চট্টগ্রামে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গতবারের তুলনায় পাসের হার ও জিপিএ–৫ এর সংখ্যা দুটোই কমেছে । এবারের চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ; জিপিএ–৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯২৯ জন। ২০২৫ সালে এই বোর্ডের অধীনে পাসের হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ; আর জিপিএ–৫ পেয়েছিলো ৬ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী। তার আগের বছর ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৩২ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছিল ১০ হাজার ২৬৯ জন। শনিবার বেলা ১১টায় দিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড মিলনায়তনে ফল ঘোষণা করেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমাদের পাসের হার গতবারের কাছাকাছি। এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছে এবং অভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন হয়েছে। তাই মূল্যায়ন যথাযথ হয়েছে। সেকারণে হয় এ বছর জিপিএ–৫ অনেক কমেছে। এছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামরা ছিল। তাই শুরুর দুয়েকটি পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ভীতি কাজ করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছুদিন বন্ধ ছিল পরীক্ষা। হয়ত পড়ার টেবিলে ফিরতে একটু সময় লেগেছে। এটাও একটা কারণ হতে পারে।’
এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় বারবার এমন ফল বিপর্যয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের প্রত্যেক স্তরে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির বিষয়টিও উঠে আসছে। এর নেপথ্যে কলেজ ও মাদরাসাগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রকট সংকট রয়েছে বলেও মনে করছেন শিক্ষা–সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, ক্লাসে শেখানো ও পরীক্ষার পদ্ধতিতে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিখছে কম। এতে পরীক্ষায় একটু ভিন্ন কাঠামোর প্রশ্ন এলেই তারা গুলিয়ে ফেলছে। অর্থাৎ যে বিষয় তারা পড়ছে, তাতে দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে পরীক্ষায় খারাপ করছে তারা। শিক্ষাব্যবস্থার এ ত্রুটি ও দুর্বলতার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রকট সংকটকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের শিক্ষক সংকট প্রকট। এ কারণে এ দুই বিষয়ে ফেলও বেশি। কলেজ–মাদরাসায় সশরীরে ক্লাস নেওয়া শিক্ষকরাও শিক্ষক সংকটের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে শিক্ষার মানের সঙ্গে ভালো ফলাফলও নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অভিভাবকরা।
বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে শেখানোর ক্ষেত্রে ত্রুটি ও দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। পাশাপাশি পরীক্ষার পদ্ধতি ও খাতা মূল্যায়নেও গলদ দেখছেন তারা। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট দূর করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে জোর দিয়েছেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা।
বর্তমান সৃজনশীল পদ্ধতির প্রণেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান পত্রিকান্তরে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা শেখেনি বলেই লিখতে পারেনি। তারা বুঝলে, শিখলে অবশ্যই লিখতে পারতো। খুব ভালো বা এ–প্লাস না পেলেও তো পাস করতো। কিন্তু তারা একেবারেই শেখেনি বা তাদের শেখানো হয়নি। এখানে শিক্ষার্থীদের অবহেলা ও অমনোযোগিতা দায়ী হতে পারে। আবার শিক্ষকদের ঘাটতিও দায়ী হতে পারে। আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ ও মতামত হলো–শিক্ষার্থীদের চেয়ে শিক্ষকদের সংকট ও সীমাবদ্ধতা এক্ষেত্রে বেশি। তারাই শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারেননি বা চেষ্টাও করেননি।’ শিক্ষক সংকট ও প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক সংকট ও শিক্ষকের প্রশিক্ষণের ঘাটতিও অবশ্যই বড় কারণ। পাশাপাশি সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নের যে নিয়ম, তা না মানায় প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে কারিকুলাম সংযোজন–বিয়োজন করে বোধগম্য করতে হবে।’ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি যে রয়েছে, এটা স্বীকার না করে উপায় নেই। আমাদের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট রয়েছে। আবার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। শেখানো এবং পরীক্ষার মধ্যে তফাতের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এসব ঘাটতির কারণে পাসের হার ও জিপিএ–৫ কমেছে।’
এদিকে, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ–৫ প্রাপ্তি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ফলাফলের এমন পতন বা বিপর্যয় কখনই প্রশংসনীয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শিখন–অর্জন, পাঠদান পদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা ও শিক্ষার পরিবেশে নানা ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।







