প্রথমে ক্রেতার সাথে গড়ে তোলেন সখ্য। এরপর লভ্যাংশের আশ্বাস দিয়ে ক্রেতাদের প্রস্তাব দেন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার। কাউকে আবার ‘পার্টনার’ করারও লোভ দেখান। এসব ‘প্রলোভন’ ও বিনিয়োগের ‘ফাঁদ’–এ পড়ে ৩৮ নারী ক্রেতা তার হাতে তুলে দেন কোটি টাকার বেশি। এরপর চলে যায় কয়েক মাস। লভ্যাংশ তো দূরের কথা, মূলধনও ফেরত দেয় না বিনিয়োগকারীদের।
এমন অভিযোগ উঠেছে নগরের খুলশী টাউন সেন্টারের ‘জ্যাজটানা বুটিক ওয়ার্ল্ড (প্রি লাভড রেন্ট বাই জ্যাজটানা)’-এর স্বত্ত্বাধিকারী জেসমিন আক্তার রানীর বিরুদ্ধে। বর্তমানে ‘আত্মগোপন’–এ আছেন তিনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেসমিনের ‘প্রতারণার’ সঙ্গে তার স্বামী এবং বাবাও জড়িত। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–এ পৃথক দুটি মামলার আবেদন করেন ভুক্তভোগী এক চিকিৎসকসহ দুই নারী। এর মধ্যে গত ১৯ জুলাই চিকিৎসকের দায়ের করা মামলায় জেসমিন ও তার স্বামী জাবের আবদুল্লাহ দোভাষের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। দেয়া হয় দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও।
এছাড়া গত ২৮ জুলাই দায়ের হওয়া আরেকটি মামলার আবেদনকে ‘এফ আই আর’ হিসেবে গণ্য করে ৩ দিনের মধ্যে আদালতকে অবহিত করার জন্য খুলশী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন বিচারক। ওই মামলায় জেসমিনের পাশাপাশি তার বাবার বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়।
এদিকে আজাদীর কাছে গতকাল পর্যন্ত ৩৮ জন ভুৃক্তভোগী নারীর তথ্য এসেছে। যারা জেসমিনের কাছে মোট ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা পাবেন বলে দাবি করেছেন। তারাও মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত পৃথক ৯টি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে জেসমিনের নামে। কোতোয়ালী থানার এসআই রাশেদ আজাদীকে জেসমিন ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারির বিষয়টি নিশিচত করে বলেন, তাদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের অবস্থান সনাক্তের চেষ্টা করছি। তারা এর মধ্যে তারা বাসায়ও আসেনি। তারা যে কয়টি মোবাইল ব্যবহার করে সবগুলো বন্ধ।
চিকিৎসা নিতে এসে পরিচয়, অতঃপর : গত ১৯ জুলাই এক চিকিৎসক চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–এ একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আরজি সূত্রে জানা যায়, জেসমিন আক্তার রানী ও জাবের আবদুল্লাহ দোভাষ দম্পত্তি ওই ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন এবং সেখানে পরিচয় হয়। পরিচয়ের সুবাদে জেসমিন তার প্রতিষ্ঠানে প্রতি ১ লাখ টাকায় মাসে ৭ হাজার টাকা লভ্যাংশ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে চিকিৎসককে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করেন। এসময় জাবের আশ্বাস দিয়ে বলেন, লোকসান হলে যাবতীয় আর্থিক দায়ভার তিনি নিবেন। এরপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৩ জুন থেকে একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কয়েক দফায় বিনিয়োগ হিসেবে জেসমিন আক্তার রানীকে ৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা প্রদান করেন ওই চিকিৎসক।
মামলার আরজিতে বলা হয়, চুক্তি ও পোস্ট ডেটেড চেক দিলেও লভ্যাংশসহ পাওনা ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ফেরত না দিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকেন জেসমিন। এরপর চলতি বছরের ১০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানের প্যাডে তিনি লিখিতভাবে আশ্বাস দেন প্রতি মাসের ২৫ তারিখ এক লখ টাকা করে পরিশোধ করবেন। যা মে মাস থেকে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রাখেননি জেসমিন।
ওই চিকিৎসকের স্বামী আজাদীকে জানান, পাওনা টাকা পাওয়ার আশায় তার স্ত্রী জেসমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সর্বশেষ সব টাকা ফেরত দেয়ার আশ্বাস দিয়ে জেসমিন তার স্ত্রীকে গত ১৭ জুলাই তার খুলশী টাউন সেন্টারে তার প্রতিষ্ঠানে ‘জ্যাজটানা বুটিক ওয়ার্ল্ড (প্রি লাভড রেন্ট বাই জ্যাজটানা) যেতে বলেন। ওইদিন রাত সাড়ে ৮ গিয়ে তারা দোকানটি তালাবদ্ধ দেখতে পান। এসময় আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানায়, পাওনাদারদের পাওনা না মেটাতে পেরে দীর্ঘদিন ধরে দোকান বন্ধ রেখে আত্মগোপনে রয়েছেন জেসমিন।
জানা গেছে, চিকিৎসকের করা এ মামলাটিতেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় জেসমিন ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে।
পার্টনার করার লোভ দেখান ফাতেমা’কে : ফাতেমা সুলতানা নামে এক গৃহিণীর অভিযোগ– তাকে ‘জ্যাজটানা বুটিক ওয়ার্ল্ড (প্রি লাভড রেন্ট বাই জ্যাজটানা)-এ বিনিয়োগ করে পার্টনার করার প্রস্তাব দেন জেসমিন। এছাড়া অধিক বিনিয়োগ করলে বিভিন্ন স্লটে বেশি পরিমাণ লভ্যাংশ দেয়ার কথা জানান। এতে বিশ্বাস করে ১৯ দফায় ১৬ লাখ ২০ হাজার টানা বিনিয়োগ করেন ফাতেমা। এ বিষয়ে গত ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলার আবেদন করেন তিনি। আদালত ‘এফ আই আর’ হিসেবে তা গণ্য করে ৩ দিনের মধ্যে আদালতকে অবহিত করার জন্য খুলশী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। ফাতেমার মামলার আরজিতে জেসমিন আক্তার রানী ও তার পিতা মো. সাইফুল্লাহ প্রকাশ এস কে সাইফুল্লাহ’র বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
মামলার আরজি সূত্রে জানা গেছে, ফাতেমা সুলতানা ও তার পরিবারের সদস্যরা জেসমিনের দোকান থেকে নিয়মিত কেনাকাটা ও কাপড় ভাড়া করতেন। ওই হিসেবে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে জেসমিন পার্টনার হওয়ার প্রস্তাব দেন ফাতেমাকে। এক্ষেত্রে ফাতেমাকে জেসমিন বলেন– ‘বিনিয়োগ করে পার্টনার হয়ে যান। কাপড় চোপড় ভাড়ায় নিতে হবে না আর। অধিকন্তু বিনিয়োগ করিলে প্রতি লক্ষ টাকায় মাসিক সাত হাজার টাকাসহ বিভিন্ন স্লটে অধিক পরিমান লভ্যাংশ প্রদান করা হবে। ইতোমধ্যে অনেকেই বিনিয়োগ করে প্রচুর পরিমানে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে’।
এ প্রস্তাবে রাজি না হলে জেসমিনের বাবা সাইফুল্লাহ নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করা যাবে বলে আশ্বস্ত করেন ফাতেমাকে। এতে প্রলুব্ধ হয়ে ১৯ দফায় ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন বলে দাবি করেন ফাতেমা। ফাতেমার দাবি, লভ্যাংশসহ এই টাকা ২২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা হবে।
টাকা চাইলে হুমকি : চিকিৎসকের করা মামলার আরজিতে বলা হয়, দোকান বন্ধ পেয়ে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করা হলে সমস্ত চুক্তি ও দেনা–পাওনা অস্বীকার করেন জেসমিন। এমনকি ভবিষ্যতে টাকার জন্য দোকানে গেলে বা খোঁজখবর নিলে হুমকি দেন।
বিনিয়োগকারী থেকে কোটি টাকা নেয়ার দাবি : ভুক্তভোগী চিকিৎসকের মামলার আরজির সূত্রে জানা গেছে, ওই চিৎিসক কেবল তিনিই নন; জেসমিন একইভাবে আরো অনেক বিনিয়োগকারীর কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এদিকে আজাদীর কাছে একাধিক নারী অভিযোগ করেছেন, তাদের কাছ থেকেও লভ্যাংশ দেয়ার কথা বলে বিনিয়োগের নামে টাকা নিয়েছেন জেসমিন। কিন্তু তাদের লভ্যাংশ, এমনকি মূলধনও ফেরত দেয়া হচ্ছে না। আজাদীর কাছে গতকাল পর্যন্ত ৩৮ জন ভুৃক্তভোগী নারীর তথ্য এসেছে। যারা জেসমিনের কাছে মোট ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা পাবেন বলে দাবি করেছেন। সিদরাতুল মুনতাহা নামে এক নারী আজাদীকে জানান, তার কাছ থেকেও বিনিয়োগের কথা বলে টাকা নিয়েছেন জেসমিন। তিনি ২৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা পাবেন।
জানা গেছে, লাভের আশায় জেসমিনকে টাকা দিয়ে মূলধন না পাওয়াদের অনেকে এনআই অ্যাক্ট– এ মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে আইনজীবীর মাধ্যমে ৯টি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে জেসমিন বরাবর। এর মধ্যে উম্মে হাসিনা, সায়মা ও সাদিয়ার পক্ষে একটি করে নোটিশ পাঠানো হয়। এছাড়া ফারজানা ও সিদরাতুল মুনতাহা ৩টি করে নোটিশ পাঠিয়েছেন।











