প্লাস্টিক দূষণের রাহুগ্রাস

গাজী মোহাম্মদ নুরউদ্দিন | বৃহস্পতিবার , ২০ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা, যা বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে একটি একক পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের একাধিক কারণ আমাদের সামনে দণ্ডায়মান। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে এটি যতটা না প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট, তার থেকেও বেশি মানবসৃষ্ট। মানবসৃষ্ট একাধিক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে প্লাস্টিক।

প্লাস্টিক হলো সিনথেটিক বা সেমিসিনথেটিক ও নিম্ন গলনাঙ্কবিশিষ্ট পদার্থ, যা তাপীয় অবস্থায় যেকোনো আকার ধারণ করতে পারে এবং পুনরায় কঠিনে রূপান্তরিত হতে পারে। প্লাস্টিক স্থায়ী, সহজলভ্য, সস্তা এবং সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় আমরা সবাই প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত দ্রব্য ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল এমনকি উন্নত দেশেও প্লাস্টিক একটি নিত্য ব্যবহার্য বস্তু। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য প্লাস্টিক চাহিদা ব্যাপক। দিনের পর দিন প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে।

প্লাস্টিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে আমরা উপলব্ধি করতে পারিনি প্লাস্টিক আমাদের এবং আমাদের পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যেসব প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যাদি ব্যবহার করি, সেগুলো তৈরি হয় তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে। প্লাস্টিকের গামলা, বালতি, চায়ের কাপ, স্ট্র, পানির বোতল, জগ, কোমল পানীয়র পাত্র ইত্যাদি আরও অনেক ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রতিবছর মাথাপিছু প্রায় পাঁচ কেজি প্লাস্টিক দ্রব্যাদি ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে ২০৩০ সালের মধ্যে এর পরিমাণ ৩৪ কেজিতে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। আকার ও ওজনে সুবিধাজনক হলেও প্লাস্টিকের বোতল স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বছরে প্লাস্টিক উৎপাদনে ব্যবহার হয় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমরা সবাই জানি যে গ্রিনহাউস প্রক্রিয়ার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যায়। গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কার্বন ডাইঅক্সাইড। এক আউন্স পরিমাণ প্লাস্টিক বা পলিথিন প্রস্তুত করলে পাঁচ আউন্স কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুতে নির্গত হয়। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিবছর প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়। এক কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় দুই থেকে তিন কেজি পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। সুতরাং একটি প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরি করতে প্রায় তার তিন গুণ কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুতে প্রবেশ করে, যা গ্রিনহাউস প্রক্রিয়ার গ্যাসগুলোর অনুপাতে প্রভাব বিস্তার করছে। এদিকে মানুষের রক্তে প্রথমবারের মতো প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানায় দ্য গার্ডিয়ান। নতুন এ গবেষণা সমপ্রতি ‘এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’ নামের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনায় অর্থায়ন করেছে ডাচ ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমন সিস। এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ, যা প্লাস্টিক দূষণ কমাতে কাজ করছে।

গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়েছে, এমন মানুষের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় যে বিষয়টি উদ্‌ঘাটিত হয়েছে, তাতে দেখা যায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্তের মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরে চলাচল করতে পারে। শরীরের কোনো অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমতে পারে।

রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়টি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা এখনো বিজ্ঞানীদের অজানা। তবে গবেষকেরা মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ, গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের কোষের ক্ষতি করে। এ ছাড়া দূষিত বায়ুতে থাকা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, যা ইতিমধ্যে সবার জানা। এ কণা বছরে লাখো মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী। এই প্রেক্ষাপটে, প্লাস্টিক উৎপাদন কমানো এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

পাট, বাঁশসহ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি বিকল্প পণ্য কেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর একটি উপায় নয়, এটি একটি নতুন অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত পাট, বাঁশ, পাটখড়ি বা শণভিত্তিক পণ্যগুলোকে যদি আধুনিক নকশা, প্রযুক্তি ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে এগুলো প্লাস্টিকের কার্যকর বিকল্পে পরিণত হতে পারে। এশিয়ার কোনো কোনো দেশে কলাগাছের আঁশ থেকে উৎকৃষ্ট মানের সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশসম্মত পণ্য প্রস্তুত করেছে। বাংলাদেশেও এর অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে গ্রামীণ কারিগর, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক; ডেপুটি রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধওরে কর্ণফুলীরে
পরবর্তী নিবন্ধদ্রোহের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য : জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি