খাগড়াছড়ির পাহাড়ে এখন পাকা ধানের সুবাস। জুমের ক্ষেতে ধানের পাশাপাশি মারফা, ভুট্টা, হলুদ, আদা, মরিচ, কচু, মিষ্টি কুমড়া, তিল, বরবটি ও বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হয়েছে।
জুমচাষিরা জানান, জুমে উৎপাদিত খাদ্যশস্য দিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি ও কৃষিপণ্য বিক্রি করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন তারা। জুমের ধান দিয়ে অনেক পরিবার ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারে। সমপ্রতি জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ফলদ ও বনজ বাগান সমপ্রসারণসহ নানা কারণে দিন দিন জুম চাষের পরিমাণ কমে আসছে। তবে বর্তমানে জুমে ধানের আবাদ বাড়াতে আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত জাতের পরীক্ষামূলক চাষাবাদ হয়েছে। এতে সাফল্য মিলেছে। স্থানীয় ধানের জাতের তুলনায় ব্রি–৮৩ ধানের কয়েকগুণ বেশি উৎপাদন হয়েছে। খাগড়াছড়ি–দীঘিনালা সড়কের লাগায়ো নয় মাইল এলাকায় ধানের চাষ করেছেন খমলা ত্রিপুরা। সমপ্রতি তার জুমে গিয়ে দেখা যায়, ৫ জন নারী শ্রমিক জুমের পাকা ধান কাটছেন। ক্ষেতে ধানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমিলার চারা (রোজালা) রোপণ করেছেন তিনি। মারফা, চিনালও চাষ করেছেন। খমলা ত্রিপুরার পাশেই রন্টু চাকমার জুমের ক্ষেত। গবেষণার অংশ হিসেবে লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলএসটিডি) আওতায় এই দুই চাষির জুমে ধানের নতুন জাত নিয়ে গবেষণা করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। খমলা ত্রিপুরা জানান, তাদের নিজস্ব স্থানীয় জাত ‘কোম্পানি ধান’ এর তুলনায় ব্রি উদ্ভাবিত ব্রি–৮৩ এর ভালো ফলন হয়েছে। এতে বেশ খুশিও তিনি। স্থানীয় কোম্পানি ধানের জাতের তুলনায় ব্রি ধানের ফলন কয়েকগুণ বেড়েছে।
গবেষণার বরাত দিয়ে প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মীর ওবায়দুর রহমান বলেন, পাহাড়ি কৃষিতে আধুনিকতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। আউশ মৌসুমে স্থানীয় জুম চাষি খমলা ত্রিপুরা ও রন্টু চাকমার প্রায় চার একর পাহাড়ে এই জুম গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় ব্রি উদ্ভাবিত জুম চাষের উপযোগী ধানের জাত ব্রি–৮৩ ও স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় দুইটি জাত বিন্নি ধান ও কোম্পানি ধান ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে জুম চাষের উপযোগী ধানের জাত চিহ্নিতকরণ, জুমভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় ধানের অভিযোজন সক্ষমতা ও উৎপাদন সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা এবং পাহাড়ে জুম চাষকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য পাহাড়ের মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং এই অঞ্চলের জন্য কার্যকর কৃষি পদ্ধতি নির্ধারণ করা এই গবেষণার মূল লক্ষ এবং উদ্দেশ্য। সংগৃহীত তথ্য–উপাত্তের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায়–জুমচাষি খমলা ত্রিপুরার জমিতে ব্রি ধান ৮৩ এর গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ৩.৫৭ মেট্রিক টন, অন্যদিকে স্থানীয় কোম্পানি ধানের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ২.৪৭ টন। জুমচাষি রন্টু চাকমার জমিতে ব্রি ধান ৮৩ চাষ করে হেক্টর প্রতি ৩.২৪ টন ফলন হয়েছে এবং স্থানীয় বিন্নি ধানের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ১.৫৩ টন।
স্থানভিত্তিক ধানের জাত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন প্রকল্পের আওতায় খাগড়াছড়িসহ সারা দেশে ছয়টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য–পার্বত্য এলাকার উপযোগী ধানের জাত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। প্রকল্পের আওতায় সারা বাংলাদেশে মোট ১৫টি প্রযুক্তি গ্রাম স্থাপন করেছে। এই ১৫টি প্রযুক্তি গ্রামকে ব্রি আধুনিক ধানের জাত এবং প্রযুক্তিগুলো কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয়করণের মাধ্যমে মডেল গ্রাম হিসেবে উন্নয়নে কাজ চলছে।
এলএসটিডি প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আউশ মৌসুমে বিশেষ করে তিনটি জুমে লোকাল যে জাত আছে বিন্নি জাত, কোম্পানি ধান যে জাতগুলো কৃষকেরা চাষাবাদ করে, তার সাথে আমাদের ব্রি–৮৩ কে আমরা জুম চাষাবাদে অন্তর্ভুক্ত করেছি। ইতোমধ্যে জুম চাষে ধান কর্তন হয়েছে। আমরা প্রায় সাড়ে তিন টনের মতো সেখানে ব্রি–৮৩ ফলন পেয়েছি। যেখানে বিন্নি ধানের ফলন ১.৫ টন, লোকাল ধানের ফলন ২ টন পর্যন্ত। ফলে চাষিরা ব্রি–৮৩ ধান চাষে খুব আগ্রহী হচ্ছে। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া জুম চাষাবাদকে কেন্দ্র করে বিন্নি ধানকেও আমাদের যে বায়োটেকনোলজি বিভাগ আছে, তার মাধ্যমে একটি নতুন জাত উদ্ভাবনের করছি। সেই জাতটি ভিটামিন ই সমৃদ্ধ এবং এন্টিঅঙিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি জাত। আমরা আশা করি এই প্রকল্প সময়কালীন সময়ে আমরা এই জাতটিকে অবমুক্ত করতে সক্ষম হবো। যার ফলন ৫ থেকে ৬ টনের অধিক। এই জাতটি যদি আমরা অবমুক্ত করি তাহলে এটি পার্বত্য এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হবে। জুম কৃষিতে একটা বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
খাগড়াছড়ি কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ–পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চলতি বছরে জেলায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই হাজার একশ আটাশ মেট্রিক টন।












