ষড়ঋতুর দেশে বর্ষণমুখর শ্রাবণে প্রকৃতির অনেক প্রান্তর ধারণ করে ভিন্নমাত্রার রূপ। চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা ও ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মধ্যবর্তী মুহুরী প্রকল্প এলাকাও তেমনই একটি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় প্রান্তর। মূলত এটি একটি সেচ প্রকল্প হলেও বর্ষায় প্রকৃতির ভিন্ন রূপ এই এলাকাকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। বিশেষ করে শ্রাবণের দিনে মেঘলা আকাশের নিচে মুহুরী প্রকল্পের জলকপাট দিয়ে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে নেমে আসা দৃশ্য অনেকটা জলপ্রপাতের মতো মনে হয়। এ দৃশ্য দেখতে এসে মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। বর্ষায় নদীতে পানি বেড়ে গেলে খুলে দেওয়া হয় মুহুরী প্রকল্পের জলকপাট। অতিবর্ষণ ও ভারতের উজানের পাহাড়ি ঢলে মুহুরী নদীর পানির স্তর স্বাভাবিক রাখা এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্যে গত প্রায় দুই মাস ধরে প্রকল্পের ৪০টি জলকপাট খোলা রয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন নদী ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত ১০টি অভ্যন্তরীণ স্লুইস গেটও খোলা রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, যতদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে, ততদিন জলকপাটগুলো খোলা থাকবে। বৃষ্টি কমে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে কিছু জলকপাট বন্ধ করা হবে।
মুহুরী প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জলকপাট দিয়ে প্রবল বেগে পানি নামছে। পানির স্রোতের শব্দ, জলকণার স্পর্শ ও নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন অনেকেই। কেউ বাঁধের দক্ষিণ প্রান্তের সমুদ্র মোহনা দেখছেন, কেউ উত্তর প্রান্তে বসে নদীর প্রবাহ উপভোগ করছেন। আবার কেউ কেউ নৌকায় ঘুরে দেখছেন প্রকল্প এলাকা।
সমপ্রতি এলাকায় গড়ে উঠেছে মহিষের দই, নদীর তাজা মাছ ও হাঁসসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান। নদীর তীরে বসে এসব খাবারের স্বাদ নিচ্ছেন দর্শনার্থীরা। পাশে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় ও আনসার ক্যাম্প। ফেনী নদীর ওপর নবনির্মিত সংযোগ সেতু এলাকাতেও অনেক দর্শনার্থী কিছু সময় কাটান। মুহুরী প্রকল্পে যাতায়াতের পথে দেখা যায় সারি সারি মাছের ঘের, ভেড়া ও মহিষের পাল। অদূরে রয়েছে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাখা।
সমপ্রতি মুহুরী প্রকল্প ঘুরে আসা কর্মজীবী নাছির উদ্দিন ভূঞা বলেন, আমার যখনই মন খারাপ হয়, এদিকে এসে সময় কাটালে বেশ ভালো লাগে। তাই প্রায়ই চলে আসি। এখন অনেক দর্শনার্থীকেও অবসরে এখানে ঘুরতে আসতে দেখা যায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ফেনী নদী ও কালিদাস পাহালিয়া নদীর সম্মিলিত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বর্ষাকালে বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে মুহুরী সেচ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের ৪০ ভেন্টবিশিষ্ট রেগুলেটরের মাধ্যমে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বর্তমানে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত অপসারণের জন্য সোনাগাজী উপজেলার বিভিন্ন নদী ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত ১০টি অভ্যন্তরীণ স্লুইস গেটও খোলা রাখা হয়েছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ–বিভাগীয় প্রকৌশলী শিহাব আহাম্মেদ বলেন, প্রতিবছর নভেম্বর মাসে রেগুলেটরের গেটগুলো বন্ধ করা হয়। ধান চাষের মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে সেগুলো এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ থাকে। বর্ষা শুরু হলে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এপ্রিলের শেষ দিকে গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সেগুলো খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, পানির চাপে গেট খুলে দেওয়া হয়েছে–সমপ্রতি এমন প্রচার করা হচ্ছে, যা সঠিক নয়। এটি সম্পূর্ণ নিয়মিত পরিচালনা কার্যক্রমের অংশ।
শিহাব আহাম্মেদ আরও বলেন, জোয়ারের সময় ফেনী নদীর দিক থেকে উল্টো স্রোতের পানি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য ফ্ল্যাপ গেটগুলো পানির চাপের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। জোয়ার শেষ হলে এবং পানির চাপ কমে গেলে সেগুলো আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়।












