বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিশেষ করে বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি জেলার ১০ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কৃষি, মংস্য ও অবকাঠামো খাতে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন বন্যা পরবর্তী উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এসময় বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষয়–ক্ষতির একটি চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
প্রেস ব্রিফিং–এ উপস্থিত ছিলেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম–১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়া উদ্দিন ও জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। প্রতিমন্ত্রী জানান, মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করা প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক ২ লাখ ৮ হাজার ৭৩৫ জন। পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। মৎস্য খাতে ২৩ হাজার ৬১০টি পুকুর, দীঘি ও খামার এবং ৭৮৯টি ঘের প্লাবিত হয়েছে। এ খাতে আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ২১০ কোটি টাকা।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি– এই পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংখ্যা প্রায় ৮৪৬টি। যার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন সড়ক ২১টি। এলজিইডির ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৫৫ কিলোমিটার। আর এপ্রোচ রোডসহ ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ–কালভার্টের সংখ্যা প্রায় ২৩৫টি। যার আনুমানিক মেরামত খরচ প্রায় ৪২৩ কোটি টাকা। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২১২ কিলোমিটার সড়ক, ৫ টি ব্রিজ ও ১ টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি মেরামত ব্যয় প্রায় ৩৩২ কোটি টাকা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই এমন সড়কগুলোর মেরামতকাজ চলমান আছে এবং আগামী দু–এক মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। প্রতিমন্ত্রী জানান, পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার তিনটি প্রধান দিক হলো– জরুরি গৃহনির্মাণ ও সংস্কার অনুদান প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের আধুনিক সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান, দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো পুণর্নির্মাণ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বিষয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, সন্দ্বীপ উপজেলা, কঙবাজার জেলার রামু, পেকুয়া, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুড়াছড়ি ও কাউখালী উপজেলা, খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি ও মাটিরাঙা উপজেলা, বান্দরবান জেলার বান্দরবান সদর, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও রুমা উপজেলায় বন্যার তীব্রতা বেশি দেখা গেছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সরকারের ত্রাণ সহায়তা বিষয়ে বলেন, ৫ জেলায় মোট ২ হাজার ১০৬ মেট্রিক টন চাল, ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীগণ সার্বিক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরসমূহ হতে প্রাপ্ত ত্রাণসমূহ যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়েছে। তিনি জানান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পটগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, ১৭ জুলাই শুক্রবার থেকে বান্দরবানের স্পটগুলোও খুলে দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বানভাসী মানুষের কষ্ট লাঘবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর সাথে আলোচনাক্রমে বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক জুলাই মাসে কিস্তির টাকা আদায় কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য বান্ধব কর্মসূচি এবং ওএমএস কার্যক্রম এক মাস এগিয়ে আনা হয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিপর্যয় সাময়িক– আমাদের সম্মিলিত সাহস ও সঠিক পরিকল্পনা দীর্ঘস্থায়ী। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসন তহবিল মজুত রয়েছে। মাঠ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে আমরা খুব দ্রতই এ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি গৃহনির্মাণ ও সংস্কার অনুদান দেওয়া হবে। প্রান্তিক ও অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে ভিজিডি, ভিজিএফ ও কর্মসৃজন কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হবে, পাশাপাশি সহজ শর্তে কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট শুধু মেরামত নয়, ভবিষ্যতে বন্যা মোকাবিলার উপযোগী আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনর্নির্মাণ করা হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় জুলাই মাসের এনজিও ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত রাখতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মাধ্যমে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। আগস্ট থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (ওএমএস) এক মাস এগিয়ে এই মাস থেকেই শুরু করা হচ্ছে।











