কক্সবাজারে ১৩ মাসে এইডস আক্রান্ত ১৪৬, মৃত্যু ১৬

কক্সবাজার ও রামু প্রতিনিধি | শনিবার , ৬ আগস্ট, ২০২২ at ৩:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ডেঙ্গুর পর এবার কক্সবাজারে আশংকাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে মরণঘাতি এইডস্‌। গত ১৩ মাসে কক্সবাজারে ১৪৬ জনের শরীরে এইডস্‌ -এর ভাইরাস ধরা পড়েছে। আর এই এইডস্‌ আক্রান্তদের মধ্যে ইতোমধ্যে মারা গেছে ১৬ জন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মধ্যেই এইচআইভি বা এইডস্‌ ভাইরাস সংক্রমণের হার আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীও মরণব্যাধি এ ভাইরাসের ঝুঁকিতে পড়েছে। গত ১৩ মাসে যে ১৪৬ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৩৬ জনই রোহিঙ্গা। এ ছাড়া গত ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত গত সাড়ে ছয় বছরে কক্সবাজারে এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়া ৯৮৮ জনের মধ্যে ৭৯৪ জন রোহিঙ্গা এবং ১৯৩ জন বাংলাদেশী। আক্রান্তদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৯ জন রোহিঙ্গা এবং ৫৭ জন বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত ৯৮৮ জনের মধ্যে ৫০৯ জনই নারী। এদের মধ্যে ৯১ জন রোহিঙ্গাসহ ১০০জন গর্ভবতী নারীও রয়েছেন। এছাড়াও আক্রান্তদের মধ্যে ৩৬৮ জন পুরুষ, ১১৩টি শিশু এবং ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারী বা হিজড়াও রয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ও এআরটি সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. আশিকুর রহমান বলেন, কক্সবাজার এইচআইভি/এইডস্‌ আক্রান্তের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের গণহারে এইচআইভি পরীক্ষা করা হলে এ সংখ্যা আরও অনেক গুণ বাড়বে। বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে ৭২৬ জন চিকিৎসার আওতায় আছেন জানিয়ে ডা. আশিক আজাদীকে বলেন, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘প্রিভেনশান মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন’ (পিএমসিটি) নামে একটি প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। এই প্রোগামে এইচআইভি পজেটিভ গর্ভবতী মায়ের গর্ভের সন্তানটি যেন এইচআইভি নেগেটিভ হয়, সে লক্ষ্যে সেবাদান করা হচ্ছে। এই সেন্টারে গত বছরের জুলাই থেকে এ বছর জুন পর্যন্ত এক বছরে ১ হাজার ৩৪২ জনের এইচআইভি টেস্ট করা হয়েছে এবং এদের মধ্যে ১২৯ জন এইচআইভি পজেটিভ ধরা পড়েছে, যার মধ্যে ১১৯ জনই রোহিঙ্গা বলে তিনি জানান। এ অবস্থায় শিবিরগুলোতে ব্লক ভিত্তিক টেস্ট করানো হলে আক্রান্তের সংখ্যা আরো অনেক গুণ বাড়তে পারে বলে আশংকা তাঁর।
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের ২৯ বছর বয়সী এক বাসিন্দা বৃহস্পতিবার কক্সবাজার সদর হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে চিকিৎসা নিতে আসেন। তিনি জানান, এক বছর আগে তার ২৮ বছর বয়সী স্ত্রীর এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ে। প্রথম প্রথম জ্বর, ডায়রিয়ার মত কিছু শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলেও পরে তা ঠিক হয়ে যায়। প্রায় এক বছর পর একই সমস্যা দেখা দেয় আমারও। ক্যাম্পে ডাক্তার দেখালে তারা এইডস পরীক্ষা করতে বলেন এবং গতমাসে আমারও সংক্রমণ ধরা পড়ে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের পাঁচ সন্তান। কিন্তু কারোই এইডস্‌ পরীক্ষা করা হয়নি। একইদিন উখিয়ার জামতলী শিবিরের আরেক বাসিন্দা তার কন্যা শিশুকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেন। টেস্টে শিশুটির শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ে।
কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল মজিদ আজাদীকে বলেন, আমাদের পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার ও ভারতে এইডস্‌ এর সংক্রমণ হার অনেক বেশি। ফলে সম্প্রতি মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে কক্সবাজারের স্থানীয়রাও চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এ সব ঝুঁকি ঠেকাতে সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে
স্থানীয়দের মাঝেও এইডস্‌ ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বর্তমানে কক্সবাজারে এইচআইভি সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এখানকার পর্যটন শিল্প উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ছে বলে মনে করেন কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, এখানকার কিছু কিছু হোটেল-মোটেল ও স্পা সেন্টারে গোপনে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে বলে জানতে পেরেছি। যা এইডস্‌ সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে কারণে অসামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে সকল স্পা সেন্টারের কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য ট্যুরিস্ট পুলিশ অফিসে জমা দেওয়ার এবং কর্মী নিয়োগের সময় ও প্রতি তিনমাস অন্তর তাদের এইচআইভি টেস্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান আজাদীকে জানান, এইডস্‌ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের নানা প্রচার-প্রচারণা, কাউন্সেলিং ছাড়াও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এইডস প্রতিরোধে কাজ করছে। তিনি জানান, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল এবং উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও সদর হাসপাতালে এন্টি রেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার আছে, যেখানে এইডস্‌ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং কাউন্সেলিং করা হয়।
এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসা নিতে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কারও লক্ষণ আছে মনে হলেই তাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে, যিনি এখনো সুস্থভাবে বেঁচে রয়েছেন। সরকারি হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে এইডস্‌ সংক্রমিত রোগী রয়েছেন ১৪ হাজার জন। তাদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ রোগী চিকিৎসার আওতায় থাকলেও অন্যরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের আগে এবং পরে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন প্রায় ১২ লাখ। তারা কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফের ৩৪টি অস্থায়ী আশ্রয় শিবির এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে অবস্থান করছে। যারা সবাই এইচআইভি/এইডস্‌-এর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।