কর্মক্ষেত্রে একজন সহকর্মী বারবার কারও চেহারা বা পোশাক নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করছেন। অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগত মেসেজ পাঠাচ্ছেন। উত্তর না পেয়ে রাতেও বারবার যোগাযোগ করছেন। কিংবা পদোন্নতি, চাকরি স্থায়ী করা বা কোনো পেশাগত সুবিধার বিনিময়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। কোথাও কোনো শারীরিক স্পর্শ ঘটেনি। তাহলে এগুলো কি যৌন হয়রানি? দীর্ঘদিন যৌন হয়রানি বলতে মূলত অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ বা সরাসরি যৌন প্রস্তাবকেই বোঝার প্রবণতা ছিল। কিন্তু কর্মজগত বদলেছে। অফিস এখন শুধু একটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ই– মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ভিডিও মিটিং কিংবা অফিসের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপও কর্মক্ষেত্রের সমপ্রসারিত অংশ। সেই সঙ্গে যৌন হয়রানির ধরনও বদলেছে। বাংলাদেশের সামপ্রতিক আইনি পরিবর্তন এই নতুন বাস্তবতাকে গুরুত্বপূর্ণভাবে সামনে এনেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে উপদেষ্টা পরিষদ ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’–এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অবমাননাকর শারীরিক, মৌখিক ও অমৌখিক আচরণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই–মেইল, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত যৌন হয়রানিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ ডিজিটাল মাধ্যমে ঘটছে বলেই কোনো আচরণ আর কর্মক্ষেত্রের হয়রানির আলোচনার বাইরে থাকবে না। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অফিসের যোগাযোগের ধরন গত কয়েক বছরে আমূল বদলেছে। একজন সহকর্মীর ফোন নম্বর পাওয়া এখন খুব স্বাভাবিক। কাজের প্রয়োজনে রাতে মেসেজও আসতে পারে। কিন্তু কাজের যোগাযোগ আর ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করা এক বিষয় নয়। যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মেসেজ পাঠানো, অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত বা যৌন প্রশ্ন করা, আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও পাঠানো কিংবা কারও অনাগ্রহের পরও একই ধরনের যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া–এসব ক্ষেত্রে মাধ্যম ডিজিটাল হলেও আচরণের প্রভাব বাস্তব।
বাংলাদেশে বিষয়টি একেবারে নতুনভাবে শুরু হয়নি। ২০০৯ সালে Bangladesh National Women Lawyers Association বনাম বাংলাদেশ সরকার মামলায় হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেখানে শুধু শারীরিক আচরণ নয়, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন অঙ্গভঙ্গি, যৌন সুবিধা চাওয়া, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন, অনুসরণ করাসহ বিভিন্ন আচরণকে যৌন হয়রানির আওতায় আনা হয়। আদালত সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থার কথাও বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালায়ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধের বিধান যুক্ত হয়। আর বর্তমান শ্রম আইনের সংজ্ঞায় অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আবেদনমূলক আচরণ, পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা, যৌন নিপীড়নমূলক উক্তি, যৌন সুবিধা চাওয়া, পর্নোগ্রাফি দেখানো, যৌন আবেদনমূলক মন্তব্য বা ভঙ্গি এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ঠাট্টা–উপহাসের মতো আচরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এখানে একটি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ–অনাকাঙ্ক্ষিত। দুই প্রাপ্তবয়স্ক সহকর্মীর পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক আর যৌন হয়রানি এক বিষয় নয়। সমস্যাটি তৈরি হয় যখন কোনো আচরণ একজনের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত, আপত্তিকর বা অপমানজনক, অথচ অন্য ব্যক্তি সেটি চালিয়ে যান। আবার ক্ষমতার অসম সম্পর্ক থাকলে বিষয়টি আরও জটিল। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি পেশাগত সুবিধার বিনিময়ে যৌন বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রত্যাশা করেন, তাহলে অধস্তন কর্মীর ‘সম্মতি’ কতটা স্বাধীন–সেই প্রশ্নও আসে। শ্রম আইনে এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘কুইড প্রো কো’ হয়রানির ধারণার মধ্যেও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যৌন আচরণ মেনে নেওয়া বা প্রত্যাখ্যান করার ওপর যদি চাকরি–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে, সেটি হয়রানির একটি গুরুতর রূপ। আবার এমন আচরণও যৌন হয়রানির মধ্যে পড়তে পারে, যা কর্মক্ষেত্রে ভীতিকর, প্র্রতিকূল, অপমানজনক বা অবমাননাকর পরিবেশ তৈরি করে।
এই সংজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণে। যৌন হয়রানি সব সময় সরাসরি কোনো প্রস্তাব দিয়ে শুরু হয় না। কারও শরীর নিয়ে নিয়মিত মন্তব্য, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন কিংবা অফিসের গ্রুপে আপত্তিকর ছবি শেয়ার করার মতো আচরণও ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে একজন কর্মী নিরাপদ বা সম্মানিত বোধ করেন না। ডিজিটাল যোগাযোগে আরেক ধরনের জটিলতা রয়েছে। সামনাসামনি কথার অনেকটাই পরে প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু অনলাইন হয়রানি প্রায়ই ডিজিটাল চিহ্ন রেখে যায়–মেসেজ, ই–মেইল, ছবি কিংবা কলের তথ্য। ভুক্তভোগীর জন্য প্রাসঙ্গিক যোগাযোগ সংরক্ষণ করা তাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সেই প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে দেওয়া সব ক্ষেত্রে নিরাপদ বা বিচক্ষণ পদক্ষেপ নাও হতে পারে; ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, প্রতিষ্ঠানের নীতি এবং সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়াও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির আলোচনায় প্রায়ই নারীকেই বলা হয়–কীভাবে পোশাক পরবেন, কার সঙ্গে কথা বলবেন, রাতে উত্তর দেবেন কি না কিংবা কীভাবে নিজেকে ‘সুরক্ষিত’ রাখবেন। কিন্তু নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরির প্রধান দায়িত্ব সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর নয়, প্রতিষ্ঠানেরও। অভিযোগ জানানোর পরিষ্কার ও গোপনীয় ব্যবস্থা, অভিযোগকারীকে প্রতিশোধমূলক আচরণ থেকে সুরক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কর্মীদের নিয়মিত সচেতন করা–এসব ছাড়া শুধু নীতিমালা লিখে রাখলে বাস্তবে খুব বেশি পরিবর্তন আসে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটির গুরুত্ব বোঝাতে তৈরি পোশাক খাতের একটি পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালে প্রকাশিত The Daily Star–এর আইনবিষয়ক একটি বিশ্লেষণে উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া নারী পোশাক শ্রমিকদের ৭৯.৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। একটি নির্দিষ্ট খাতের গবেষণাকে অবশ্য সব কর্মক্ষেত্রের চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না; কিন্তু সংখ্যাটি সমস্যার গভীরতা সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করে।
আমরা জানি, আইন থাকলেই আচরণ রাতারাতি বদলে যায় না। অনেক নারী অভিযোগ করেন না চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিক লজ্জা, সহকর্মীদের অবিশ্বাস কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে ক্ষতির আশঙ্কায়। বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতাবান হলে অভিযোগ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই যৌন হয়রানি প্রতিরোধের প্রশ্নটি শুধু অপরাধ ও শাস্তির নয়; প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো এবং কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নও। একই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে প্রতিটি অস্বস্তিকর সামাজিক আচরণকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন হয়রানি বলে চিহ্নিত করা না হয়। আচরণের প্রকৃতি, প্রেক্ষাপট, অনাকাঙ্ক্ষিত হওয়া, পুনরাবৃত্তি এবং ক্ষমতার সম্পর্ক–সবই বিবেচ্য। পরিষ্কার সংজ্ঞা তাই অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি একদিকে হয়রানিকে ছোট করে দেখার সুযোগ কমায়, অন্যদিকে অভিযোগ যাচাইয়ের একটি ন্যায্য ভিত্তি তৈরি করে।
কর্মক্ষেত্র বদলেছে, যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে। ফলে নিরাপত্তার ধারণাটিকেও বদলাতে হচ্ছে। একটি অফিসে কেউ শারীরিকভাবে নিরাপদ থেকেও প্রতিদিন একটি ফোনের পর্দায় হয়রানির মুখোমুখি হতে পারেন। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের আইনি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এখানেই–যৌন হয়রানি চিহ্নিত করতে এখন আর শুধু দেখতে হবে না, কে কাকে স্পর্শ করেছে। দেখতে হবে ক্ষমতা, ভাষা, ইঙ্গিত এবং ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে কার ব্যক্তিগত সীমা ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হচ্ছে। নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের অর্থ শুধু শরীরের নিরাপত্তা নয়; সম্মান নিয়ে কাজ করার অধিকারও তার অংশ।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয়ের Laws of Bangladesh –এ প্রকাশিত বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান; The Business Standard, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশের অনুমোদনসংক্রান্ত প্রতিবেদন; The Daily Star , ৩০ জানুয়ারি ২০২৬–অধ্যাদেশের পরিধি ও ডিজিটাল হয়রানিসংক্রান্ত প্রতিবেদন; The daily Star Law & Our Rights, ২ জুলাই ২০২৬–বাংলাদেশে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধের আইনি কাঠামো।










