চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানো ৩০ জনের ২০ জনই নিহত যুদ্ধক্ষেত্রে : এসআরবি

| বৃহস্পতিবার , ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ

নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে রাশিয়া নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। পরে জোর করে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। এমন ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার পরপরই জোর করে তাদের স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। আর যুদ্ধে যাওয়ার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন ১৭ জন। পরে আরও তিনজন মারা যান।

গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি–১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান এসব তথ্য দেন। রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় আহত হয়ে ফিরে আসা একজনের বাবার দায়ের করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এসআরবি এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে বলে তুলে ধরেন তিনি। চাকরি দেওয়ার কথা বলে যারা তাদের রাশিয়ায় পাঠিয়েছেন এমন দুইজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও দেন এসআরবি এর এই কর্মকর্তা। গ্রেপ্তার দুজন হচ্ছেন– মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের লেন্টু (৫০)।

রাশিয়া ও কিরগিজস্তানের দুইজনের সহায়তায় বাংলাদেশের এ চক্র গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুর থেকে তরুণ ছেলেদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠায়। এ চক্রে আর কারা আছে তাদের খুঁজে বের করতে এসআরবি মাঠে কাজ করছে বলে তুলে ধরেন তিনি।

এসআরবি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, রাজন হোসেন (২১) নামের একজনকে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। এজন্য তার কাছে সোয়া ৮ লাখ টাকা নেয়। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর রাজনসহ প্রায় ৩০ জনকে জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায় এবং দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। চার দিন কষ্ট করে হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসা নেন রাজন। একপর্যায়ে আহত অবস্থায় তিনি পালিয়ে দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন।

দেশে এসে ক্ষতিপূরণ দাবি করায় রাজনের পরিবারকে গালিগালাজ, মারধরের চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকি দেয় মিজানুর রহমান। এরপর রাজনের বাবা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, এ মামলায় সংশ্লিষ্ট থানার তদন্ত কর্মকর্তা সহায়তা চাইলে এসআরবি তদন্তে যুক্ত হয়। পরে মঙ্গলবার ফরিদপুরের নগরকান্দা থানাধীন আটাইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিজানুর রহমান (৫৫) এবং ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ থেকে আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। এদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।

এসআরবি ১০ এর অধিনায়ক প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের প্রতিশ্রুত কাজে নিয়োগ না দিয়ে রাশিয়া সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়। এই ৩০ জনের মধ্যে প্রায় ২০ জন যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান এবং দুইজন কোনো রকমে পালিয়ে দেশে ফেরত আসেন বলে তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, এদের বাইরে বর্তমানে মস্কোর একটি হাসপাতালে দুজন চিকিৎসাধীন এবং অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। ফিরে আসাদের বরাতে তার ভাষ্য, বাংলাদেশ থেকে যাদের পাঠানো হয়েছিল তাদের কেউ যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না।

যে দু’জন আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন তাদের একজন রাজন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসাদুজ্জামান বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আঘাতে তার কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাজন ক্যাম্পে পৌঁছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএলপিজির দাম ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব, গণশুনানি করবে বিইআরসি
পরবর্তী নিবন্ধআদালতের জবানবন্দিতে এক শিশুর বীভৎস নির্যাতনের বর্ণনা