শামসুর রাহমানের “দুঃখ” কবিতাটি আমাকে টানে। কবিতাটি পড়লেই দুঃখকে অভূতপূর্ব শব্দরঙে চিত্রায়িত করার এক অপূর্ব মুন্সীয়না চোখে ধরা দেয়। তার মাধুর্যে মুগ্ধ হই–হয়ে উঠি দুঃখসত্যের দ্রষ্টা কবির বুদ্ধহৃদয়ের সাক্ষী। শব্দবোধিবৃক্ষতলে কবি দুঃখকে মূর্ত করেন সর্বজনীনতা ও সর্বগম্যতার অনবদ্য এক প্রতীক হিসেবে। কবি বলেন:
“কখনো না–দেখা নীল দূর আকাশের
মিহি বাতাসের
সুন্দর পাখির মতো আমার আশায়
হৃদয়ের নিভৃত ভাষায়
দুঃখ তার লেখে নাম।”
দুঃখ সত্য, চরমভাবে সত্য। পরিবর্তনশীল জগতে মানুষ কোনওভাবেই তা এড়াতে পারে না। বুদ্ধ বলেন, জন্ম দুঃখ, জরা দুঃখ, ব্যাধি দুঃখ, প্রিয় বিয়োগ দুঃখ, অপ্রিয় সংযোগ দুঃখ, মোটের ওপর আসক্তিই দুঃখ। তারপরও ব্যক্তিভেদে তার তারতম্যও বিদ্যমান। কারও জীবন সামান্য দুঃখে তছনছ হয়ে যেতে পারে, আর কারও জীবন দুঃখের স্তূপ অতিক্রম করে সৃষ্টির অপার আনন্দে সমর্পিত হতে পারে। দুঃখের অনলে পুড়ে পুড়ে কেউ কেউ হয়ে উঠতে পারে খাঁটি সোনা।
জীবনের অনিবার্য ক্রিয়াশীল অংশ হিসেবে দুঃখ একজন সংবেদনশীল মানুষের সৌন্দর্যের প্রতিকৃতিটি নিঃশব্দে এঁকে যায়, আর একই সাথে হয়ে ওঠে তাঁর রূপান্তরের চালিকাশক্তি। মানুষটিকে দেয় আত্মানুসন্ধানের ইঙ্গিত। ইউক্রেনিয়ান চিত্রশিল্পী পোলিনা রাইকো তেমনই এক রূপান্তরিত মানুষ, দুঃখ বযাকে করে তুলেছে সাধারণ থেকে অসাধারণ, সংসারী থেকে বৈরাগী, দ্রষ্টা থেকে স্রষ্টা, বন্দি থেকে মুক্ত। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো চিত্রশিল্পী হিসেবে পোলিনার যাত্রা শুরু হয় ৬৯ বছর বয়সে। ছবি আঁকার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ছিল না। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন।
দারিদ্র্য, দুঃখ ও বঞ্চনার কঠিন সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছিল। তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল হলোদোমোরের দুর্ভিক্ষ। পার করতে হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়বহ দুঃসময়। বিশ্বযুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিল তাঁর জন্মদাতা পিতাকে। বছরের পর বছর হাড়ভাঙা শারীরিক পরিশ্রম করে গেছেন। দাম্পত্যজীবনে মেলেনি শান্তির একটু ছোঁয়া। একে একে হারিয়েছেন স্বামী ও সন্তানদের। শেষ জীবনে হয়ে পড়েছেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। আর নিঃসঙ্গ জীবন থেকেই পোলিনা আশ্রয় নিয়েছিলেন চিত্রকলার, হাতে তুলে নিয়েছিলেন রঙ–তুলি। নিজের বাড়ির দেওয়াল ও ছাদ হয়ে উঠেছিল তাঁর ক্যানভাস।

সাধারণ আট দশজনের মতো ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মে দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলের ছোট্ট শহর ওলেশকিতে তাঁর জন্ম। তাঁর আসল নাম ছিল পেলাহেইয়া আন্দ্রিইভনা। সবাই তাকে পোলিনা নামে ডাকত, আর তিনিও এই নামটিতেই নিজেকে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বাবা নিহত হলে তাঁর মা চার সন্তানকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন। শৈশব থেকেই শুরু হয় তাঁর কঠোর পরিশ্রমের জীবন। যুদ্ধের সময় কিশোরী পোলিনা সামরিক নার্স হিসেবে কাজ করেন। একসময় বন্দি হয়েও পড়েন। তাঁকে পাঠানো হয় জার্মানির এক শ্রমশিবিরে। এতকিছুর পরও সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে ফেরেন নিজ দেশে।
২২ বছর বয়সে নিকোলাই আলেক্সেইয়েভিচ রাইকোর সাথে পোলিনা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। একে একে জন্ম নেয় তাঁদের দুই সন্তান। মেয়ে এলেনা এবং ছেলে সেরহি। বলতে গেলে সারা জীবনই তাঁকে সোভিয়েত যৌথ খামারে কাজ করতে হয়েছে। সংসার সামলেছেন, সন্তানদের দেখাশোনা করেছেন, আর বেঁচে থাকার জন্য বিক্রি করেছেন নিজের বাগানের উৎপাদিত ফলমূল ও সবজি । মদ্যপ স্বামীর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়েও পরিবারের সবাইকে আগলে রাখতেন পোলিনা, আর নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন সবসময়। স্বামীর মতো তাঁর ছেলেও ছিল অতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্ত। সে তাদের পারিবারিক বাড়িটি প্রায় ধ্বংস করে ফেলে। বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস বিক্রি করে দেয়। এ ঘটনার পর তার তিন বছরের কারাদণ্ড হয়। একসময় কারাগার থেকে ছেলেটি মুক্তি পেলেও নিজের মাকে ছুরিকাঘাতে আহত করার মতো জঘন্য কাজ করতেও তার দ্বিধা হয়নি।
১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পোলিনার কন্যা এলেনা মারা যায়। এর এক বছর পর ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান তাঁর স্বামী । ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ছেলে সেরহিকে একটি সংশোধনমূলক কারাগারে পাঠানো হয়। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে লিভার সিরোসিসে তার মৃত্যু হয়। পোলিনার মেয়ের দুই সন্তান ছিল, কিন্তু তার মৃত্যুর পর মেয়েজামাই পোলিনার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ফলে তিনি নাতি–নাতনিদের সান্নিধ্যও হারান ।যে নারী সারাটা জীবন পরিবারের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন নিজের শূন্য বাড়িতে।
একদিন তাঁর বাড়ির কাজে ব্যবহারের পর কিছু রং বেঁচে গিয়েছিল। আর সেই রং দিয়ে বেড়ার এক কোণে তিনি লিখলেন: “স্বর্গে যাওয়ার পথ কীভাবে খুঁজে পাব?” শোক আর নিঃসঙ্গতায় বিধ্বস্ত হৃদয় তাঁর সৌন্দর্য ও শান্তির জন্য ছিল আকুল। সে আকুলতায় ৬৯ বছর বয়সে সেদিন তিনি হাতে তুলে নিলেন রং–তুলি। আঁকলেন একটি কবুতর। কবুতরটি এত সুন্দর মনে হলো যে, তিনি আরেকটি না এঁকে পারলেন না। তারপর শুরু হলো তাঁর বিরামহীন সৃষ্টিকর্ম। নিজের আঁকার ক্ষমতায় বিস্মিত পোলিনার মনে হলো, এ নিশ্চয়ই ঈশ্বরের তরফ থেকে আসা কোনও উপহার।
১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন:
“বাগানে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। একটা কবুতর আঁকলাম। বিশ্রাম নিলাম। তারপর আরেকটা কবুতর। তারপর ফুল। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার হৃদয় আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। ভাবছিলাম, আমি এতসব আঁকলাম কী করে? না, এ আমি নই, আমি তো এমন আঁকতে পারি না! কিন্তু এ তো আমারই আঁকা! নিজেকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার আত্মা আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।”
একটি কবুতর থেকে আরেকটি কবুতর। এভাবে ধীরে ধীরে পোলিনা রাইকো তাঁর পুরো বাড়িটাই নান্দনিক সব বর্ণিল ছবিতে ঢেকে ফেললেন। বাড়িটি ছিল নদীর ধারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি কাটাতেন সেখানে। বসে বসে পাখিদের দেখতেন, বলতেন কথা। তারপর বাড়ি ফিরে স্মৃতি আর কল্পনা মিশেলে আঁকতেন সেই পাখিদের। (চলবে)











