ওরে কর্ণফুলীরে

আবু তাহের মুহাম্মদ | বৃহস্পতিবার , ২০ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

যে কিনারায় নেমেছি তার নাম চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ব’টা লোরি অর্থাৎ উড়ন্ত পতাকা। কর্ণফুলী পাড়ি দিয়ে বাবার সাথে বাপ পিতেমোর বাড়ি যেতাম সেই কর্ণফুলী খরস্রোতে যে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে তার নিকটে আমাদের বাড়ি। তাই বাড়িতে আসা যাওয়া মানে কর্ণফুলীর জল দুফালি করে হাতের তালুতে জল নিয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হতো চট্টগ্রাম শহরের ১৫ নম্বর ঘাট থেকে। পাক আমলে নদীর ধারে ধারে বড় বড় পাথর ছিল আজকে যেরকম নেভাল একাডেমি বিরাট এক এভিনিউতে রূপ নিয়েছে সেটি সে সময় ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের লোক সংখ্যা তখন প্রায় ৭ কোটি। এ অঞ্চলের লোকজনের বসবাস অনেকটা কম পালতুলে ও দাঁড় বেয়ে সাম্পান চলত। স্থানীয় ভাষায় বলা হত দারে সরে। কর্ণফুলীর দিকবিদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো বয়া নানা জাতের পাখি ছোঁ মেরে বাঁকা ঠোটে তুলে নিত ছোট ছোট মাছ। প্রায়ই দেখা যেত রামধনুর মতো ডিগবাজি খেত ডলফিন। চাটগাঁ উপকূলের লোকেরা এই ডলফিন কে বলতো উছছুম মাছ।

নৌকায় ভর্তি ছিল কর্ণফুলীর দুতীর। গিজ গিজ করত ঝাঁকে ঝাঁকে নৌকা। নৌকার মাঝিরা এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতো। যেমন একজন আরেকজনকে বলতো তুমি আজকে নৌকা বাইতে যাবে না এটি তাদের ভাষায় বলা হত ‘বাইছানে নেই জায়গা না বেটা’ এটি খোট্টা ভাষা। আজকে যেখানে সি ইউ এফ এল তার অনতি দূরে এদের বসবাস ছিল। এখনো তাদের উত্তরসূরীরা রয়ে গেছে এবং তাদের জনসজ্ঞাও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অনেক আদিকালের চট্টগ্রাম এবং তারও পুরনো কর্ণফুলী নদী। এ নদীর তীরে আরব পর্তুগিজ সহ পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের কাজ কারবার চলত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে।

এখন সে অবস্থায় নেই কর্ণফুলী। চট্টগ্রামের মানুষের অতীত আত্মার সম্পদ এই কর্ণফুলী বৃহত্তর চট্টগ্রামেরও সম্পদ। লোকোমুখে চালু আছে কোন এক পাহাড়ি সুন্দরী মেয়ের কানের দুল স্নান করতে নেমে কর্ণফুলী নদীতে হারিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে নাম কর্ণফুলী। এই কর্ণফুলীর মোহনায় গড়ে উঠেছে বাতিঘর যে বাতিঘর গভীর সমুদ্র থেকে চট্টগ্রাম বন্দরকে নির্দেশ করে। এখন আগের সেই কর্ণফুলী নেই কর্ণফুলী। তার চিরচেনা রূপ হারিয়েছে অনেকটা ব্যবসায়িক হয়ে উঠেছে আর এর স্বচ্ছ জল এখন দেখা যায় না পলিথিন সহ নানা আবর্জনায় কর্ণফুলী দূষিত হচ্ছে এই দূষণ রোধে সরকার নানা পদক্ষেপ দিচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না কর্ণফুলীর তীর হয়ে যাচ্ছে বেদখল একের পর এক গড়ে উঠছে দোকানপাট, যে খাল কর্ণফুলীর প্রাণ সেই খাল গুলো মরে গেছে। কর্ণফুলীর দুপাশ ভাঙছে অবিরাম দাঁড়বাওয়া নৌকা বন্ধ হয়ে গেছে অনেকটা। চলছে ইঞ্জিন চালিত নৌযান যার কারণে এই পাড়ভাঙা নির্বিঘ্ন হচ্ছে। দিনে দিনে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এই কর্ণফুলী। এর খনন অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু কর্ণফুলী বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলেছে তাই সাগরের বিপুল স্রোত এখানে পলি বয়ে আনছে। প্রচণ্ড দূষণের কারণে কর্ণফুলীর সেই মৎস্য সম্পদ অনেকটাই কমে গেছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে হাজারো প্রজাতির মাছ। মৎস্য সম্পদ বেড়ে ওঠার যে পরিবেশ সেটি এখন আর কর্ণফুলীর নেই।

এই কর্ণফুলীকে ঘিরে ঘিরে কতনা মিথ চালু আছে তার শেষ নেই। কত গান রচিত হয়েছে চট্টগ্রামের আইলা জাইলা গোরপ্পোয়া বাউলদের কণ্ঠে। চট্টগ্রামের সংস্কৃতি বলতেই সাধারণ মানুষ বোঝে কর্ণফুলীর নৌকার মাঝির কণ্ঠে গীত গান কর্ণফুলীকে নিয়ে যে গীতগুলো গাওয়া হয়েছে সেটি চট্টগ্রামের মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা তাই এই কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅনন্তকাল
পরবর্তী নিবন্ধপ্লাস্টিক দূষণের রাহুগ্রাস