কক্সবাজারে পর্যটন জোনে ফুটপাতে দুই সহস্রাধিক অবৈধ দোকান

পর্যটকদের ভোগান্তি

শাহেদ মিজান, কক্সবাজার | সোমবার , ২২ জুন, ২০২৬ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ

পর্যটন শহর কক্সবাজারের কলাতলীতে ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে দুই সহস্রাধিক অবৈধ দোকান। পৌরসভার উদ্যোগে ড্রেন নির্মাণের জন্য তৈরি করা ফুটপাতে রাতারাতি এসব দোকান বসানো হয়েছে। এতে চলাচলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকরা। অন্যদিকে এতে এই পর্যটন জোনের সৌন্দর্য্য নষ্ট হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছেপ্রভাবশালীদের রাতারাতি বসানো এসব অবৈধ দোকান নিয়ে নীরব রয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ উঠেছে, পর্যটন জোন কলাতলীর অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর ১১টি স্থানে অন্তত দুই হাজারের অধিক অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতা, হোটেল মালিক এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব দোকান বসানো হয়েছে। এসব অবৈধ দোকান থেকে কোটি টাকার বেশি চাঁদা যাচ্ছে এ প্রভাবশালীদের পকেটে।

সাধারণ হোটেল মালিক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, কক্সবাজার পৌরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় অবৈধ দখল প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন দোকান নির্মাণ করছে অসাধু লোকজন। অন্যদিকে কিছু অসাধ হোটেল মালিক ও হোটেল ব্যবসায়ীরাও নানা অজুহাতে বিভিন্ন স্থাপনা বসিয়ে দখল করছে পর্যটকদের চলাচলের ফুটপাত।

সরেজমিনে দেখা যায়, কলাতলী হোটেল মোটেল জোনের পাঁচটি ব্লকের ফুটপাতে বসানো হয়েছে নান্দনিক টাইলস। কক্সবাজার পৌরসভা, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, কউক শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধনে ফুটপাতের উপর বসিয়েছে এসব টাইলস। এই টাইলস বসানো ফুটপাতে প্রতিদিনই বাড়ছে স্থায়ী এবং অস্থায়ী দোকান। কোথাও দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার, কোথাও দখল করে বসানো হয়েছে পালকি দোকান, আবার কোথাও কুলিং কর্নার, কয়েকটি স্পটে দেখা গেছে অস্থায়ী রেস্টুরেন্টও।

কলাতলীর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিপরীতে গণপূর্তের সীমানা থেকে আরম্ভ হয়ে সুগন্ধা পয়েন্টের শেষ পর্যন্ত গিয়ে রাস্তার পূর্ব পাশে ফুটপাতের উপর বসানো হয়েছে অন্তত দুই শতাধিক দোকান। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পূর্ব দিকের গলিতে বসানো হয়েছে শতাধিক দোকান।

নিরিবিলি অর্কিডের বিপরীতে সাবেক তাহের ভবনের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকে চলে যাওয়া গলিতে সড়কের উপর বসেছে দুই শতাধিক দোকান। এর পরের পিছনের গলিতে নতুন করে নির্মিত ড্রেনের উপর বিভিন্ন হোটেলের কিচেন এবং পানের দোকান এমনকি হোটেলের জেনারেটরগুলো বসানো হয়েছে উন্মুক্ত স্থানে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই এসব জেনারেটর চালু করলে কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় পর্যটন শহরের উক্ত সড়কের পরিবেশ।

হোটেল লং বীচের বিপরীতে মোহাম্মদিয়া গেস্ট হাউস সংলগ্ন পূর্ব দিকের গলিতে পৌরসভার ড্রেনের উপর বসানো হয়েছে শতাধিক দোকান। কেউ করেছে ফার্মেসি, কেউ কুলিং কর্নার। আবার অনেক প্রভাবশালী বসিয়েছে ছোলা মুড়ির দোকান। মোহাম্মদীয়া গেস্ট হাউজের সামনে দক্ষিণ পাশে এবং পূর্ব পাশে অন্তত ১২ টি দোকান অস্থায়ীভাবে বসানো হয়। গলির মুখের অপর হোটেল সেন্টমার্টিনের সামনেপেছনে এবং উত্তর পাশে অন্তত দশটি দোকান অবৈধভাবে নির্মাণ করে মোটা টাকায় ভাড়া দিয়ে ব্যবসা চলছে।

সেন্টমার্টিন হোটেলের পেছনের গলিতে পৌরসভার ড্রেনের উপর অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে হোটেল মালিক মোটা অংকের সালামি নিয়ে চায়ের দোকান, গ্যাস লাইন এবং এর সরঞ্জাম বসিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পিছনের গলিতে ড্রেনের উপর বসানো হয়েছে মাছরাঙ্গা রেস্তোরাঁর জেনারেটর। উক্ত জেনারেটরের বিকট আওয়াজ এবং কালো ধোঁয়ায় পুরো পরিবেশ বিপন্ন এবং পর্যটকদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সারিতে মেজ্জান ডাইনসহ পাঁচটি রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের ময়লা আবর্জনা এবং গ্যাস লাইনগুলো পৌরসভার নবনির্মিত ড্রেনের উপর বসানোর কারণে পর্যটকদের চলাচল অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে। ৫০০ মিটারের পৌরসভার ড্রেনের উপর বসেছে পাঁচটি জেনারেটর এবং গ্যাসলাইন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই একসাথে ১০১২টি জেনারেটর চালু করলে পুরো পর্যটন কাল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ফলে পর্যটকরা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে রুম বুকিং ছেড়ে অন্যত্রে চলে যান বলে জানিয়েছেন কয়েকজন হোটেল মালিক।

সুগন্ধা পয়েন্টের পূর্ব পাশের গলিতে সৈকত পাড়া জামে মসজিদ পর্যন্ত ৫শ’ মিটারের জায়গায় অন্তত ৩শ’ অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ড্রেনের উপর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন প্রভাবশালী। পুরো ড্রেনজুড়ে বসানো হয়েছে রেস্তোরাঁ, ফার্মেসি, ডাব বিক্রির দোকানসহ বিভিন্ন দোকান।

কলাতলীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হোটেল সি প্যালাসের বিপরীতের গণপূর্ত পার্কের উত্তর এবং দক্ষিণ গলিতে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা। কুটুমবাড়ি রেস্তোরাঁ গলির পূর্ব দিকেও বেড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। ৮১০ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অবৈধ স্থাপনার উপর দোকান বসিয়ে দিব্যি ব্যবসাবাণিজ্য করে যাচ্ছে বছরজুড়ে।

কলাতলীর ডলফিন মোড়ে সড়কের উভয়পাশের উপর পৌরসভার ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অন্তত পাঁচ শতাধিক দোকান।

সড়কের উপর এবং পৌরসভার ফুটপাতের উপর দোকান বসানোর কারণে চাঁদাবাজি ঘিরে প্রতিদিনই ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। অন্যদিকে সড়ক সংকুচিত হওয়ার কারণে যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছেন পর্যটকরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ হোটেল মালিকরা অভিযোগ করে বলেন, পৌরসভার কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা মাসোহারার মাধ্যমে এসব দোকান বসানোর অনুমতি দিয়েছে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিংবা কক্সবাজার পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো অভিযান না করায় অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে সংকুচিত হয়ে আসছে পর্যটন এলাকার সড়ক এবং উপসড়কগুলো। এসব অবৈধ দোকানের চাঁদাবাজি নিয়ে প্রভাবশালী পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এবং মারামারির ঘটনাও ঘটছে।

কুমিল্লা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আবদুল কাদের বলেন, ‘পর্যটন শহরের এমন দশা কোনোভাবে কাম্য নয়। হোটেল থেকে বের হয়ে একদণ্ড দাঁড়ানো বা হাঁটাচলার কোনো উপায় থাকে না।’

কক্সবাজার হোটেলমোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘যেভাবে ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে তা অকল্পনীয়। এমন ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পর্যটকরা ভোগান্তি নিয়ে এখান থেকে ফিরে যান। এটা পর্যটন শিল্পে স্থায়ী প্রভাব পড়বে।’

পর্যটকদের চলাচল এবং পর্যটন নগরীর সৌন্দর্য্য রক্ষার্থে এসব অবৈধ দোকান অপসারণের দাবি করেছেন পর্যটক ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক শামীম আল ইমরান বলেন, ‘অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। শিগগিরই আরো বড় অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধনারিকেল গাছে বাঘ, আতঙ্ক
পরবর্তী নিবন্ধচেরাগী এলাকায় দুই লাইভ বেকারিকে জরিমানা