চট্টগ্রামের শস্যভান্ডার খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলে এবার বোরো ধানের ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। একদিকে কালবৈশাখীর ঝাপটায় কিছু জমির ধান নুয়ে পড়া, অন্যদিকে শ্রমিকের আকাশচুম্বী মজুরি ও ধানের নিম্নমুখী বাজারে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা। কৃষকদের দাবি, ভালো ফলন হলেও উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের চড়া দামের কারণে লাভের বদলে গুনতে হচ্ছে লোকসান।
গুমাইবিলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তপ্ত রোদে ঘাম ঝরিয়ে ধান কাটার উৎসবে মেতেছেন কৃষকরা। তবে এই উৎসবের আড়ালে রয়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। কৃষক মো. শফি জানান, এক কানি জমিতে আবাদ করে তিনি ১০০ আড়ি (১০০০ কেজি) ধান পেয়েছেন। কিন্তু শ্রমিক চুক্তি করতে হয়েছে ৮ হাজার টাকায়।
বিশাল এলাকাজুড়ে চাষাবাদ করা আবু তৈয়বের হিসাব আরও করুণ। ১২ কানি জমিতে আবাদ করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারে প্রতি আড়ি ধানের দাম ২২০–২৩০ টাকা। এই দরে ধান বিক্রি করলে তার মোট আয় হবে ২ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকার মতো। অর্থাৎ হাড়ভাঙা খাটুনির পর লাভের বদলে প্রায় ২০ হাজার টাকার লোকসান হচ্ছে। অথচ গত মৌসুমে ধানের দাম ছিল আড়ি প্রতি ২৮০–৩০০ টাকা।
কৃষকেরা জানান, শ্রমিকের অতিরিক্ত মজুরি ও শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখন গুমাইবিলে ধান কাটা ও মাড়াই করার ধুম লেগেছে। বাজারে অনেকটা কাড়াকাড়ি করে শ্রমিকদের আনতে হচ্ছে। বর্তমানে রাঙ্গুনিয়ায় একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ঠেকেছে ১৮০০ টাকায়। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে শ্রমিক সংকট। কৃষকদের মতে, সারা দেশে একযোগে ধান কাটা শুরু হওয়ায় এবং বিশেষ করে নেত্রকোনা অঞ্চল থেকে শ্রমিকেরা না আসায় এই সংকট বেড়েছে।
গত কয়েকদিনের কালবৈশাখী ও ভারী বৃষ্টিতে গুমাইবিলের কিছু কিছু জায়গায় ধানের গাছ নুয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে ধান ভিজে যাওয়ায় তা দ্রুত কাটা ও মাড়াই নিয়ে কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে পানি জমে থাকায় ধান কাটতে শ্রমিকের কষ্ট হচ্ছে, সময় বেশি লাগছে, যা পরোক্ষভাবে খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এবার রাঙ্গুনিয়ায় ৯ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে গুমাইবিলে রয়েছে ৩ হাজার ২০০ হেক্টর। ফলনও আশাব্যাঞ্জক। গুমাইবিলে ব্রি ধান ৮৮ জাতে হেক্টর প্রতি ৫.৮–৬.০ মেট্রিক টন। ব্রি ধান ১০০ জাতে ৫.৫–৬.২ মেট্রিক টন এবং কাটারি জাতে ৫.৫–৬.০ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রায় ৩১৫০ জন কৃষককে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হলেও কৃষকদের দাবি, ধানের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে আগামীতে বোরো চাষে আগ্রহ হারাবেন অনেকে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বরেন, বাজার তদারকি জোরদার করে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা হবে। দাম কমিয়ে দেওয়ার সাথে যদি কোনো সিন্ডিকেট জড়িত থাকে, তাদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।














