
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু গুণী ব্যক্তিত্বের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে, যাঁরা নিজেদের মেধা, সততা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে অসামান্য অবদান রেখে যান। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কৃতী সন্তান মরহুম আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন তেমনই একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সমাজসেবায় তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। তিনি একজন খ্যাতিমান আইনবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ ছিলেন। তবে সর্বমহলে তিনি ‘জজ সাহেব’ ও ‘সাবজজ’ হিসেবেই অধিক পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়া তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯০৬ সালে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা মৌলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ ছিলেন একজন প্রথিতযশা শিক্ষক, ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ও পীর সাহেব। পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁদের পূর্বপুরুষ সৈয়দ আদম বরহা গৌড়ের সুলতান নসরত শাহের সঙ্গে চট্টগ্রামে আগমন করেন। পরবর্তী সময়ে সুলতানের অনুমতিক্রমে তিনি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সুলতানের নামানুসারেই তাঁদের গ্রামের নামকরণ হয় সুলতানপুর।
শৈশব থেকেই আবু মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯২২ সালে রাউজান আর. আর. এ. সি. ইনস্টিটিউশন থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেধাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৪ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই.এ. এবং ১৯২৬ সালে একই কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে আইন পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বি.এল. ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য, একই পরীক্ষায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক ড. বুদ্ধদেব বসু অল্প ব্যবধানে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন।
আইনশাস্ত্রে শিক্ষালাভের পর তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন। প্রথমে তাঁর চাচা মরহুম মেয়ামত হোসেনের উৎসাহে রংপুর জেলা জজ আদালতে আইন পেশায় যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে নিজ এলাকা রাউজান মুন্সেফি আদালতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন দক্ষ ও সুনামধন্য আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরে চট্টগ্রাম জজ আদালতেও আইন পেশায় নিয়োজিত হন।
১৯৪০ সালে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস (জুডিশিয়াল) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৪১ সালে ফরিদপুরে মুন্সেফ হিসেবে বিচার বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মুন্সেফ, ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত সাব–জজ এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত জজ ও ঢাকা বিভাগের বিশেষ জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া ও পুনরায় রাজশাহীতে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে সিলেকশন গ্রেডের জেলা জজ হিসেবে রাজশাহী থেকে নিয়মিত চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও বিচারিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন সরকার ১৯৬৯–১৯৭০ সালে দুই বছরের চুক্তিতে তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে বহাল ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৮০–১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বিচারক হিসেবে তাঁর সততা ও সাহসিকতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। জামালপুরে কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন জেলা জজ বীরকুমার দত্তের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়। ওই জেলা জজ তাঁর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে অভিযোগ দায়ের করেন। আবু মোহাম্মদ হোসেন যথাযথ প্রমাণসহ অভিযোগের জবাব দেন। পরবর্তী তদন্তে অভিযোগকারীর বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ ঘটনা তাঁর ন্যায়নিষ্ঠা, আত্মমর্যাদাবোধ ও সত্যের প্রতি অবিচল থাকার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি আজীবন জনকল্যাণ ও সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর রাউজানের প্রতিনিধিত্ব করে চট্টগ্রাম জেলা বোর্ড ও জেলা স্কুল বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ও পুল নির্মাণ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঐতিহ্যবাহী রাউজান আর. আর. এ. সি. স্কুল পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম আবদুর রহমান স্মৃতি মজলিশের সভাপতি এবং চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ কো–অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির পরিচালক হিসেবেও তিনি সমাজকল্যাণমূলক কাজে অবদান রাখেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ, পরহেজগার ও আদর্শনিষ্ঠ মানুষ। নিয়মিত নামাজ ও রোজা পালনের পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসন মেনে চলতেন। ১৯৬৬ সালে তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করেন। ব্যক্তিগত সততা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলির সমন্বয়ে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল অনুসরণীয়।
পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন সফল ও সুপ্রতিষ্ঠিত। স্ত্রী, সাত পুত্র ও তিন কন্যাসন্তান নিয়ে ছিল তাঁর পরিবার। তাঁর সন্তানদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক চিকিৎসা কর্মকর্তা মরহুম ডা. এ. জেড. এম. সাদেক, ইস্পাহানি জুট মিলের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার মরহুম এ. এম. এম. সালেক এবং লিম্যাক্স টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. এম. মোরশেদ হোসেন। তাঁর কন্যাদের পরিবারও বিভিন্ন পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত।
তাঁর আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও দেশের চিকিৎসা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন তাঁর আপন ভাগিনা। মরহুম অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফজলুল কাদেরও ছিলেন তাঁর আপন ভাগিনা।
লেখকের পারিবারিক সূত্রেও তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি লেখকের নানার চাচাতো ভাই এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। লেখকের বাবা অ্যাডভোকেট এ. এম. ইয়াহইয়ার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। লেখকের নানার কাছে পাত্র হিসেবে অ্যাডভোকেট ইয়াহইয়ার মেধা ও যোগ্যতার প্রশংসা করে তিনি বিয়ের প্রস্তাবে ইতিবাচক মত দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে লেখকের বাবা–মায়ের বিবাহের ক্ষেত্রে তাঁর এই সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবসরজীবনে চট্টগ্রাম শহরের আমানত শাহ (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন এলাকায় তিনি বসবাস করতেন। নিয়মিত বাদ আসর হাতে লাঠি নিয়ে লালদিঘির পাড় ও পার্কে হাঁটতে বের হতেন। সে সময় লেখকের সঙ্গে প্রায়ই তাঁর দেখা হতো; সালাম ও কুশল বিনিময় হতো। তাঁর ব্যক্তিত্ব, সৌজন্যবোধ ও জীবনাচরণের স্মৃতি আজও লেখকের কাছে অমলিন।
১৯৮৮ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ২৭ জুলাই ১৯৮৮, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২৫ মিনিটে ৮২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। পরদিন বাদ জোহর নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর স্মৃতি ও আদর্শকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর চতুর্থ পুত্র প্রকৌশলী এ. এম. মোরশেদ হোসেন তিন লাখ টাকা প্রাথমিক জমা দিয়ে ‘আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ হোসেন জজ সাহেব মেধাবৃত্তি ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করেন। ২০১১ সাল থেকে এই বৃত্তি কার্যক্রম চালু হয়। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় উৎসাহিত করা হচ্ছে।
মরহুম আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন এমন একজন বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনজুড়ে ছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, কর্মনিষ্ঠা ও জনসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের জটিল প্রশাসনিক ও বিচারিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালন করেও তিনি নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। বিচারক হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনজীবী হিসেবে পেশাগত মর্যাদা রক্ষা এবং সমাজসেবক হিসেবে জনকল্যাণে তাঁর অবদান তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের কাছে সততা, সাহসিকতা ও মানবিকতার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার: মরহুম আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ হোসেনের নাতি, বিশিষ্ট ব্যাংকার মোহাম্মদ সাঈদ হোসেন।
লেখক: আইনবিদ, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী।











