গল্পটা শুনেছিলাম চাটগাঁইয়া গানের কিংবদন্তী আবদুল গফুর হালীর মুখে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় একটি বিচিত্রা অনুষ্ঠানে গান করতে গিয়েছিলেন। গানের দলে আঞ্চলিক গানের তুমুল জনপ্রিয় জুটি শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবও ছিলেন। সেদিন শুরু থেকে দর্শকদের আচরণ দৃষ্টিকটু লাগছিল। গান শুরু হলে ঘটল মহা বিপত্তি।
প্রথমে মঞ্চে এলেন শেফালী ঘোষ; গান ধরলেন ‘সূর্য উডের লে ভাই লাল মারি…।’ পাশ থেকে কেউকাটা ধরনের কেউ একজন বলে উঠলেন, ‘ওবা শিল্পী, রসর গান গঅ, নইলে লামি যঅ’। এবার উঠলেন শ্যাম। গাইলেন ‘চালইন চালের চালের, চালইন ঘুরের ঘুরের/উ–রে মল্লুইক্ষা ধান, নিচদ্দি চইল পরের।’ এবার সামনের সারির দর্শকরা হৈচৈ করে উঠলেন এই গান চইলত নঅ, আঁরা টিয়া দি টিকিট কাডি তঁশা চাইত আইস্যি, হালদাফাডা গান গঅ।’ প্রসঙ্গত, দক্ষিণাঞ্চলে ‘হালদাফাডা’ গান মানে অশ্লীল গান।
আবদুল গফুর হালী দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ। তিনি মঞ্চে উঠলে শোরগোল একটু কমল। তিনি করজোড়ে বললেন, ‘আপনারা যে ধরনের গান শুনতে চাইছেন, এখানে কেউ সেই গান করেন না।’ এরপর তিনি গেয়ে উঠলেন, ‘দুই কূলের সোলতান ভাণ্ডারী/দুই কূলের সোলতান/এ সংসারে কে আছে আর এমন দয়াবান’। মাইজভাণ্ডারী গান শুনে দর্শক– শ্রোতাদের উশৃঙ্খলতা দ্রবীভূত হলো। পরে ক্ষুব্ধ দর্শক বেড়িবাঁধ কেটে দিয়ে ঝাল মেটালেন, জোয়ারের পানিতে ভাসল অনুষ্ঠানস্থল। শিল্পীরা অনুষ্ঠান শেষ করে হাঁটু পানিতে এলাকা ছাড়লেন।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের শ্রোতাদের বড় অংশই রুচিশীল গানের সমঝদার। কিন্তু ক্ষুদ্র একটি অংশ বরাবরই অশ্লীল গানের জন্য পাগল। এবং এই ধারার শ্রোতাদের বড় অংশই চট্টগ্রাম–কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা। বাঁশখালী, পেকুয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার, উখিয়া–টেকনাফ অঞ্চলে সেই সত্তরের দশক থেকে অডিও ক্যাসেটে, মঞ্চে অশ্লীল আঞ্চলিক গান চলে আসছে, এসব গানের শিল্পীদের কারণে মূলধারার আঞ্চলিক গানের শিল্পীরা কোণঠাসা ছিলেন। এখনো অশ্লীল শিল্পীদের গানে ফেসবুক, ইউটিউব সয়লাব। পেকুয়ার উজানটিয়ার এক নারী শিল্পীর কণ্ঠে এমন কিছু গান শোনা যায়, যা উচ্চারণের অযোগ্য। তরুণরা এসব গানে আসক্ত। রুচির দুর্ভিক্ষ আর কাকে বলে!
অবশ্য, কক্সবাজার অঞ্চলের আঞ্চলিক গান অনেক সমৃদ্ধ। এখানে সুরসাগরে ঢেউ তুলেছেন কিংবদন্তী শিল্পী আহমদ কবির আজাদ ও বুলবুল আকতার, জনপ্রিয় শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদ, রবিউল আজাদ (পরে রবি চৌধুরী), আমানুল্লাহ গায়েন ও আহমেদ বশির প্রমুখ। ওই অঞ্চলের গানের সমৃদ্ধির পেছনে চট্টগ্রামের খ্যাতনামা সংগীতজ্ঞ এম এ রশিদ কাওয়ালের অবদান অবিস্মরণীয়। প্রথমোক্ত চার শিল্পীর ‘স্রষ্টা’ হলেন তিনি।
কক্সবাজার অঞ্চলে গান করতে গিয়ে অশ্লীল গানের দর্শকদের কারণে অনেক সময় শ্যাম–শেফালীর মতো কালজয়ী শিল্পীকেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে হেডমাস্টরখ্যাত শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে তিক্ত হওয়ার কথা। কারণ ১৯৮০–৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি কক্সবাজার অঞ্চলে আঞ্চলিক গানের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীদের একজন ছিলেন। ২০০২ সালে ‘হেডমাস্টরে তোঁয়ারে তোয়ার’ গান গেয়ে দেশ–জোড়া খ্যাতি পান সিরাজ। কিন্তু আশির দশকে চকরিয়ার ঘৌড়দৌড় মেলা ও বিভিন্ন ভ্যারাইটি শো’তে প্রলয়ংকরী দর্শক–চাহিদার কারণে তাকেও এমন কিছু আঞ্চলিক গান গাইতে হয়েছে যা তার সাথে যায় না। সিরাজের তেমনই একটি গান…
অ বইন, নাইচ ত আইস্য নাচো
ঘুরি ঘুরি নাচো, ডাইক্যা পাইক্যা নাচো।
ওয়া মার্ আর পিছে মা
©যেন্ মনে হয় এন্ গরিচ্।
এক্কান কথা গরির মানা, সাম্মর ঠেলা ন মারিচ্।।
(ক্যাসেট ও ইউটিউব থেকে সংগৃহীত)
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব গান কি আদৌ আঞ্চলিক গান? গত ৫০ বছরে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের যে ঐতিহ্য, যে আঞ্চলিক গান আজ বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত, সেখানে এইসব অশ্লীল গানকে আদৌ আঞ্চলিক গান বলা যায় কি? দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এইসব অশ্লীল গান শুনে অনেকের মনে মূলধারার আঞ্চলিক গান সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে, অনেকে আবার অশ্লীল গানকে উপজীব্য করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান সম্পর্কে ঘৃণা ছড়াচ্ছে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান বাংলা লোকসংগীতের একটি স্বতন্ত্র সমৃদ্ধ ধারা। আস্কর আলী পণ্ডিত, কবিয়াল রমেশ শীল, মোহাম্মদ নাসির, মোহাম্মদ হারুন, খায়রুজ্জামা পণ্ডিত প্রমুখ হলেন আঞ্চলিক গানের প্রধানতম রূপকার। মলয় ঘোষ দস্তিদার, মোহনলাল দাশ, অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, শেফালী ঘোষ, এম এন আখতার, আবদুল গফুর হালী, ঊমা খান, ইয়াকুব আলী সরকার, লক্ষ্মীপদ আচার্য্য, সন্ধ্যা রানী দাশ, মিয়া মোহাম্মদ বদরুদ্দিন, সঞ্জিত আচার্য্য, কল্যাণী ঘোষ, কান্তা নন্দী, বুলবুল আকতার ও সৈয়দ মহিউদ্দিন আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তী। তারা কেউ গীতিকার–সুরকার, কেউ শিল্পী। এছাড়াও জনপ্রিয় শিল্পী–গীতাকারদের মধ্যে রয়েছেন নুরুল আলম, জেলি হাসান, লাকী আচার্য্য ও গীতা আচার্য্য প্রমুখ।
(চলবে)











