(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তাঁর বাড়িতে কোনও টেলিভিশন ছিল না। ছোট্ট শহর আর চারপাশের প্রকৃতির বাইরে বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে খুব সামান্য যোগাযোগ ছিল তাঁর। পশুপাখি, গাছপালা, পরিবার–পরিজনের মুখ এবং নিজের জীবনের নানান গল্পের দৃশ্যই হয়ে উঠেছিল তাঁর আত্মার জানালা। সামান্য পেনশনের টাকাই ছিল তাঁর জীবন নির্বাহের একমাত্র সম্বল। সেই সামান্য অর্থের প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে যেত রং কিনতে। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সবচেয়ে সস্তা এনামেল রং ব্যবহার করতেন তিনি। একদিকে সেই রঙের গন্ধ ছিল যেমন তীব্র, এর বিপরীতে বৈচিত্র্যও ছিল খুব সীমিত। কিন্তু তাতে তাঁর সৃষ্টিশীলতা থেমে যায়নি। তিনি এঁকে গেছেন নিরবধি।
পাড়া–প্রতিবেশী কী বলবে, তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করবে কি না, এই ভয়ে অনেক সময় পোলিনা রাতে ছবি আঁকতেন। সিলিংয়ে ছবি আঁকার জন্য একটি টেবিলের ওপর আরেকটি টেবিল বসিয়ে তার ওপরে উঠে দাঁড়াতেন। তারপর সেই বিপজ্জনক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে ইউক্রেনীয় লোকগান গাইতে গাইতে এঁকে যেতেন নিজের জাদুময় জগতের দৃশ্যপট। গান গাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে তিনি বলেছিলেন: “যাতে আমাকে কাঁদতে না হয়, তাই আমি গান গাইতাম।”
ছয়টি ঘরের প্রতিটি দেয়াল ও ছাদ, দরজা, রান্নাঘর, সবকিছুই তিনি আবৃত করেছিলেন তাঁর হৃদয়নিঃসৃত সব চিত্রকর্ম দিয়ে। ছবিগুলোর মাঝখানে কোনও ফাঁকা জায়গা না থাকায় পুরো বাড়িটিই হয়ে উঠেছিল এক বিশাল শিল্পকর্ম। চারদিকে তাকালে মনে হতো ছবিগুলো যেন আপনাকে ঘিরে ঘুরছে, টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাদের জাদুর জগতে। সেই জগৎই ছিল মূলত পোলিনা রাইকোর নিজেরই এক অন্তর্জগৎ। কেউ কেউ তাঁকে পাগল ভাবলেও আবার কেউ কেউ তাঁর ছবির মধ্যে দেখতে পেয়েছিল এক বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর।
১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে স্থানীয় সাংবাদিকেরা তাঁকে নিয়ে একটি পর্ব ধারণ করেন। যে কারাগারে তাঁর ছেলে বন্দি ছিল, সেখানেও অনুষ্ঠানটি দেখানো হয়। এরপর বন্দি ছেলে মাকে চিঠি লিখে জানায় যে, সে অন্য কয়েদিদের সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানটি দেখেছে এবং সবাই তাঁর ছবি খুব পছন্দ করেছে। এতে পোলিনা আরও উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, তাঁর ছেলে যখন কারাগার থেকে ফিরে আসবে, তখন এই শান্তিময়, রঙিন ছবিগুলো হয়ত তার মনের ক্ষত সারিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
দেয়ালচিত্রে পোলিনা নিজের বোনদের এঁকেছিলেন। তাঁদের পিঠে ডানা, হাতে সুন্দর ফুলের তোড়া। তারা বসে আছে আধাখানা বাঁকা চাঁদের ওপর। সেখানে তিনি নিজেকেও এঁকেছিলেন। সেই দৃশ্যপটে তাঁর ওপরে দুজন দেবদূত–তাঁর দুই সন্তানের প্রতীক। একটি রকেট ধরে তারা আকাশে উড়ে যাচ্ছে।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন, প্রকৃতি, বিভিন্ন প্রচারপত্র, পোস্টকার্ড এমনকী পণ্যের মোড়কের ছবিও তাঁকে অনুপ্রেরণা দিত। খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের সঙ্গে লোকজ বিশ্বাসকে মিলিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন নিজস্ব এক জগৎ। সেখানে দেবদূত আর সাধুদের পাশেই বাস করত জলপরী আর কল্পলোকের অদ্ভুত সব প্রাণী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিও জায়গা করে নিয়েছিল পরিবারের সদস্যদের প্রতিকৃতির পাশে। এ সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য ছিল: “আমি গান গাই, ছবি আঁকি, আর সমস্ত যন্ত্রণা মিলিয়ে যায়।”
পোলিনা নিজের বিয়ের প্রতিকৃতিও এঁকেছিলেন। এঁকেছিলেন তাঁর স্বামীকেও। পরকালের জন্য স্বামীকে তিনি ছবিতে দিয়েছিলেন একটি নৌকা, একটি বাদ্যযন্ত্র আর অনেক মদের বোতল, অর্থাৎ তাঁর ধারণা–অনুযায়ী সেখানে তাঁর স্বামীর যা যা প্রয়োজন হতে পারে, সেসব কিছুর জোগান। সামরিক নার্স হিসেবে মাথার ওপরে একটি রাইফেল তুলে ধরে আছেন এমন একটি আত্মপ্রতিকৃতিও এঁকেছিলেন তিনি। স্বপ্নে দেখা এক নারী সেনাপতির ছবি এঁকেছিলেন, যে ছবিটি তাঁর কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছিল। এক ছবিতে দেখা যায় একটি গির্জা এবং এক দেবদূতকে, যে দুটি শিশুকে রক্ষা করছে। সেই ছেলে ও মেয়েশিশু দুটি মূলত পোলিনার নিজের সন্তান। তিনি তাঁর বিড়ালদেরও এঁকেছিলেন। চুলার ওপরে এঁকেছিলেন একটি দাঁড়কাক, যার মুখে একটি কবুতরের ছানা। এই দৃশ্যটি তিনি নিয়েছিলেন ইউক্রেনের একটি লোকগানের মোটিফ থেকে। গানটিতে একটি দাঁড়কাক পাহাড়ের চূড়ায় বাসাবাঁধা কবুতরদের কাছ থেকে তাদের ছানাকে চুরি করে নিয়ে যায়। পোলিনার কাছে ছবিটি হয়ে উঠেছিল তাঁর মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতীক।
এক শীতের দিনে পোলিনার সাথে রাস্তায় তাঁর এক প্রতিবেশীর দেখা হয়। মুদি দোকান থেকে ফেরার পথে হাঁটতে হাঁটতে আইসক্রিম খাচ্ছিলেন। শীতের দিনে আইসক্রিম খাওয়ার দৃশ্যটি অস্বাভাবিক হওয়ায় প্রতিবেশী মজা করেছিলেন। পোলিনা হেসে বলেছিলেন, কী এক কারণে যেন সেদিন ঘুম থেকে উঠেই তাঁর আইসক্রিম খেতে খুব ইচ্ছে করছিল। তারপর হাসতে হাসতে তিনি বাড়ি ফিরে যান। সেটিই ছিল জীবিত অবস্থায় তাকে শেষবারের মতো দেখা। পরের রাতে ঘুমাতে গিয়ে তিনি আর জেগে ওঠেননি। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি ৭৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর পর স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন, সামান্যটুকু জায়গাও নেই যেখানে ছবি আঁকা হয়নি। হলঘরে পড়ে ছিল একটি পুরোনো ভাঙা আয়না। বাড়িতে আর কোনও ফাঁকা জায়গা না পেয়ে পোলিনা তাঁর জীবনের শেষ ছবিটি এঁকেছিলেন সেই আয়নার পেছনে, আর সেটি ছিল তাঁর নিজের প্রতিকৃতি।
তাঁর মৃত্যুর পর নাতি–নাতনিরা যত দ্রুত সম্ভব বাড়িটি থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। তারা মনে করত পোলিনা পাগল ছিলেন। সুতরাং তাঁর কোনও কিছুর সঙ্গেই নিজেদের সম্পর্ক রাখা উচিত না। ফলে তারা তাঁর জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়। যেগুলো বিক্রি করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো উঠানে পুড়িয়ে ফেলে। পাশের বাড়ির এক প্রতিবেশী পোলিনার বাড়িটি কিনতে চেয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল বাড়িটি ভেঙে সেখানে একটি গ্যারেজ নির্মাণ করা। শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রচেষ্টাতেই শেষ পর্যন্ত বাড়িটি রক্ষা পায়। পরে সেটিকে ইউক্রেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বহু বছর ধরে ইউক্রেনের সরকারি কর্মকর্তা ও সংস্কৃতিকর্মীরা ভাবছিলেন, কীভাবে বাড়িটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে রুশ বাহিনী ওলেশকি দখল করে নেয়। ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংস হওয়ার পর ভয়াবহ বন্যায় খেরসন অঞ্চলের শহর, গ্রাম ও প্রাণ–প্রকৃতিতে বিপুল বিপর্যয় নেমে আসে। তার ফলে পোলিনা রাইকোর বাড়িটিও ছাদ পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায় এবং অধিকাংশ দেয়ালচিত্রই ধ্বংস হয়ে যায়।
পোলিনা রাইকোর বাড়ি ও তাঁর আঁকা দেওয়ালচিত্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও তাঁর গুরুত্ব আজও হারিয়ে যায়নি। আজও তাঁর শিল্প মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর চিত্রকর্মের প্রতিলিপি ইউক্রেন ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে দেখানো হয়। আর যে কবুতরটি এঁকে তাঁর শিল্পযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই কবুতরের ছবিই একসময় রুশ–অধিকৃত খেরসন অঞ্চলে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ ইউক্রেনের এক ছোট্ট শহরে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটি। যার চারদিকে ছিল গাছপালা আর সুন্দর বাগান। রোদে আঙুর পাকত, আর বাড়ির প্রবেশপথের পাশে ফুটত ফুল। বাইরে থেকে দেখলে যদিও মনে হতো সেটি একটি সাধারণ বাড়ি। কিন্তু বাস্তবে তাঁর ভেতরে ছিল এক জাদুময় জগৎ। অনিন্দ্যসুন্দর এক স্বর্গ। জীবনে যে স্বর্গের সন্ধান পোলিনা রাইকো পাননি, শেষ পর্যন্ত সেই স্বর্গই তিনি নিজহাতে সৃষ্টি করেছিলেন।
ইউক্রেনীয় শিল্পী, লেখক ও অনুবাদক দারিয়া জোরকার ‘দ্য ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ল্ড অব পোলিনা রাইকো’ অবলম্বনে রচিত













