চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন চকরিয়ার হারবাং থেকে পূর্ব দিকে বান্দরবানের লামা উপজেলার সীমান্ত পর্যন্ত এলাকাটি সংরক্ষিত বনভূমি। এই বনে হাতিসহ রয়েছে বিভিন্ন বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু সেখানে গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ বসতি। এসব অবৈধ বসতি স্থাপন করতে গিয়ে দেদার উজাড় করা হয়েছে বনের গাছপালা, সাবাড় করা হয়েছে শত শত পাহাড়ও।
এবার গড়ে উঠা অবৈধ বসতিতে বসবাসকারী লোকজনের এবং বন উজাড়কারীদের সুবিধার্থে সেই সংরক্ষিত বনের প্রায় ৫ কিলোমিটারজুড়ে স্থায়ী আরসিসি সড়ক তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এই সড়ক নির্মাণের অজুহাতে প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে ক্ষতবিক্ষত করাসহ সাবাড় করে ফেলা হয়েছে অসংখ্য উঁচু–নিচু ও টিলা শ্রেণির পাহাড়। এই অবস্থায় সংরক্ষিত বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশসহ জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বনবিভাগের নাকের ডগায় পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড মাসখানেক ধরে চলে আসলেও কর্মকর্তারা রয়েছেন কুম্ভকর্ণের ভূমিকায়। সড়ক তৈরি করতে গিয়ে অসংখ্য পাহাড় সাবাড় করার বিষয়টি নিয়ে চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেলে বনবিভাগ দায়সারাভাবে সড়কের কাজ বন্ধ রাখতে একটি পত্র দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বনবিভাগের পক্ষ থেকে কাজ বন্ধ রাখতে পত্র দেওয়া হলেও কার্যত তা কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। উপরন্তু সড়ক নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বনবিভাগের ওই পত্রকে আমলে না নিয়ে সমানে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে বনবিভাগসহ স্থানীয় পরিবেশ সচেতন অনেকেই জানিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতর এই সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। এই বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর কাজ করা এলজিইডির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এরপরও ২০২০ সালে প্রকল্পের সম্ভ্যাব্যতা যাচাইয়ের সময় এই সড়কের সিংহভাগ যে বনের ভেতর পড়েছে তা ভুলক্রমে হয়ে থাকতে পারে। ভবিষ্যতে প্রকল্প নেওয়ার সময় যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেদিকে নজর থাকবে। প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন– বনবিভাগের আপত্তিসংক্রান্ত পত্র পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সরজমিন দেখা গেছে– ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগের চেয়ে আরো বেশি মাত্রায় পাহাড় সাবাড়সহ বনের গাছপালা কেটে সড়ক নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কাটার চিহ্ন এবং নির্মাণকাজের আলামত বলছে, বন বিভাগের আপত্তি ও কাজ বন্ধের নির্দেশের পরও বিষয়টি পুরোপুরি থামেনি। ফলে প্রকল্পের অনুমোদন, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বন বিভাগের নির্দেশ বাস্তবায়ন কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, সংরক্ষিত বনের ভেতরকার প্রায় ৫ কিলোমিটারের এই সড়কের মধ্যে প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে সরকারের গেজেট নোটিফিকেশনভুক্ত সংরক্ষিত বনভূমি। এই বনে রয়েছে বন্য হাতির চলাচল। সড়কের পাশে রয়েছে শতবর্ষী মাদার ট্রি (গর্জন), প্রায় ৫০ একরের সুফল বনায়ন। তবে বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনের ভেতর স্থায়ী সড়ক নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণের সময় আগে থেকে নেওয়া হয়নি বনবিভাগের অনুমতি।
এই বিষয়ে হারবাং বনবিট কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, সরকারি দপ্তর এলজিইডিই এই সড়ক নির্মাণের উদ্যোক্তা। সংরক্ষিত বনের ভেতর এই সড়ক নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে ২০২০ সালে। অতিসম্প্রতি এই সড়ক নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে তা নজরে আসার পর ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়। এর বাইরে আগ বাড়িয়ে আমার আর কিছুই করার ছিল না।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবির হাসান বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর পাহাড় সাবাড় করে স্থায়ী আরসিসি সড়ক নির্মাণের বিষয়টি স্থানীয় বিট কর্মকর্তা মারফত অবগত হওয়ার পর এলজিইডির সংশ্লিষ্ট শাখায় লিখিতভাবে পত্র দিয়ে কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর স্থায়ী ও প্রশস্ত পাকা সড়ক নির্মাণ হলে প্রতিনিয়ত মানুষের অবারিত যাতায়াত সহজলভ্য হওয়ার পাশাপাশি যানবাহনের চলাচলও বেড়ে যাবে। এতে গাছপালা উজাড়, বন্য প্রাণী শিকার ও নতুন করে বনভূমি দখলের সুযোগ বেড়ে যাবে। যানবাহন চলাচল বাড়লে বন্য হাতির স্বাভাবিক চলাচলেও বাধা তৈরি হতে পারে। আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হলে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে। একই সঙ্গে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে পাহাড় সাবাড় করাসহ জীববৈচিত্র্য হুমকিতে ফেলার ঘটনার জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেবে বনবিভাগ।












