কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় অনেক সমস্যা। সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হোক, শিল্প বাঁচুক, শিল্প এলাকা বাঁচুক। ওখানে কর্মকাণ্ডে জড়িত মানুষগুলো বাঁচুক।কালুরঘাট বিসিক শিল্প মালিক সমিতির নবনির্বাচিত কার্যকরী পর্ষদের অভিষেক অনুষ্ঠান গত সোমবার রাতে চিটাগাং ক্লাবের অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত অতিথিসহ সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য, চাওয়া ছিল এক। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করে বিসিক শিল্প এলাকাকে একটি মডেল শিল্পাঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করা হবে। এলাকার যত সমস্যা রয়েছে সেগুলো ক্রমান্বয়ে সমাধান করে এলাকায় একটি উদ্যোক্তাবান্ধব আবহ তৈরি করা হবে।
পর্ষদের নবনির্বাচিত সভাপতি ওয়াহিদ মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক এম এ মালেক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ–৩ এর পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম, বিসিক আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক খালেদ মাহমুদ, চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মো. আমীরুল হক, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মো. আবদুস ছালাম, এশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আবদুস সালাম, মেরিডিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান কোহিনুর কামাল, ফোর এইচ গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ হাসান জ্যাকি, সিজল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আলম প্রমুখ।
সুদর্শন চক্রবর্তী ও অজিত কুমার দাশের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আমি খুবই অবাক হয়েছি যে, এই শিল্পাঞ্চলে এত সমস্যা। অথচ কোনোদিন কেউ আমার কাছে আসেননি, আমাকে কিছু বলেননি। নতুন কমিটির সভাপতি ওয়াহিদ মালেকই প্রথম আমার কাছে এসে এলাকার সমস্যার কথা জানান। আপনারা এখানে যে রাস্তার কথা বলেছেন, সেটির কাজ অচিরেই শুরু হবে। এখান থেকেই আমি আমাদের চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছি।
তিনি বলেন, বিসিক শিল্প এলাকার সমস্যাগুলো দেখতে আমি আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং আবু সুফিয়ানসহ আপনাদের নিয়ে এলাকায় যাব। পরিচ্ছন্নতা বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এবং ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের সাথে যাবেন। তাৎক্ষণিকভাবে যা করার দরকার সেগুলো সাথে সাথে করা হবে। এলাকার সমস্যাগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করে শুরুতে যেগুলো সমাধানযোগ্য সেগুলো সমাধান করব। পরবর্তীতে সেকেন্ডারিগুলো করব এবং কিছুটা সময় নিয়ে ফাইন্যালি বাকি সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে।
মেয়র বলেন, আমি কাজ করতে চাই। আমি কাজের মানুষ। তাই আলোচনাতে আছি, সমালোচনায়ও। এগুলো সবই আপনাদের জন্য, নগরবাসীর জন্য। আমরা সবাই মিলে কাজ করলে শহরটাকে গ্রিন, ক্লিন এবং হেলদি সিটিতে রূপান্তর করতে পারব।
হোল্ডিং ট্যাক্স বাকি থাকলে দ্রুত পরিশোধ করার জন্য তিনি শিল্প মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান। বলেন, বন্দর থেকে ২শ কোটি টাকা আদায় করেছি। আরো ৬৮ কোটি টাকা আদায়ের চেষ্টা করছি। আইসিডিগুলোতে নতুন ট্যক্স নির্ধারণ করে আদায় করার চেষ্টা করছি। ট্যাঙ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ট্যাঙ পেলে কাজ করা অনেক সহজ হয়। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের স্কেলের প্রসঙ্গে প্রয়োজনে চট্টগ্রামের এমপিদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচিত সরকার, জনগণের সরকার। তাই জনগণের প্রত্যাশা আছে, আস্থা আছে। প্রত্যাশা পূরণ না হলে মন খারাপ হবে–এটা স্বাভাবিক। আপনারা জানেন বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিতে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়েছে। আর সরকার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায়। আমেরিকা–ইরান যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক সংকট শুরু হয়। যার ধাক্কা লাগে বাংলাদেশেও। যুদ্ধের আগে ক্রুড অয়েলের ব্যারেল ছিল ৬২ ডলার, যুদ্ধের পরে যা ক্রমান্বয়ে ১০২ ডলারে ঠেকেছে। কাতার থেকে বাংলাদেশ এলএনজি ইমপোর্ট করত। সেই কাতারই এখন আমেরিকা থেকে এলএনজি ইমপোর্ট করে নিজেদের চাহিদা মেটাতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধে কাতারের এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে।
ব্যবসায়ীদের আইআরসি এবং ইআরসি ৫০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং ১৫ হাজার টাকা থেকে বর্তমানে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অতিরিক্ত হয়েছে। আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্তান। আমরা তাঁর কাছে যেকোনো সময় যেতে পারি। আমরা বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সাথে দেখা করব।
তিনি বলেন, দেশের শিল্পখাতকে বাঁচাতে হবে। শিল্পখাত বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে। আর অর্থনীতি ছাড়া দেশ বাঁচে না। অর্থনীতির চাকা বন্ধ হয়ে গেলে দেশ স্থবির হয়ে যাবে। কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকা এবং ভারী শিল্প এলাকার সন্নিহিত ৮টি রাস্তা সংস্কার ও মেরামতের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে বিসিকের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিসিক শিল্প এলাকার মালিকেরা বাঁচলে আপনার অফিস বাঁচবে, সরকার বাঁচবে। তাই এই শিল্প এলাকাকে একটি বিনিয়োগবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে যা যা করার দরকার সব করার উদ্যোগ নিন। আমি স্থানীয় এমপি হলেও একজন ব্যবসায়ী হিসেবেও আপনাদের সমস্যার সমাধান করা আমার নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বিসিক শিল্প এলাকার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করবেন এবং এই কমিটির জন্য নিজের দুই হাত সব সময় প্রসারিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশে বিনিয়োগ চায়, রপ্তানি বাড়াতে চায়। ভ্যাট এবং ট্যাঙকে ঘুষমুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন, সরকার প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেবে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় যা করতে হয় আমি করব। প্রয়োজনে এমপি আবু সুফিয়ান এবং এনাম সাহেবকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবেন বলেও বিসিক শিল্প এলাকার মালিকদের আশ্বস্ত করেন তিনি।
চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, যে তথ্যচিত্র দেখলাম তাতে আমরা বুঝে গেছি যে বিসিক শিল্প এলাকায় মালিকেরা ভালো নেই। কিন্তু এসব তো চলতে দেওয়া যায় না। এভাবে চলতে পারে না। ১০৫ কোটি টাকার ডরমেটরির দরজা–জানালা, বাথরুমের পাইপ খুলে নিয়ে গেছে। সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এভাবে চললে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অবশ্যই নেওয়া হবে। তিনি মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিসিক শিল্প এলাকার যে সমস্যাগুলো ত্বরিৎ সমাধানযোগ্য সেগুলো দ্রুত সমাধান করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যে দেশের শিল্প যত উন্নত, সেই দেশ তত উন্নত। চীনের শিল্প উন্নত বলেই আজ তারা সারা পৃথিবীতে দাবড়ে বেড়াচ্ছে। হতাশার মধ্যেও আমরা আশার আলো দেখি। আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ রেখে যেতে চাই। আমরা যে স্বপ্নের দেশ গড়তে চাই বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে।
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে হয় উল্লেখ করে দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, বিসিক শিল্প এলাকার বহু কারখানা ভালো নেই। এসব কারখানা ভালো থাকুক আর খারাপ থাকুক তারা কর্মসংস্থান করছে। এটি অনেক বড় একটি কাজ। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে শিল্পখাতকে শক্ত ভিত দিতে হবে। এটি রাষ্ট্রকে দেখতে হবে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এসপি মাহমুদা বেগম বলেন, আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে বিসিক শিল্প এলাকার সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। বর্তমান নবনির্বাচিত কমিটিকে একটি ডাইনামিক কমিটি হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এই কমিটির নেতৃত্বে ব্যবসায়ীরা এক জোট হয়ে কাজ করলে ওখানে কোনো সমস্যা থাকবে না।
চট্টগ্রামকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব। এখানে ভারী শিল্প যেমন আছে, তেমনি কুঠির শিল্পও আছে। কুঠির শিল্পও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ শুরু থেকে চট্টগ্রামে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিস্তৃত একটি এলাকা আমাদের দেখতে হয়। মাত্র ৭শ লোকবল নিয়ে এই বিশাল এলাকার দায়িত্ব পালন বেশ কঠিন। তবুও সব শিল্পের পাশে থাকতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি।
বিসিক শিল্প এলাকার আইন–শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো আমরা সিএমপির সাথে যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করি, টহল দিই। তবে ক্যাম্প স্থাপন হলে আমরা ২৪/৭ সার্ভিস দিতে পারব। শিল্প এলাকার নিরাপত্তা বিধান শুধু আমার পেশাগত দায়িত্ব নয়, নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি।
বিসিকের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিচালক খালেদ মাহমুদ বলেন, বিসিক কিংবা শিল্প মালিক সবাই একই পরিবার। আপনাদের সমস্যা মানে আমারও সমস্যা। এই কমিটির নেতৃত্বে সবাই যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করি তাহলে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে। তিনি বলেন, অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে শিল্পখাত। আর শিল্পপতিরা হচ্ছেন সেই খাতের কারিগর। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদেরকে আরো অনেক কিছু করতে হবে। আর তা করার জন্য যা করা দরকার বিসিক তা করবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি আমিরুল হক বলেন, অর্থনীতির যে অবস্থা তা খুবই গতিহীন অবস্থায় রয়েছে। সব জায়গায় একটা ক্রাইসিস। ছোট, মেজো, বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী সাফার করছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ছোট ব্যবসায়ীদের ভূমিকা অনন্য বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে ছোট বিনিয়োগকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয় না। নানাভাবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন না হলে কোনো শিল্পই চলবে না। আমাদের থেকে এক ধরনের বিদ্যুতের টাকা নেওয়া হয়, অথচ আমাদেরকে সেই মানের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া হয় না। বিদ্যুতের ভোল্টেজ সঠিক থাকে না। একটি বলে অন্যটি দেয়। অথচ দাম বাড়ালেন, টাকা নিলেন, কিন্তু গ্যাস–বিদ্যুৎ দিলেন না। এভাবে কোনো ব্যবসা টিকে থাকে না।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আবদুস ছালাম বলেন, চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। দেশের কোনো সড়ক–মহাসড়কে স্কেল নেই, অথচ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে স্কেল বসিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এই স্কেল তুলে নেওয়ার জন্য বহুভাবে আবেদন নিবেদন করা হয়েছে, কিন্তু তাতে কেউ কান দিচ্ছে না। কারণ সেখানে গুটিকয়েক মানুষের ব্যবসা রয়েছে। গুটিকয়েক মানুষের ব্যবসার জন্য একটি জনপদের লাখো ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। এজন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কথা বলতে হবে।
এশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম বলেন, দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ। আমাদের ব্যবসা চালাতে গিয়ে শত সহস্ত্র সমস্যা। কয়টির কথা বলব? তিনি বলেন, ট্যারিফ বেড়ে গেছে। কস্ট অফ ডুয়িং বিজনেস বেড়ে গেছে। এতে ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। ওয়াহিদ মালেকের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠিত হয়েছে এই কমিটিকে আমরা সবাই মিলে সহায়তা করলে বিসিক শিল্প এলাকা দেশের একটি অন্যতম শিল্পাঞ্চলে পরিণত হবে।
মেরিডিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান কোহিনুর কামাল বলেন, সারা অঙ্গে ক্ষত, ওষুধ দেব কত? বিসিক শিল্প এলাকায় ঢুকলে রাস্তার অবস্থা, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, জলাবদ্ধতা। শুধু মোড়ে মোড়ে নয়, ফ্যাক্টরির সামনেও টং দোকান, বখাটেদের উৎপাত দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। সিইপিজেডে তো দোকান নেই, তাহলে বিসিকে এত দোকান কেন? আমরা নীতিমালার মধ্যে থাকতে চাই। কিন্তু ভোক্তা অধিকার এমনভাবে বাহিনী নিয়ে আসেন যেন আমরা সবাই অপরাধী। আমরা কী চোর? আমরা ভালো প্রোডাক্ট বানাতে চাই, ভালো খাবার খাওয়াতে চাই। কিন্তু আমরা ফার্স্ট জেনারেশন ফ্যাক্টরি। কিছু ভুলভ্রান্তি থাকবে। এগুলো সংশোধনের সময় দিতে হবে।
ফোর এইচ গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ হাসান জ্যাকি বলেন, বিসিক শিল্প এলাকায় নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, পানি সবই সমস্যা আক্রান্ত। ক্ষুদ্র ইন্ডাস্ট্রি থেকে বড় ইন্ডাস্ট্রিতে যেতে যদি প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পাওয়া না যায় তাহলে শিল্পের বিকাশ কীভাবে হবে? শিল্পের বিকাশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সভার সভাপতি এবং কালুরঘাট বিসিক শিল্প মালিক সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি ওয়াহিদ মালেক বলেন, আজকের এই অভিষেক অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি নতুন যাত্রার সূচনা, নতুন স্বপ্ন দেখার সময় এবং নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার মুহূর্ত। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, এটি শিল্প, বন্দর, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আর এই অগ্রযাত্রায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অবদান অপরিসীম। আজকের ছোট উদ্যোক্তাই আগামী দিনের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। তাই একজন উদ্যোক্তাকে এগিয়ে দেওয়া মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে দেওয়া নয়, একটি পরিবার, কর্মসংস্থান এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে দেওয়া।
নবনির্বাচিত কমিটি ঐক্য, সততা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াবে বলে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, সকলের সহযোগিতায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে, আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামের শিল্পখাতকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করব।
ওয়াহিদ মালেক বলেন, আমরা শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বলব না, সমস্যার সমাধান করা, সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সবাই মিলে কাজ করতে চাই। আজকের এই নতুন নেতৃত্বের লক্ষ্য হলো বিসিক চট্টগ্রামকে আরও উদ্যোক্তাবান্ধব, আরও গতিশীল, সফল এবং দেশের জন্য একটি মডেল শিল্পাঞ্চলে পরিণত করা।
পর্যদের সাধারণ সম্পাদক অজিত কুমার দাশ কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট এবং বর্তমানের নানা সমস্যা তুলে ধরে এগুলো সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এখানে মোট ৩২৬টি প্লট রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিল্প উদ্যোক্তারা এখানে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এ শিল্পাঞ্চল থেকে উৎপাদিত পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন প্রকার রাজস্ব প্রদান এবং লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, কর্মকর্তা–কর্মচারীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু দুঃখ ও উদ্বেগের বিষয়, আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে শিল্প উদ্যোক্তা, কর্মকর্তা–কর্মচারী এবং শ্রমিকেরা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। এর ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ ক্রমশ বাধাগ্রন্ত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অর্জন, শিল্পসম্ভাবনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান রক্ষার স্বার্থে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা জরুরি। বর্তমান সংকটসমূহের দ্রুত, কার্যকর ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা এখন শুধু সময়ের দাবি নয়, শিল্প ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে অপরিহার্য।
বিসিক শিল্প এলাকায় অবাধ প্রবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, অবৈধ ভাসমান ও অস্থায়ী টং দোকান, মাদক, চুরি–ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা, নালা–নর্দমা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইটের অভাবসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন তিনি। দেশের শিল্পখাতকে এগিয়ে নিতে বিসিক শিল্প এলাকার সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের আহবান জানান। এ সময় একটি তথ্যচিত্রের মাধ্যমে বিসিক শিল্প এলাকার বাস্তব অবস্থা প্রদর্শিত হয়।












