যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর ছয় মাস পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধকে একসময় ছোট্ট অভিযান বলে বর্ণনা করেছিলেন, তা এখন ঘোর অজনপ্রিয় এবং অচলাবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। এমনকি তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। যুদ্ধ অবসানের কোনো সুস্পষ্ট পথও দেখা যাচ্ছে না। খবর বিডিনিউজের।
শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, চার সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত শেষ হবে। কিন্তু পেরিয়ে গেল ছয় মাস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। আরো সামরিক হামলা চালিয়ে যে ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা যাবে না, সেটি এখন দৃশ্যমান এবং যুক্তরাষ্ট্র তা ঠাহর করতে পারছে। তাই ওয়াশিংটন ইরান সরকারকে আরো দুর্বল করতে তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে ফিরছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্রদের জানিয়েছেন, আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম। পরবর্তীতে কী ঘটবে তা স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই যুদ্ধের সম্ভাব্য স্থায়ী পরিণতির অনেকগুলো ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক মূল্য দিচ্ছেন ট্রাম্প : যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে তা অপছন্দের ছিল। ক্রমেই তা আরো অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধের প্রভাবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও নিম্নগামী হয়েছে। সাম্প্রতিক রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, অর্থাৎ মার্কিনিদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জরিপে মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দিয়ে মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকান পার্টির জন্য এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ধাক্কা খেয়েছে : হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়। যুদ্ধের কারণে ইরান এই জলপথ অবরুদ্ধ করে রাখায় তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বিশ্বে মন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। যদিও অর্থনীতিবিদরা প্রথমে যতটা মারাত্মক পরিণতির আশঙ্কা করেছিলেন, সেই তুলনায় ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দুই বার বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। এ বছর ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বড় অর্থনীতির দেশগুলো এখন আগের তুলনায় কম জ্বালানিনির্ভর। তাছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগসহ গতিশীল ব্যয় ও বিনিয়োগ অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হয়েছে।
ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরাজিত হয়নি : ইরানের সামরিক বাহিনী ও অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ইরান এখনো হামলা চালিয়ে যেতে পারছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে।
পশ্চিম এশিয়া আরো অস্থিতিশীল : পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের হুমকি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ উল্টো তেহরানের অবস্থানকে আরো বলিষ্ঠ করেছে এবং গোটা অঞ্চলটিকে আরও অনিরাপদ করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিমান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর ইরানের হামলা এবং লোহিত সাগরে সৌদি আরবের মতো দেশগুলোকে টার্গেট করে ইয়েমেনের হুতিদের অবরোধ মিলিয়ে গোটা অঞ্চলেই পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আরো সময় লাগতে পারে : গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এ বছর ফের দেশ দুটির ইরানে সামরিক হামলার শুরুর দিকে তেহরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং অস্ত্র তৈরির কাজ চলার সন্দেহজনক কয়েকটি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের হামলায় ইরানের কয়েকজন শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করতে ইরানের সর্বোচ্চ ৬ মাস সময় লাগতে পারত। কিন্তু গত মে মাসের মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেই সময় এখন বাড়িয়ে ১ বছর পর্যন্ত ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত : ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে হামলা ও বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে ড্রোন ও বিমান হারিয়েছে। মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংঘাতে ৪২টি মার্কিন সামরিক বিমান ধ্বংস বা নিখোঁজ হয়েছে। তাছাড়া গোলাবারুদ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।











