দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ স্বাদু পানির মৎস্য ভাণ্ডার পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই হ্রদ। ছয় দশক আগে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রধান লক্ষ্য করে এ হ্রদের সৃষ্টি হলেও বর্তমানে দেশের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। তবে ক্রমবর্ধমানভাবে হ্রদটিতে ছোট প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য্য বাড়ায় ছোট প্রজাতির মাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত কয়েকবছরে কাপ্তাই হ্রদের মাছ বাজারজাতকরণ বাড়ছে। চলতি আহরণ মৌসুমে গত মৌসুম থেকে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন মাছ বেশি বাজারজাত করা গেলেও এর ৭৫ শতাংশই কেচকি–চাপিলা; অর্থাৎ দুটি প্রজাতির মাছ।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাপ্তাই হ্রদে মাছ চাষ, বিপণন, রাজস্ব আদায় ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্র। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ আহরণ মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদ থেকে কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের রাঙামাটির প্রধান বিপণন কেন্দ্রসহ কাপ্তাই, মারিশ্যা ও খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপকেন্দ্রে ৯ হাজার ৯৭১ মেট্রিক টন বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ অবতরণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে পুরো আহরণ মৌসুমে অবতরণের (ল্যান্ডিং) পর বাজারজাত করা মাছ থেকে ২২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা শুল্কহার বা রাজস্ব আদায় করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির বিগত পাঁচ বছরের মৎস্য অবতরণ ও শুল্কহার আদায়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে হ্রদের মাছের বাজারজাত ও রাজস্ব আয় দুটোই বেড়েছে। তবে ২০২০–২১ আহরণ মৌসুমের পর ২০২১–২৩ সাল পর্যন্ত টানা দুবছর মাছ বাজারজাতকরণ ও রাজস্ব আয় কিছুটা কমলেও পরবর্তীতে সেটি ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। তথ্য বলছে, ২০২০–২১ আহরণ মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদ থেকে ৬ হাজার ৭৯৪ মেট্রিক টন মাছ বাজারজাতকরণের বিপরীতে ১৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা শুল্কহার আদায় হয়। এছাড়া ২০২১–২২ মৌসুমে ৬ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টনের বিপরীতে ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, ২০২২–২৩ মৌসুমে ৫ হাজার ৫১১ মেট্রিক টনের বিপরীতে ১২ কোটি ১২ লাখ টাকা, ২০২৩–২৪ মৌসুমে ৭ হাজার ৬৬৪ মেট্রিক টনের বিপরীতে ১৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, ২০২৪–২৫ মৌসুমে ৮ হাজার ৯৯৭ মেট্রিক টনের বিপরীতে ১৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থাৎ চলতি মৌসুমে ৯ হাজার ৯৭১ মেট্রিক টনের বিপরীতে ২২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
চলতি মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের বাজারজাতকৃত মাছের প্রজাতিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, এবার সবচেয়ে বেশি চাপিলা মাছ বাজারজাতকরণ করা হয়েছে। হ্রদ থেকে ৪ হাজার ৩৩১ মেট্রিক টন চাপিলা মাছ বাজারজাতকরণ করা হয়, যা মোট বাজারজাতকৃত মাছের ৪০ শতাংশ। এছাড়া কেচকি মাছ বাজারজাত হয়েছে ৩ হাজার ৪৬৭ মেট্রিক টন, যা মোট বাজারজাত করা মাছের ৩৫ শতাংশ। হিসাবে দেখা গেছে, বাজারজাত করা মাছের ৭৫ শতাংশই হচ্ছে কেচকি–চাপিলা, যেগুলা আকারে ছোট প্রজাতির মাছ। অর্থাৎ হ্রদের বাজারজাত করা মাছের মধ্যে কেচকি–চাপিলা থেকেই রাজস্ব আসে বেশি।
কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. ফয়েজ আল করিম আজাদীকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে গত আহরণ মৌসুমের চেয়ে প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টনের মতো মাছ বাজারজাতকরণ বেড়েছে। এতে করে আমাদের শুল্কহার আদায়ও বাড়ল। বিশেষত চলতি বছর নির্ধারিত সময়ে কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ শুরু হয়েছে এবং পানি কমতে থাকায় এবার ৬ দিন মাছ শিকার বন্ধ হল। মোটামুটি পুরো নয়মাস আহরণ মৌসুমজুড়েই হ্রদ থেকে মাছ শিকার করতে পারলো জেলেরা। এছাড়া অন্যান্য মৌসুমে হ্রদের পানি তাড়াতাড়ি কমতে থাকায় অনেক সময় ২০–২৫ দিন আগেই হ্রদে মাছ আহরণ বন্ধ করতে হয়েছে। সেজন্য তখন মাছ আহরণ কিছুটা কমেছে। এছাড়া আমাদের বিএফডিসির বিপণন কেন্দ্রগুলোতে মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে; মনিটরিং অবতরণকৃত মাছ বাড়ার অন্যতম কারণ।’
কাপ্তাই হ্রদে কেচকি–চাপিলা মাছের আধিক্য প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এ কমান্ডার বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদে দীর্ঘদিন থেকে ছোট প্রজাতির মাছ বেড়ে চলছে। তবে বড় প্রজাতির মাছগুলো বিএফডিসি বিপণনকেন্দ্র হয়ে বাজারজাতকরণের চেয়ে স্থানীয় বাজারে বেশির ভাগ চলে যায়। কাপ্তাই হ্রদে ছোট প্রজাতির মাছ কেন বাড়ছে; এটি নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।’
কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের সুষ্ঠু প্রজনন, বংশ বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত ও হ্রদে অবমুক্ত করা পোনার সুষম বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছরের ১ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত তিন মাস মাছ শিকার বন্ধের নিষেধাজ্ঞা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। এসময় স্থানীয় বরফ কলসমূহও বন্ধ থাকে। তবে চলতি মৌসুমে হ্রদের মা মাছের প্রজননের সময় ঘনিয়ে আসায় ৬ দিন আগেই অর্থাৎ ২৫ এপ্রিল রাত ১২টার পর থেকে হ্রদে মাছ শিকার বন্ধ হয়েছে। এবার নির্ধারিত তিন মাস ৬ দিন সময়ের পর মাছ শিকার শুরু হওয়ার প্রচলিত রীতি থাকলেও কাপ্তাই হ্রদের পানির ওপর নির্ভর করবে হ্রদে মাছ শিকার শুরু কবে হতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পর্যাপ্ত পানি না বাড়লে বর্ধিত হতে পারে নিষেধাজ্ঞার সময়ও।














