‘বীর চট্টগ্রাম’ বাংলার শ্রেষ্ঠ স্থান। এই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আছে কত উপকরণ ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিক্ষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণমাধ্যম, প্রকাশনা, প্রকৃতি, সামাজিক অবস্থান। প্রত্যেকটি এখানে উর্বর মাটির মতো ফলপ্রসূ। ‘চট্টগ্রাম জাগলে বাংলা জাগবে’ এই প্রবাদবাক্য এখানে প্রসূতপ্রসূণ। চট্টগ্রামের নিজস্ব ভাষা আছে, আঞ্চলিক ভাষা, আঞ্চলিক গান আছে, যা দেশ নয়, বাইরেও অনেক সমাদৃত। চট্টগ্রাম সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বুনেদি। আরাকান রাজসভায় আরবি–ফারসি অনেক লেখক ও কবিদের আনাগোনা ছিল। তাছাড়া ভারতীয় এবং চট্টগ্রামের অনেক কবিদের আসর বসতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামও না এসে পারেননি। শুধু তাই নয়, রচনার ভাণ্ডারও সমৃদ্ধ করেছেন।
সাহিত্যচর্চা লালনের ক্ষেত্রে বসতো পাঠচক্র। আমিও সম্পৃক্ততায় দেখেছি সবুজ সাহিত্য আসর, ফিরিঙ্গী বাজার। অচিরা পাঠচক্র, সাহিত্যিক আবুল মোমেনের ফুলকি প্রাঙ্গণে। কালধারা প্রকাশন থেকে হতো দুটো সাহিত্য আসর বছরে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে, মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপুর উদ্যোগে। চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাবে বিশিষ্ট রম্য লেখিকা বেগম ফাহমিদা আমিনের উদ্যোগে প্রতি মাসে বসতো নারীলেখকদের সাহিত্য আসর, সেই আসর আজও অব্যাহত। তারপর শৈলী প্রকাশন। যেখানে প্রতি মঙ্গলবার বসতো, নাম ছিল শৈলী মঙ্গল আড্ডা। যেখানে সাহিত্যিকদের সাহিত্যচর্চার আড্ডা। অর্থাৎ লেখালেখি নিয়ে বিচার–বিশ্লেষণ। এখন বসে প্রতিদিন।
সঞ্জিত বনিকের অবসর থেকে বছরে একটা সাহিত্য–সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান হতো। শৈলী চেরাগী পাহাড় সংলগ্ন লুসাই ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছোট্ট একটি ঘর হলেও সাহিত্যিকদের আড্ডা ঘর উপচিয়ে বাইরেও এসে যেত। তারপর তৃতীয় তলায় আর একটি ঘর নিয়ে সামান্য একটু বড়, সেখানে হলঘর সাজিয়ে শুরু হলো লেখকদের নিয়ে অনুষ্ঠানমালা। কবিতা পাঠের আসর, ছড়া পাঠের আসর, কিশোর কবিতার আসর, বর্ষার বইমেলা, বর্ষার কবিতা পাঠের আসর, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। শরৎকালীন বইমেলা, সাহিত্য ও গানের আসর। জাতীয় উৎসবগুলো নিয়ে বইমেলা, সাহিত্য আসর। বড় করে বইমেলা, স্বাধীনতার বইমেলা শুরু হয় সেই ছোট্ট ঘর থেকে। আমার বই ‘সমাজ ও দৃষ্টি’ প্রকাশিত হয় ঐ তৃতীয় তলায়।
নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যিকদের নিয়ে সংগঠিত রূপ উদ্যোগ ২০০১ সালে স্বপ্ন পরিণত হলো চট্টগ্রামের বুকে এক বটবৃক্ষের ছায়ার মতো বিকশিত হয়ে। প্রকাশিত হলো, জন্ম হলো ‘চট্টগ্রাম একাডেমি’। স্বপ্নের কর্ণধার ছিলেন কবি–শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ। ক্ষুদ্র থেকে পরিণত বয়সে পঁচিশ বছর পূর্তি উৎসব হয়ে গেল ৬, ৭, ৮ আগস্ট ২০২৬। হয়ে গেল তার নিজস্ব ঘর, হয়ে গেল সাংগঠনিক রূপ, বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেল পরিচিতি। সাহিত্যের সকল শাখার চর্চা, কর্মশালা, সাহিত্য ও ছড়া–কবিতা পাঠের আসর, সেমিনার, স্বাধীনতার বইমেলা। কোভিডকালেও অনুষ্ঠান বন্ধ হয়নি। অনলাইন বইমেলা সারা দেশ, বিশ্বের লেখকদের কাছে সাড়া পড়েছে, অনেকে যুক্ত হয়েছেন। তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত আজও অনবদ্য।
তারপর ২০০২ সালে ঐতিহ্যের চট্টগ্রামকে আবার সমৃদ্ধ করলো রাশেদ রউফ আর এক স্বপ্ন বুনে। লেখকদের নিয়ে জন্ম হলো বিজয়লক্ষ্মী ‘বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি’। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো এক জাদুকরী রূপ আছে এখানে। এখানেও লেখক, পাঠক, সংগঠক তৈরি হয়ে গেল। আসলে মানুষের মনুষ্যত্ব হচ্ছে সৃষ্টির মাঝে। এমন একটি পাটাতন পেয়ে চট্টগ্রামের লিখতে ইচ্ছে জায়গা খুঁজে পায় না। এভাবে অনেকে লিখতে শুরু করেছেন। বলা হয়, চট্টগ্রাম একাডেমি, বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি লেখক তৈরির কারখানা।
সেই থেকে আজ অবধি শিশুসাহিত্য একাডেমি শিশুসাহিত্য উৎসব, শিশুদের আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত প্রতিযোগিতা, শিশু বইমেলা, সেমিনার, ছড়া–কিশোর কবিতা পাঠের আসর, কর্মশালা ইত্যাদি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশের ও বহির্বিশ্বের লেখকদের সম্পৃক্ত করে চলেছে। আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শিশুসাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে। আরও সংযোজিত হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষ বি.এড. (সম্মান) আবশ্যিক বাংলায় শিশুসাহিত্যকে অন্তর্ভুক্ত করে পাঠ্যসূচির মধ্যে রাখা হয়েছে। দেশের ও চট্টগ্রামের বরেণ্য শিশু সাহিত্যিক সুকুমার বড়ুয়া, সুজন বড়ুয়া, রাশেদ রউফ ও তপন বাগচী।
২০২৫ সালে কবি ও শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফের সফল সৃষ্টির চিন্তাধারায় চট্টগ্রামের বুকে জন্ম নিলো আর এক সংগঠন ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লেখক পরিষদ’। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্র লেখকদের একটা বিশাল বিচরণভূমি এই সংগঠন। এখানেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লেখকদের নিয়ে সেমিনার, লেখকদের সাহিত্যের নানা দিক, সৃষ্টি নিয়ে আসর। এই মহান উদ্যোগগুলিতে চট্টগ্রাম গর্বের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রামের কিছু আর বাকি নেই। শৈলী থেকে বের হয়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস–ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ। চট্টগ্রামের প্রথম পত্রিকা দৈনিক আজাদী যেমন লেখক–পাঠক সৃষ্টির ভূমিকায় অনবদ্য। এই কাগজে কত শব্দ বুনে বুনে সোনার ফসলে ভাণ্ডার পূর্ণ করেছে বইয়ের ভেতর। সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্য রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু লেখা মূল্যায়ন ও প্রকাশের মধ্য দিয়ে উদ্দীপনার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। চেষ্টায় লেখক পরিণত হয়। নানা পাতার সম্ভারে সজ্জিত হয়ে আজাদী লেখকদের সৃষ্টিকে করেছে ধন্য।
বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র, চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ টেলিভিশন কেন্দ্র, চট্টগ্রামের ভূমিকা ও অনস্বীকার্য। সুরকার, গীতিকার, শিল্পী, সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকে সেখানে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা উজ্জীবিত, প্রাণবন্ত, প্রাণিত করে রাখে।
সাহিত্যের বিকাশের এই সকল ধারার শুরু থেকে কাছে বসে হৃদয় উদ্ভাসিত, মুখরিত, উচ্ছ্বাস, আনন্দে বন্দিত ছিলাম। সুখে–দুঃখে মিশে আজ মহীরুহে। চট্টগ্রাম সাগর, নদী, পাহাড়, ঝরনাধারার মিলনক্ষেত্র। সাহিত্যের রসও এখানে প্রাচুর্য। শুধু তাই নয়, শুদ্ধ সঙ্গীতের ধারাও এখানে শ্রেষ্ঠত্বে অনির্বাণ। পুঁথি সাহিত্যের ধারা, ধারক, গবেষণায় চট্টগ্রাম শুধু নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসায় গ্রন্থিত, গৃহীত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। একুশের প্রথম কবিতা মাহবুবুল আলম চৌধুরীর প্রকাশ এই আজাদী থেকে বিশ্ব ইতিহাসে বাঙালি কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ। আমরা যতদিন আছি, আরও রঞ্জিত হই, মুখরিত হই, প্রশংসিত হই এই কামনা। লেখক; প্রাবন্ধিক, সংগীতশিল্পী।











