আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মদিনা শাসন করেছেন ১০ বছর। মদিনায় তখন ৪টি ধর্মের সহাবস্থান ছিল। মুসলিম, ইহুদী, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক। মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে বিশ্বনবী সমস্ত ধর্মের মানুষদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর ওফাতের পর শুরু হয় খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ। ইসলামের চার খলিফা তাদের সময়কার যে শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন তাকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই খেলাফতের ধারা আর রক্ষা হয়নি। তার অন্যতম কারণ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য ও বিভাজন। চার খলিফা মোট ৩০ বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ শাসন করেছেন আল্লাহর কোরান ও রাসূল (সাঃ) এর হাদিস অনুযায়ী। ইসলামী রাষ্ট্রের অবকাঠামো দৃঢ়ভাবে রোপিত হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদার শাসনামলে। ধীরে ধীরে মুসলিম জাতি আল্লাহর কোরআন ও রাসূল (সাঃ) এর হাদিস থেকে দূরে সরতে থাকে। ফলশ্রুতিতে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের স্বপ্ন যেন স্বপ্নই থেকে গেল– তা বাস্তবায়নে আর মুখ দেখল না। অবশ্যই আল্লাহতায়ালা এর কারণগুলো ১৪০০ বছর আগে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের মাধ্যমে মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন। যেমন: তিনি কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন, ‘হে মানুষ তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমরা ঈমানদারদেরকে বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর না’– সূরা আন নিসা, আয়াত–১৪৪। আল্লাহতায়ালা এখানে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে, তাদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা রাখতে, তাদের সাথে সবর্দা উঠাবসা করতে, তাদের সাথে শলাপরামর্শ করতে, মুসলিমদের গুপ্ত কথা তাদের নিকট প্রকাশ করতে এবং তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখতে নিষেধ করেছেন। সূরা মায়েদার ৫১ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা ইহুদী–খ্রিস্টানদের নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর না। এরা নিজেরা একে অপরের বন্ধু: তোমাদের মধ্যে কেউ যদি এদের কাউকে বন্ধু বানিয়ে নেয় তাহলে সে অবশ্যই তাদের দলভুক্ত হয়ে যাবে। আর আল্লাহতায়ালা কখনো জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না’। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আবি হাতিম (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, একবার হযরত ওমর (রাঃ) আবু মুসা আল আশআরী (রাঃ) কে তাঁর প্রাপ্ত আয় ও ব্যয় হিসাব পাঠাতে আদেশ করেন। আবু মুসা (রাঃ) তাঁর একজন খ্রিস্টান অনুলেখক ছিল যাকে উমর (রাঃ) এর কাছে পাঠিয়ে দেন। হযরত উমর (রাঃ) যেভাবে চেয়েছিলেন ঐভাবে খ্রিস্টান লোকটি তাঁর কাজ করে দেওয়ায় তিনি খুবই খুশি হন এবং তার কাজের প্রশংসা করে বলেন, এই লোকটি খুবই দক্ষ। হযরত উমর (রাঃ) এর কাছে সিরিয়া থেকে আসা একটি চিঠির ব্যাপারে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি এই চিঠিটি মসজিদে বসে আমাদের সকলকে পাঠ করে শুনাবে? হযরত আবু মুসা আল আশআরী (রাঃ) বললেন, তার পক্ষে তা সম্ভব নয়। হযরত উমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, কেন, সে কি পবিত্র নয়? হযরত আবু মুসা (রাঃ) বললেন: না তা নয়, সে খ্রিস্টান। অতঃপর আবু মুসা (রাঃ) বললেন, এতে হযরত উমর (রাঃ) আমার উপর রেগে গেলেন এবং আমার পাঁজরে খোঁচা দিয়ে বললেন, এক্ষুনি তাকে পবিত্র মদিনা থেকে বের করে দাও। তিনি বললেন, তুমি কি সূরা মায়েদার এই আয়াতটি (‘হে ঈমানদার লোকেরা তোমরা ইহুদী, খ্রিস্টানদের নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর না’) পাঠ করনি? অতএব বুঝা যায়, ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সাথে সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করার পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আজ বিশ্বের অধিকাংশ আরব শাসকরা বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সাথে। ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে একটি রাষ্ট্রেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী খেলাফত কায়েম নেই। হাতে গোনা দু’একটি রাষ্ট্রে কোরআনের কয়েকটি বিধান চালু রয়েছে মাত্র। আরব শাসকদের মুনাফেকির কারণে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মাঝে বিভাজন ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠেছে। আর তা নিরসনে কোন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ আমেরিকা ও ইসরায়েলের পদলেহনে ব্যস্ত। সম্প্রতি ইরান–আমেরিকা–ইসরায়েল যুদ্ধ তার স্পষ্ট প্রমাণ। আকিদাগত কারণে ইরানকে অনেকে পছন্দ নাও করতে পারে। কিন্তু সহীহ আকিদার ধ্বজাধারী মুসলিম আরব রাষ্ট্রগুলো সার্বক্ষণিক ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সাথে বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তি, পারস্পরিক তোষামোদে ব্যস্ত। তাদের এই দ্বিচারিতা ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি আনুগত্য না থাকার কারণে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যেমন: আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্য কর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া বিবাদ কর না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তি খতম হয়ে যাবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ কর: অবশ্যই আল্লাহতায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন’–সূরা– আনফাল–৪৬। মূলত এই আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা শত্রুদের মোকাবেলার সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকা ও ধৈর্যধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মুমিনরা যেন দৃঢ়তা প্রদর্শন করে এবং ভয় না পায়। আল্লাহর উপর যেন তারা ভরসা করে এবং তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্য পরিত্যাগ না করে। পরস্পর যেন ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হয় এবং মতানৈক্য সৃষ্টি না করে। নতুবা তারা লাঞ্চিত হবে, তাদেরকে কাপুরুষতায় ঘিরে ফেলবে এবং তারা শক্তিহীন হয়ে পড়বে। এরপরে তাদের অগ্রযাত্রায় বাধা পড়বে। সাহাবীগণের এই বীরত্ব, রাসূল (সাঃ) এর প্রতি আনুগত্য এবং ধৈর্য ও সহ্যই ছিল আল্লাহতায়ালার সাহায্য লাভের অন্যতম কারণ। আর এর ফলেই অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে সংখ্যার স্বল্পতা এবং যুদ্ধাস্ত্রের নগণ্যতা সত্বেও মুসলিমরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশগুলো জয় করেছিলেন। এভাবে তারা আল্লাহর কালেমাকে সমুচ্চ করেন, সত্য দ্বীনকে ছড়িয়ে দেন এবং ইসলামী হুকুমাত বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে দেন। দেখে বিষ্মিত হতে হয় যে, তারা ৩০ বছরের মধ্যে দুনিয়ার মানচিত্র পরিবর্তন করে দেন এবং ইতিহাসের পৃষ্ঠা পরিবর্তন করেন। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীদের দ্বীন কায়েমের প্রতি অদম্য আগ্রহের কারণে তাঁরা অতীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহতায়ালা তাঁর কালামে পাকের সূরা মরিয়মের ৫৯ নং আয়াতে বলেন, ‘তাদের পর (তাদের অপদার্থ) বংশধররা এল, তারা নামাজ বরবাদ করে দিল এবং পাশবিক লালসার অনুসরণ করল, অচিরেই তারা এই গোমরাহীর সম্মুখীন হবে’। আল্লাহতায়ালা এই আয়াতে মন্দ লোকদের বর্ণনা দিচ্ছেন এভাবে, যারা ভালো লোকদের পর এমনই হয় যে, তারা সালাত হতে বেপরোয়া হয়ে যায়। সালাতের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ফরজকেও তারা ভুলতে বসে–তখন এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, অন্যান্য ফরজগুলোকেও তারা পরোয়া করতে পারে। কেননা সালাত দ্বীনের মূল ভিত্তি এবং সমস্ত আমল হতে এটি উত্তম ও মযার্দাসম্পন্ন। ঐ লোকগুলো তাদের কুপ্রবৃত্তির পেছনে লেগে পড়ে। পার্থিব জীবনে তারা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। কেয়ামতের দিন তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হযরত কাশেম ইবনে মুখাইমিয়া (রহঃ) এই আয়াত হতে বর্ণনা করেন যে, তারা হল ঐ লোক, যারা সঠিক সময়ে সালাত আদায় করে না। যারা সালাত আদায় করে না, তারা তো ঈমানই ত্যাগ করেছে। সালাত সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন, ‘যারা তাদের সালাতে অমনোযোগী’ – সূরা মাউন– আয়াত–৫। হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রহঃ) বলেন, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, ঐ সমস্ত লোকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে যারা আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ বিধান সালাতকে ধারণ করে না। অতএব যেখানে সালাত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেখানে ইসলামিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যেভাবে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ এই স্তম্ভকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেভাবে যদি তা প্রতিষ্ঠা না পায় তাহলে ইসলামি শাসনব্যবস্থা পতনের যে দুয়ার বন্ধ হয়েছে, তা হয়তো আর কোন দিন খুলবে কিনা তার যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
লেখক: সভাপতি, রাউজান ক্লাব; সহযোগী অধ্যাপক (ইএনটি), সংযুক্তি: জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি













