চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছিল ডেভিড ইমন। পুলিশ বলেছে, ডেভিড ইমন নাম ধারণ করলেও তার প্রকৃত নাম মোবারক হোসেন প্রকাশ ইমন। সে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মোহাম্মদ মুসার ছেলে।
ডেভিড ইমন এক সময় রাউজানে বালুর মহালে টাকা ওঠাতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী রায়হানের হাত ধরে ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আলোচনায় আসে। একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে ওঠে ডেভিড ইমন। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলা, ৫ নভেম্বর সরোয়ার হোসেন বাবলা খুনের ঘটনার আলোচিত নাম মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় ডজন মামলা রয়েছে।
পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র নিজেদের অনুসন্ধানের উদ্বৃতি দিয়ে জানান, ইমন অত্যন্ত হিংস্র টাইপের মানুষ। তার কাছে ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে এবং তিনি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় বেশ দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। কথায় কথায় গুলি চালানো তার কাছে খেলনা চালানোর মতো ব্যাপার বলেও পুলিশের ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।
পুলিশ জানায়, ইমন গত ১৩ জুলাই বাকলিয়া এঙেস রোড এলাকায় ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন) নামের ইন্টারনেট সেবাদানকারী কোম্পানির মালিককে ফোন করে ব্যবসা করতে হলে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতিমাসে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেয়ায় ওই কোম্পানির অফিসে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এর আগে গত জানুয়ারিতে সাবেক সংসদ সদস্য ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবর রহমান চৌধুরীর বাসায় গুলির ঘটনাতেও নাম আসে ইমনের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুবাইতে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ইমন এবং রায়হান। অস্ত্র চালানোর দক্ষতা এবং দুর্দান্ত সাহসের কারণে রায়হানই ইমনকে নের্তৃত্বে নিয়ে আসে। বিভিন্ন ধরনের দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইমন খুবই অল্প সময়ে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পরপরই ইমনের উত্থান ঘটে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, চাঁদার জন্য হামলা এবং গোলাগুলির মতো ঘটনা ঘটিয়ে চট্টগ্রামকে অস্থির করে তুলেছিল এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী। চাঁদার দাবিতে সাবেক সংসদ সদস্য ও স্মার্ট গ্রুপের মালিক মজিবুর রহমানের বাসভবনে গুলী; ব্যবসা করতে হলে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং মাসে দশ লাখ টাকা দাবি। এছাড়া ‘৫০ হাজার পুলিশ ঘিরে থাকলেও’ আজিজ নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করার হুমকি, ‘শরীরে এতো গুলি করা হবে যে পরিবার গুনে শেষ করতে পারবে না’, ‘আমি কে সেটা পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞেস করিস’ ইত্যাদি ডায়লগ দিয়ে একের পর এক হুমকি এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় আলোচনায় আসে ইমন। এসব ঘটনায় অস্থির হয়ে উঠেছিল নগর ও জেলা পুলিশ। সম্প্রতি হাটহাজারীতে বিশ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে দশ তলা ভবন নির্মাণকারী ব্যবসায়ীকে হুমকি ও হামলার ঘটনায়ও তার নাম আসে। ওই ঘটনায় মামলা করার পর চাঁদার পরিমাণ বিশ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পঞ্চাশ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। কুখ্যাত এই সন্ত্রাসীকে ধরতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আসছিল। চেষ্টা করছিল নগর পুলিশ ও র্যাবের একাধিক টিমও। পুরো আইন শৃংখলা বাহিনীকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো ডেভিড ইমনকে অবশেষে যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।











