urges any claim to respect, and the author should be kicked from all decent society as below the level of the brute. There is neither wit nor method in his disjointed babbling \, and it seems to us he must be some escaped lunatic, raving in pitiable delirium.Ó Boston Intelligencer, May 3, 1856
এটুকুতেই শেষ ভাবলে বেশ। কিন্তু বোদলেয়ার নতুনত্বের সূচনা সম্পর্কে শিরার বলেছিলেন, ‘ভয়ংকরের সীমানা শেষ হয়ে গেলে, মানুষ তখন ন্যাক্কারজনকভাবে তলিয়ে যায়। নোংরা বিষয়ের ছবি আঁকতে থাকে। নোংরামিই তার ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠে; তার ভেতরেই সে গড়াগড়ি খায়। কিন্তু সেই নোংরামির নতুনত্বও ফুরিয়ে যায় একসময়; মৃতদেহ পচে গলে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং শেষে এমন একটা অকথ্য অবস্থা তৈরি হয়, কোনো ভাষাতেই যার কোনো নাম নাই। ব্যস, এই যে অবস্থা তাই হচ্ছে বোদলেয়ারের কাব্য।’ [A History of Modern Criticism: 1750-1950]  আশা করছি এমন কথার সাথে আপনিও একমতে আর নেই, কারণ আপনি ততদিনে জেনেছেন হুইটম্যান বা বোদলেয়ার কী! তাছাড়া নতুনত্ব বিষয়ে যেহেতু আপনাকে হতে হচ্ছে সুস্বাদু ক্ষীর! নতুবা নিস্তার নাই, যে কোনো স্থায়ীত্বের অভাবনীয় পরিণতি ঘটেছে নতুন কিছুতে, হয়তো সেটা উগ্র গন্ধ ছড়ানোর পরও। তখনই শব্দটি বেজে ওঠে, ক্রিয়েটিভ! তাই সমালোচককে বলা হোক উত্তম অভিনব পথের দিশারী, কেননা সূচনা এভাবেই হয়।
শুধু শ্বাস! কিংবা শ্বাসহীন রক্তনালীর তাপ! আলাদা আলাদা করে দেখি। অগ্নিদগ্ধ যকৃৎ, অন্তঃমিল রেখে রেখে খেলে গেছে খয়েরীদাগ। জিরানিয়াম বৃক্ষ হতে চেয়ে সে দাগ ক্রমশ রচেছে মর্গের পথ। আমি বুঁদ হই, উজ্জ্বল দুঃখের পাশে ঘৃনিত মাতলামোর হাত ধরে এক নক্ষত্র পুড়ে যাওয়া ও সমুদ্রগর্ভে স্নান সেরে আসা হুর ঝিলিকের মাঝরেখা বরাবর। ফলত ধাবিত হই ক্রিয়েশনের দিকে। প্রাণনাথ মুছে লিখি রূহনাথ। আমি তো ক্ষ্যাপা। খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা কোনো এক কুকুরীকে জড়িয়ে ধরি। তার পচা-গলা, মল চাটা জিভের শরীর বেয়ে নেমে আসে লালা। এ-কৃতজ্ঞতার অর্ঘ্যকে মূল্য দিই। যেমন দিয়েছিলাম গোলাপী এবস্যার্ড বিড়ালের মার্বেল চোখ দু’টো। আমি তো ক্যাকটাস গোত্রের নই, তবুও মাঝেমধ্যে সারা গায়ে কাঁটা জন্ম নেয়, কেন নেয়? কখনও কখনও আমার সমস্ত চর্ম হয়ে উঠে বাকল সাদৃশ্য। স্থানে স্থানে বের হয়ে আসে শাদা শাদা কষ। আর এই বহুগামীতার সূত্র মাধ্যমে কোনোকালেই প্রবেশ অধিকার পেলাম না আমি।
একটা নীল পাহাড়ের ধোঁয়াশাজমাট অজানা গুহায় পড়ে আছে আমার ধ্যানের জামা। আরোহীর বেশে আমি শাইনিং সানওয়ে ভাঙ্গছি, পৌঁছাতে চাইছি দ্রুততম লক্ষ্যে। সুবাদে, তুমুল ডিপ্রেশন ফুটিয়ে তোলে বিন্দুঘাম। ঘামের ফোঁটায় নুনের অতলে তলিয়ে ফেলি নিজের আত্মা। অগত্যা অন্ধ দাঁড়কাকের সাথে করি শলা। বস্তুরূপ গণ্ডির গভীরে নিহিত রূপের সন্ধান ধরা দেয় অনন্য দৃষ্টিকোণে, দৃশ্যত হয় স্বাভাবিক বস্তুর সৌন্দর্য নতুন তাৎপর্যে। ওয়ার্ড অর্ডার, পারমুটেশন কম্বিনেশনের দিক থেকে নিওফিলিয়া প্রভাবের রহস্যময়তা ভাঙ্গতে সাময়িক অস্বস্তি। এর কোনো প্যারাপাইরল গ্রুপ নেই, কোনো এন্টিবায়োটিক কেশ খসিয়ে আয়ু কমিয়ে অস্বস্তির ধাপ উৎরানো ভাবের ভগ্নাংশের নিগূঢ়তায় অভিনব বাঁক আত্মস্থ করার কায়দাও নেই। আছে অভ্যস্থতার জরুরত। ব্যতিক্রম নেই তাও না বলি। সমসাময়িক কবিতায় শ্লীল-অশ্লীল নামক যে তোলপাড় বা নাক ছিটকানো সুধীরোগ, আসলে তা ব্যারিকেড বলে ভাবি। অথচ বাধার সম্মুখীন হয়ে কিছু শব্দ ক্রমশ জারজ। না থাকা যোগ্য নিষেক, সবধরণের অস্বস্তি আর না বোধককে পাশ কাটিয়ে সূচিত যুগান্তকারী পরিবর্তন। চিত্রাঙ্গদা’র বিষয়বস্তু অশ্লীল ভেবে রবীন্দ্রনাথের জন্য দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ‘এ পুস্তকখানি দগ্ধ করা উচিত’ দীর্ঘশ্বাস মন্তব্য। প্রসঙ্গত না সাজলেও বলি ‘রঙ-রাসিয়া’! নগ্ন পোর্ট্রেটে কারো আত্মহননের ছায়া, যদিও সমস্ত স্থির চিত্রজুড়ে মঙ্গলকামনা। আর পূজারীদের সেজদায় রমনী দেবী না মাংশ? সহসা বস্ত্রহরণ চিত্রের শিল্পকীর্তিজালে ধরা দেয় প্রেমিকা গোপন। এক বিরুদ্ধ মনোভাব কোত্থেকে জ্বলে উঠে ধপ করে। নগ্নতা, নগ্নতা থেকে ক্ষোভ। ক্ষোভ থেকে ধ্বংস এবং পরিশেষে প্রতিষ্ঠা লাভ। মূলত পরিচালক দরজা খুলে আমাদের ছুঁড়ে দিয়েছে নতুন এক ভাবনার দিকে। আমরা তার রেশ ধরে রাখি অনেক অনেকক্ষণ।
গ্রামের ছেলে বলে সমুদ্র দেখার আগে হালদার চরমতো স্থানে প্রথম বানিয়েছিলাম বালিঘর, জলের ঘূর্ণি দেখে দেখে খুইয়েছি বাল্যকাল। রাখাল কেবল বালক হয় না, অতি বার্ধক্যের এক লোক যখন মাঠ বা শস্যের খেতের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় কতগুলো চতুষ্পদ, তখনই মনে হয় ‘রাখাল’ শব্দের সাথে তার পরিচয়ও হয়নি হয়ত! এখানেই ভাষার স্তর রচিত। সহজ শব্দ সমাহার নিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন ভাবালুতায় মুখোমুখি জীবনানন্দ দাশ। সুগভীর মর্মস্পর্শী অন্তরবর্তী অর্থের আভাস নিয়ে অতৃপ্তির ভেতরে অনেক ডবকা ফাঁক ও ধাঁধায় আটকে রই। বুঝতে পারি কঠিনত্বের অভিযোগ থেকে উত্তরণ শেষে সহজতর রচনার মধ্যেও যে ধুম্রজাল বোনা হয়ে থাকে তার স্পষ্ট কোন সীমারেখা অতিক্রম অতটা সহজসাধ্য নয়। মূলত পরিচিত শব্দ শনাক্ত করা হেতু ঠিকঠাক তার ভাববস্তুর স্বরূপ আবিষ্কারে ব্যর্থ হবার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আচমকা ভাবি নিজের চোখ উপড়ে ফেলে এসেছি সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্যপেটিতে, তবুও চোখহীন ঘুমুতে কেমন জানা নেই। প্রতিদিন দালান-থাইগ্লাসের পেছনে নতুন নতুন নাটক মঞ্চায়ন। নারী বা পুরুষ শরীর শুয়ে পড়ে নিজের গলায় শীতল গিঁট দিয়ে, অমোঘ নিস্তারের পরবর্তী সময়ের কাছে মেলে ধরে নিজস্ব ভার। এখনও কংক্রিটের স্তূপের নজরদারিতে পিচ ঢালা পথে মাহুত আসে, কবুলকারিণীকে কবুল বলতে ছুটে ঘোড়ার গাড়ি। রোজকার মধ্যরাত ছিঁড়ে আসে অযাচিত দস্যু বনহুর। নগরবিলাসীরা তখন খিল এঁটে ভার্চুয়াল সাঁতারে মগ্ন! ঘুঘুস্মৃতিক্রান্ত ধুলিধূসর ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সিঁদুরে মনোভাব, নখ আঁচড়ের অস্ফুষ্টতায়- বাঁচাও বাঁচাও। এই ফুটপাত ভরে শুয়ে আছে ভিনগ্রহের মানুষ!
ইংরেজ কবি টমাস গ্রে ১৮০০ সালে মন্তব্য করেন, ‘কবিতা কখনও তার সমকালীন ভাষায় রচিত হয় না।’ অলিভার গোল্ডস্মিথ সম্ভবত সেই মতানুসারে বলেন, ‘সব শব্দ নয়, প্রতিটি ভাষাতেই কবিতা ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু যোগ্য শব্দ থাকে যা আমাদের কল্পনাকে দীপিত করে আর কর্ণকে আরাম দেয়।’ ওয়র্ডসওয়র্থ এসে জানান দেন, ‘শুধু সেই ভাষাতেই কবিতা লেখা উচিত যা কিনা মানুষের নিত্য ব্যবহার্য।’ তর্ক চালালেন কোলরিজ, যিনি বিশ্বাস করতেন কাব্যিক সুষমায়। অতঃপর সব কিছু সরিয়ে খুলে বসি জনৈক তরুণ কবিকে লেখা রাইনার মারিয়া রিলকের চিঠি। ভাষা তো সদা প্রবাহমান, পরিবর্তন হয় এমন সব জিনিসের মধ্যে ভাষা অন্যতম। তখন মনে হয় কালের বাইরে , শব্দের বাইরে এক অন্যরকম শূন্যতার আনন্দকে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টাকেই তো ভালোবেসেছি। অন্ধকার, অন্ধকারে বসে থাকি, আর চোখ সয়ে যায়। সয়ে যাওয়ার বিজ্ঞান আমাদের জানা। কিন্তু আঁধার সংক্রান্ত এ মনোযোগ বিঘ্ন করে কেউ যদি বলে, অন্ধকারে বসে থাকার অর্থ কি? অথচ বিজ্ঞান তারও বোধগম্য, অবচেতনে আছে এমন ঘটনার কথা।