বিশ্ব ওয়ান হেলথ (এক স্বাস্থ্য) দিবস প্রতিবছর ৩ নভেম্বর পালিত হয়। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই বৈশ্বিক উদ্যোগের ১১তম বর্ষে ২০২৬ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ওয়ান হেলথ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হচ্ছে। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এই উপলব্ধিকে সামনে রেখে দিবসটি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংক্রামক রোগের বিস্তার, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো জটিল স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরাই এ বছরের ‘এক স্বাস্থ্য’ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
‘এক স্বাস্থ্য’–এর সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে ২০০৪ সালের ম্যানহাটন, যুক্তরাষ্ট্র নীতিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে প্রণীত এই ১২টি নীতিগত সুপারিশ মানুষ, গৃহপালিত প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে। পাশাপাশি, রোগ প্রতিরোধ, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ, বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, সময়োপযোগী তথ্য বিনিময় এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে। পরবর্তী সময়ে ওয়ান হেলথের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে; বর্তমানে এতে উদ্ভিদস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত। এই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশকে একটি আন্তঃসম্পর্কিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বাংলাদেশেও ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার বিকাশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৮ সালে ‘ওয়ান হেলথ বাংলাদেশ’ গঠনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন খাতের পেশাজীবীদের মধ্যে সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে জাতীয় কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং ওয়ান হেলথ সেক্রেটারিয়েট গঠনের মাধ্যমে এ উদ্যোগ আরও সুসংহত হয়। বিশেষায়িত একাডেমিক শিক্ষা ও মাঠপর্যায়ের এপিডেমিওলজি প্রশিক্ষণ, যৌথ প্রাদুর্ভাব তদন্ত এবং সমন্বিত গবেষণা উদ্যোগও বাংলাদেশে ওয়ান হেলথের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বালঝাক, ওয়ান হেলথ পোলট্রি হাব এবং ফ্লেমিং ফান্ডের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কর্মসূচি। পাশাপাশি, জাতীয় সম্মেলন ও বিশ্ব ওয়ান হেলথ দিবসের বার্ষিক উদ্যাপন সচেতনতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করতে সহায়তা করছে।
তরুণসমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ওয়ান হেলথ ইয়াং ভয়েস বাংলাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ভেটেরিনারি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বাংলাদেশ) এবং ন্যাশনাল ডিবেট ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রামের মতো সংগঠন বিভিন্ন সচেতনতামূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকাদান, বিদ্যালয়ভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণেরা স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের চর্চাকে উৎসাহিত করছেন।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলকে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব কার্যক্রমে কাজে লাগানো ‘এক স্বাস্থ্য’ বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগিতায় বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এসব আলোচনায় এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহার ও রেজিস্ট্যান্স, পোলট্রির রোগ নজরদারিতে সরকারি–বেসরকারি সহযোগিতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে ‘এক স্বাস্থ্য’ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এ ধরনের আলোচনা গবেষক, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। এর মাধ্যমে গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগানোর পথ সুগম হয়।
আগামীর স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্ব, বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং ‘এক স্বাস্থ্য’ শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া, তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তবসম্মত উদ্যোগে রূপান্তর করা জরুরি। কারণ, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কার্যকরভাবে মোকাবিলায় কোনো একটি খাতের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিভিন্ন খাতের সম্মিলিত পরিকল্পনা, সমন্বিত কার্যক্রম ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ।
পরিশেষে, ‘এক স্বাস্থ্য’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের সুস্থতা পরস্পরের পরিপূরক। তাই একটি সুস্থ, নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে প্রয়োজন সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কার্যকর উদ্যোগ। বিশ্ব ওয়ান হেলথ দিবসের চেতনা হোক গবেষণাগার থেকে নীতিনির্ধারণে, নীতিনির্ধারণ থেকে মাঠপর্যায়ে এবং ব্যক্তিগত সচেতনতা থেকে সামাজিক উদ্যোগে– সব স্তরে সমন্বিত প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা।
লেখক : পরিচালক, ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)।












