আমাদের দেশে পরিবেশ নিয়ে জনসচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু সেই সচেতনতার ভেতরেই একটি সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। অনেকেই মনে করেন, মাটির ওপর সবুজের কোনো না কোনো আবরণ থাকলেই পরিবেশ রক্ষা হয়। সেটি ফলের বাগান হোক, কৃষিজমি হোক, কিংবা এক প্রজাতির বাণিজ্যিক বৃক্ষরোপণ সবই যেন সমানভাবে পরিবেশবান্ধব। চোখে সবুজ দেখলেই প্রকৃতি সুস্থ আছে এমন ধারণা সমাজে ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
কিন্তু আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান, প্রতিবেশবিদ্যা (Ecology), মৃত্তিকাবিজ্ঞান (Soil Science) এবং জলবায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সবুজ (Green Cover) এবং জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদন (Natural Biodiverse Vegetation) এক জিনিস নয়। এই মৌলিক পার্থক্যটি না বুঝলে পরিবেশ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল বাহ্যিক সবুজায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
প্রকৃতি কখনো একমাত্রিক নয়; প্রকৃতি বৈচিত্র্যের আরেক নাম। একটি সুস্থ প্রাকৃতিক বন বা স্বাভাবিক উদ্ভিদসমাজে পাশাপাশি বেড়ে ওঠে বিভিন্ন উচ্চতার বৃক্ষ, গুল্ম, ঝোপ, ঘাস, লতাগুল্ম, শেওলা, ছত্রাক, অণুজীব এবং অগণিত প্রাণী। এরা কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং প্রত্যেকেই অন্যের অস্তিত্বকে সমর্থন করে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীল জৈবসম্পর্কই একটি স্থিতিশীল প্রতিবেশ (Ecosystem) সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে একটি আমবাগান, লিচুবাগান, কমলা বাগান, রাবার বাগান, কলা বাগান, আনারস বাগান, ইউক্যালিপটাসের সারিবদ্ধ বনায়ন কিংবা একফসলি ধানক্ষেত সবুজ হলেও সেখানে জীববৈচিত্র্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য খাদ্য, ফল, কাঠ বা অর্থনৈতিক উৎপাদন; কিন্তু একটি প্রাকৃতিক বনের প্রধান কাজ হলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কার্বন ধারণ, পানি নিয়ন্ত্রণ, মৃত্তিকার স্বাস্থ্য রক্ষা, স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা।
এই সত্যটি আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সুপ্রতিষ্ঠিত। IPBES (Intergovernmental Science-Policy Platform on Biodiversity and Ecosystem Services)-এর Nexus Assessment (২০২৪) দেখিয়েছে যে জীববৈচিত্র্য, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু এই পাঁচটি উপাদান পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত যে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য চারটিও দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত হয়। অর্থাৎ, কেবল গাছ লাগানো নয়; জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা এখন বৈশ্বিক পরিবেশ নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মাটির স্বাস্থ্যও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। একটি প্রাকৃতিক বনভূমির মাটির ওপর থাকে পুরু পত্রপচা স্তর। সেই স্তরের নিচে বাস করে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, অ্যাকটিনোমাইসেটিস, কেঁচো, উইপোকা এবং অগণিত অণুজীব। এরা মৃত জৈবপদার্থকে ভেঙে পুষ্টিতে পরিণত করে, মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে সহাবস্থান গড়ে তোলে। এই অদৃশ্য জগতটিই আসলে মাটির প্রাণ।
অপরদিকে দীর্ঘদিনের একফসলি চাষ, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং বারবার মাটি উল্টেপাল্টে চাষ করার ফলে মাটির এই জীবন্ত জৈবসমাজ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ে। FAO–এর গবেষণা বলছে, পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় এক–চতুর্থাংশ জীববৈচিত্র্য মাটির নিচেই অবস্থান করে এবং এই জীববৈচিত্র্যই মাটির উর্বরতা, কার্বন সংরক্ষণ, পানি পরিশোধন ও কৃষি উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদনের আরেকটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এর পানি ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা। বনভূমির বহুস্তরবিশিষ্ট উদ্ভিদসমাজ বৃষ্টির পানিকে ধীরে ধীরে মাটিতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। পত্রপচা স্তর স্পঞ্জের মতো পানি ধরে রাখে, শিকড়ের জাল মাটিকে আলগা রাখে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করে। ফলে শুষ্ক মৌসুমেও মাটিতে আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং নদী–খাল–বিল দীর্ঘ সময় পানি পায়।
অন্যদিকে উন্মুক্ত জমি কিংবা একমাত্রিক উদ্ভিদ আচ্ছাদনে বৃষ্টির পানি দ্রুত প্রবাহিত হয়ে যায়। এর সঙ্গে উর্বর মাটিও ক্ষয় হয়ে নদী–নালায় জমা হয়। ফলে একদিকে ভূমিক্ষয় বাড়ে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণও কমে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বহু আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজাতিগত বৈচিত্র্য যত বেশি, একটি প্রতিবেশের স্থিতিস্থাপকতা (Ecological Resilience) তত বেশি। কোনো একটি রোগ, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা তাপপ্রবাহ যদি একটি প্রজাতিকে ক্ষতিগ্রস্তও করে, অন্য প্রজাতিগুলো তখনও প্রতিবেশের কার্যক্রম সচল রাখে। কিন্তু একক প্রজাতির বাগানে একই ধরনের আঘাত পুরো ব্যবস্থাকে একযোগে বিপর্যস্ত করতে পারে।
এই কারণেই বর্তমানে Nature-based Solutions–এর ধারণায় শুধু গাছ লাগানোর কথা বলা হয় না; বরং স্থানীয় প্রজাতিনির্ভর জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। UNEP, FAO, IUCN এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচি একই বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনতেই হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের শালবন, সুন্দরবন, পার্বত্য বনাঞ্চল, উপকূলীয় বন, চরাঞ্চল, হাওর কিংবা গ্রামীণ ঝোপঝাড় প্রত্যেকটির নিজস্ব উদ্ভিদসমাজ ও জীববৈচিত্র্য রয়েছে। হাজার হাজার বছরের অভিযোজনের মাধ্যমে স্থানীয় বৃক্ষ, গুল্ম, ঘাস ও লতাগুল্ম এ দেশের মাটি, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও জীবজগতের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য গড়ে তুলেছে। সেই ভারসাম্য কোনো বিদেশি প্রজাতির সারিবদ্ধ বৃক্ষরোপণ বা একমাত্রিক বাগান কখনোই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে কৃষিজমি বা ফলের বাগানের গুরুত্ব কম। খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, কৃষকের জীবিকা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এগুলোর অবদান অপরিসীম। কিন্তু কৃষিজমির কাজ খাদ্য উৎপাদন, আর প্রাকৃতিক বনের কাজ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা। একটি অন্যটির বিকল্প নয়; বরং উভয়ই পরস্পরের পরিপূরক।
দুঃখজনকভাবে, এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি বাংলাদেশে এখনও ব্যাপকভাবে জনমানসে পৌঁছায়নি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী বেসরকারি সংস্থা বৃক্ষরোপণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ কিংবা সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি পরিচালনা করলেও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদনের অপরিহার্যতা নিয়ে ধারাবাহিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক গণসচেতনতা কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে সীমিত। স্কুল–কলেজের পাঠ্যক্রম, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এ বিষয়ে আরও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সংরক্ষণের দর্শনও বদলে যাচ্ছে। আজ আর লক্ষ্য কেবল “কতটি গাছ লাগানো হলো” তা নয়; বরং ‘কতখানি সুস্থ, বৈচিত্র্যময় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেশ ফিরিয়ে আনা গেল’ সেটিই এখন সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।
সবুজ চোখকে প্রশান্তি দেয়, কিন্তু জীববৈচিত্র্য পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে। গাছ প্রকৃতির একটি স্তম্ভ; কিন্তু বন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত সমাজ। একটি ফলের বাগান খাদ্য দেয়, একটি কৃষিক্ষেত জীবনধারণের উপকরণ দেয়; কিন্তু একটি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বন দেয় নির্মল বাতাস, নিরাপদ পানি, উর্বর মাটি, স্থিতিশীল জলবায়ু এবং অগণিত প্রাণের আশ্রয়।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করতে চায়, মৃত্তিকার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে চায়, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট কমাতে চায় এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যেতে চায়, তবে আমাদের পরিবেশচিন্তায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতেই হবে।
সবুজের সংখ্যা নয়, জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিই হবে ভবিষ্যতের পরিবেশ নীতির মূল দর্শন। কারণ প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে শুধু গাছ লাগানো নয়; প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিক বৈচিত্র্য, জটিলতা এবং জীবন্ত সুষমাসহ বাঁচিয়ে রাখা। এ সত্য যত দ্রুত আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র উপলব্ধি করবে, ততই বাংলাদেশের পরিবেশ ও মানুষের ভবিষ্যৎ হবে আরও নিরাপদ, আরও স্থিতিশীল এবং আরও টেকসই।
লেখক: অধ্যাপক, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।












