কারখানার নারী শ্রমিকদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন কতদূর?

সাদিয়া মেহজাবিন | শনিবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ

মাসিক যেন চিরাচরিত ঘটতব্য ঘটনা। কারো কাছে নিত্যদিনের কার্যক্রমের মতোই সহজ, কারো আবার ভয়ানক দুঃস্বপ্নের নাম। একদা আমাদের সমাজে মাসিককে অপবিত্র বিষয় হিসেবে দেখা হতো। সমাজের চোখ নিয়ে কিছু বলার নেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর জন্যে ছুড়ে আসা চোখ যেন বিষ দাঁতের মতোই কালো। নানা মাধ্যমে প্রতিবাদ ও বাংলাকে কালক্রমে মাসিক নিয়ে শিক্ষিত করার নানান প্রয়াস চালানো হয়েছে বলে, আমরা আজ একটুআধটু মাসিক নিয়ে কথা বলতে পারি। কিন্তু গোটা বাংলায় এখনো মাসিক একটা ট্যাবুর মত অলিখিত, না বলা কথা। তারপরে মাসিক স্বাস্থ্য যে নারীর স্বাস্থ্য তালিকার অংশ আদৌ মানতে নারাজ অনেকে। তবুও মাসিক স্বাস্থ্য কতটা জরুরি তা জানানোর চেয়ে বাস্তবায়ন নিয়েই যেন বেশি মাথা ঘামাতে আগ্রহী।

মাসিক স্বাস্থ্য বাস্তবায়নে চোখ ফেললে দেখা মিলবে দেশে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী কারখানার নারী শ্রমিকেরা, তার মধ্যে গ্রামাঞ্চলে যেকুটির শিল্প থেকে শুরু করে গ্রামের নারীরা রয়েছেন তাদের অবস্থা ভয়াবহ। কিন্তু বৃহত্তর সংখ্যক কারখানার নারী শ্রমিকদের মাসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে অনতিদূর চোখ ফেলা বেমানান। আমাদের জানা কথা, পোশাকশিল্প দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য এবং পোশাক শিল্পের চালিকা শক্তির ৮০ শতাংশ নারী। দেশে ব্রিটিশ শাসনের আরেকটি কুফল হলো একজন শ্রমিককে টানা ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো। এর ভেতরে ওভার টাইমের কথা বলা হলেও মজুরিসহ কোনও ক্ষেত্রেই শ্রম আইন মানা হয় না। এখন যদি মায়ের চেয়ে মাসির আদর বেশি বলে গালমন্দ করেন এবং প্রশ্ন ছুড়েন ‘কই পুরুষেরাও তো ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, আপনারা তো তাদের কথা বলেন না’ তাহলে পাল্টা জবাবে বলতে হয়, পুরুষতন্ত্রের কুফল দেবালয় এড়ায়নি।’

কারকাখানার নারী শ্রমিকেরা এদীর্ঘ সময় মাসিক স্বাস্থ্যের দিকে কতটা খেয়াল আদৌ রাখতে পারছেন? একজন নারীর মাসে ৭৮ দিন মাসিক হয়। এসময়ে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান চলে যায়। বহিঃবিশ্বে অনেক প্রতিষ্ঠান নারী কর্মীদের মাসিক চলাকালীন অন্তত তিনদিনের ছুটি দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে এসব চিন্তা দূরে থাক মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কারখানার মালিকদের বোঝানো অসম্ভব। কারখানার মালিকপক্ষের কথা আসতেই এক স্মৃতি খোঁচা দিচ্ছে। বাণিজ্য মেলার মতো একটা জায়গায় কেবল নিছক চড়কির আনন্দ নিতে আমার এক শিক্ষার্থীকে নিয়ে গিয়েছিলাম। অনেক দূর হেঁটেও হাতের ময়লা ফেলতে কোনো ডাস্টবিন খুঁজে না পেলে ভীষণ ক্ষোভ হয়। তো সে হুট করেই বলে বসে, এখানে ডাস্টবিন পাবে না কারণ এটা বাণিজ্য মেলা আর তারা এখানে বাণিজ্য করতে এসেছে। বিশ্বাস করুন, এটা আদতে মূল কথা। কারখানার মালিক বাণিজ্য করতেই এসেছে। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের হাজারো আইন আর মন্ত্রণালয় কোথায়? যারা নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলে আন্তর্জাতিক মহলে নাম কুড়ান।

গবেষণা বলছে একজন নারীর বছরে গড়ে ৯৬ দিন আর গড় বয়স হিসেবে আনুমানিক ৫৭৬০০ দিন মাসিকের জন্যে ব্যয় করতে হয়। ভাবুন, জীবনের এ বৃহত্তর সময় নারী মাসিক নিয়ে কাটান এবং এসময়ে তার শরীর থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান চলে যাচ্ছে। মাসিকের আগে পরে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতিও কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে। তাহলে কারখানায় নারী শ্রমিকদের দীর্ঘ সময়ে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের কতটা সচেতন থাকার প্রয়োজন ছিলো।

শ্রম আইনে নারী শ্রমিকদের জন্যে হওয়া কোনো আইনে সুস্পষ্ট বর্ণনা নেই মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। যৌন ও প্রজনন আইনে যে নিয়ম নীতিগুলো আছে তাও বড্ড বেমানান, সম্পূর্ণ নয়। কেবল মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখন অব্দি কোনো সুস্পষ্ট আইন নেই। নারী শ্রম আইনের ৪৭ ধারায় স্বাস্থ্যগত কারণে ছুটি নেওয়ার সুযোগের কথা বলা হলেও মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্পষ্ট কোনও বিবৃতি নেই। আমাদের দেশে আইন প্রণয়ন নিয়ে বা বাস্তবায়ন নিয়ে দেশের মানুষের আস্থা উঠে যাচ্ছে বলা যায়। কেননা শ্রমিক আন্দোলনের জন্যে সোচ্চার বা শ্রমিক লীগের প্রধান তাদের অনেকেই কেন্দ্রে বসে কেবল মালাই খাওয়ার লোভে ভেসে বেড়াচ্ছে। তৃণমূলের বাস্তবচিত্রে তাদের মাথা ব্যথা নেই।

বাস্তব চিত্রের আবেশ পেতেই ১৫২০ টা কারখানার শ্রমিকদের সাথে আলাপ করার প্রয়াস চালানো হয়। এর মধ্যে ৪০% শ্রমিক চাকরি হারানোর ভয়ে কথা বলতেই রাজি হননি। বাকিদের অনেকের কাছে কারখানায় মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কথা জানতে চাওয়া হলে তারা সত্য বলতে দ্বিধায় পড়ছেন। এর মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী শ্রমিক জানান, তার গার্মেন্টস এ এন ফ্যাশন কেবল নতুন গার্মেন্টস দিয়েছে এমন বলে আজকে প্রায় দুই থেকে তিন বছর হয়ে গেলেও মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্যে কিছুই করছেন না, ছুটি তো দূরে থাক তাদের জন্যে প্রয়োজনীয় ডাক্তার নেই, টয়লেটের সুব্যবস্থা নেই। জানতে চাওয়া হয় তারা মাসিক চলাকালীন স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সুযোগ পান কিনা। বেতনের এমন বেহাল দশায় তাদের পক্ষে এত দাম দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার বিলাসিতা।

কিন্তু জানানোর চেষ্টা করা হয়, মৌলিক অধিকারের আওতায় মাসিক স্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক আইনসহ দেশে নতুনভাবে কারখানায় স্যানিটারি ন্যাপকিন শ্রমিকদেরকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এগুলো খেয়ালি পোলাওর মতো তিনি শুনে গেলেন। কেননা তাদের কারখানায় মাসিকের সময় তীব্র শরীর খারাপে, দিন কামাইয়ের পয়সা কেটে রেখেছে মালিক। মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পারভীন নামক আনিকা ফ্যাশনের গার্মেন্টস কর্মী জানান, গার্মেন্টসে ৩০০৫০০ জন নারী কর্মীর জন্যে কেবল ৫ টি টয়লেট রয়েছে। নেই কোনো ডাক্তারি সুবিধা। এছাড়াও তারা কখনো ভাবেননি যে স্যানিটারি ন্যাপকিন কারখানা থেকে প্রাপ্য যা তাদের অধিকার।

তিনি এও বলেন, তিনিসহ তাদের বাকি কর্মীরা মাসিকের সময় কেবল কাপড় ব্যবহার করেন। কারখানায় কেবল নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

বর্তমানে যেখানে আন্তর্জাতিক মহলে মাসিক চলাকালীন ছুটির বিষয়ে আলোচনা উঠছে সেখানে আমরা এখনো দেশের নারী শ্রমিকদের জন্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন দূরে থাক কমমূল্যে এর সহজলভ্যতাও বাড়াতে পারিনি। নারীদের জন্যে হয়ে আসা আইনগুলো পুরুষদের হাতে পুরুষতান্ত্রিক উপায়ে প্রণয়ন হচ্ছে বলেই এখন অব্দি কোনো আইনে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সুপষ্ট কোনো আলোচনা নেই।

আরেকটু ভাবলে নজরে পড়বে মাসিক স্বাস্থ্যের সাথে জড়িত অন্যতম উপাদান নারীর জন্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন। দেশের উন্নতির কথা কীভাবে বলব বলুন, যেখানে কারখানার নারী শ্রমিকদের ৬০% এখনো কাপড় ব্যবহার করে। এর ফলে জরায়ুজনিত সমস্যার মধ্যে অন্যতম জরায়ু ক্যান্সারের হার বেড়েই চলেছে। যেখানে ৪৬ ঘণ্টার ভেতরে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, সেখানে আমাদের চালিকা শক্তির বৃহত্তর অংশ মাসিকের সময় কাপড় পরছে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের সুবিধার কথা বললেই কারখানার মালিকদের অন্যতম যুক্তিও স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর বসানো ভ্যাট বা কর নিয়ে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম দিনে দিনে ২০৪০ টাকা বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে মধ্যমানের ন্যাপকিনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নেই বললেই চলে। স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর বসানো শুল্ক বেশি হওয়ার ফলে এর বাজার মূল্য বেশি। আয়ের হিসাবে তাই এত কম মজুরিতে নিশ্চয় প্রতি মাসে ১৫০২৩০ টাকার স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের কথা নারী শ্রমিকেরা মাথাতেই আনেন না। এতকিছুর ভীড়ে সাধারণ জনগণ যখন বাজেটের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকেন তখন বাজেটেও নারী শ্রমিকদের জন্যে বাজেট খুবই নগন্য, তার উপরে স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর বসানো শুল্ক যেন মুখের উপর জুতোর বাড়ি।

নারী শ্রমিকদের মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলেছেন বেশ কিছু সংগঠন, হয়েছে প্রচুর গোল বৈঠক। নারী শ্রমিকদের মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অনলাইনে নিউজ খুঁজলে দেখা যায় প্রচুর গোল টেবিলে আলোচনা ও প্রকল্পের সংবাদ পাওয়া যায়। আর হ্যাঁ হাস্যকর ব্যাপার হলেও সত্যি অনেক কোম্পানি কারখানায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের বুথ বসিয়েছে কিন্তু হাস্যকর বোধ হয় এ কারণেই যে, সেগুলোর বাস্তবায়ন আদৌ হচ্ছে কিনা তার থেকেও সংবাদে কারখানার নাম ও মালিকের নাম বড় হরফে ছাপানো হচ্ছে। তবে এসবকে বিজ্ঞাপন বললে ভুল হবে না নিশ্চিত।

কারখানার নারী শ্রমিকদের প্রতি হয়ে যাওয়া এ অন্যায়ের অন্যতম অংশীদার দেশের আইন, সরকার ও বাণিজ্যিক কারখানার মালিকেরা। কিন্তু চোরে চোরে মাসতুতো ভাই বলেই, সকলে একে ওকে দেখিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। এরপর নিছক কথা এড়াতে হালকা বিস্তর কথা তুললেও দিনশেষে তারা সে গোল টেবিলে বসেই এক সাথে আনন্দ ফূর্তি করছেন। এরপর ভুক্তভোগী নারী শ্রমিকদের গিয়ে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, আইন, মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার আলাপ দিলে তারা খানিক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলতেই পারেন, পাছায় দেওয়ার কাপড় নেই আবার মিঠা দিয়ে ভাত খাবো? নারী শ্রমিকদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কতদূর যেনৃৃ ঐ তো বহুদূর এখনো।