কবি ইউসুফ জাফর ‘৬৯ থেকে ’৯০ বা এর অব্যবহিত পর পর্যন্ত কবিতায় তাঁর অনুভূতিগুলোকে আঁকতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর কবিতার ভেতর একপ্রকার নিবিষ্টতা আছে। আছে অন্যরকম ভালোলাগা। পরে তিনি ইতিহাস, ঐতিহ্য, মরমী গবেষণা ও মাইজভাণ্ডারী দর্শনের উপর কাজ শুরু করেন। জীবনভর শিক্ষকতার পর সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত হয়েছেন এস.জেড.এইচ.এম ট্রাস্টের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। সে কারণেই তাঁর ‘তোমাকে পাবার জন্য হে সখা’ কাব্যগ্রন্থটি অনেকটা আধ্যাত্মিকতায় ভাস্বর এবং মাইজভাণ্ডারী মরমী দর্শনে নিজেকে নিয়োজিত করায় তাঁর কবিতায় সুফি ভাবধারার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
কবি ইউসুফ জাফরের কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে পাবার জন্য হে সখা’ শিরোনামটিই অনেক বেশি কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক আবহ বহন করছে। নামের মধ্যে প্রেম, সাধনা, নিবেদন ও অন্তর্জাগতিক অনুসন্ধানের সুর আছে। ‘সখা’ শব্দটি গ্রন্থটিকে শুধু রোমান্টিক পরিসরে আটকে রাখছে না; বরং ভক্তি, মানবপ্রেম কিংবা আত্মিক সংলাপের দিকেও প্রসারিত করছে।
প্রচ্ছদের সবুজ প্রকৃতি আর সর্পিল সিঁড়ির সঙ্গে এই নামটি বেশ মানিয়ে গেছে। কবির ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম, শোক, ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক অনুভব সবকিছু কবিতার ভেতরে প্রবাহিত হয়েছে। কবির ভাষার ভঙ্গি আন্তরিক ও সরল, যা পাঠকের সঙ্গে সহজ সংযোগ তৈরি করতে পারে।
এই কাব্যগ্রন্থে চব্বিশটি কবিতা স্থান পেয়েছে। কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘পান থেকে চুন খসলেই’ কবিতাটি সম্পর্কের ভেতরকার টানাপোড়েন আর অতি–স্পর্শকাতর অভিমানের এক তীব্র দলিল। এখানে ‘সখা’ বা প্রিয়জন এতটাই নাজুক অবস্থানে যে ‘পান থেকে চুন খসলে’ই অর্থাৎ সামান্য ত্রুটিতেই সম্পর্ক ভেঙে যায়, চোখ রাঙানি শুরু হয়, ভালোবাসা উবে গিয়ে যুদ্ধের রূপ নেয়। ‘বেহিসেবি আত্মভোলা গবেষকের ব্যস্ত মনন / চোখে মুখে সন্ধানী ভাবনারা অহরহ খেলে’, এই পঙ্ক্তিগুলোতে প্রেমিকের অসহায় আত্মসমর্পণ আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতির বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা স্পষ্ট।
এরপর ‘তুমি কী আমার হবে’ যেন একেবারে বিপরীত মেরুর কবিতা। এখানে কবি সব অভিমান ঝেড়ে ফেলে এক শিশুর মতো সরল আকুতি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রিয়ার সামনে। ‘তোমাকে পাব বলে আমার ভোর হয় নতুন সূর্য রাগে’। এই পঙ্ক্তি দিয়েই কবিতার মূল সুর বাঁধা। সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত লড়াই শুধু একটাই প্রশ্নের উত্তরে গিয়ে থামে; ‘আসলে তুমি কি আমার হবে কখনো?’। কবি নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন। ‘তুমি দূরে বহু দূরে থাকো / আমাকে দেখো’ এই দূরত্ব আর দেখার আর্তিই কবিতাটিকে কাব্যগ্রন্থের কেন্দ্রীয় আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়।
‘তোমাকে পাবার জন্য হে সখা’ শিরোনামে কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতাও আছে। এই কবিতাটিই পুরো কাব্যগ্রন্থের প্রাণভোমরা। আগের দু‘টি কবিতায় সম্পর্কের জটিলতা আর আকুতির ভেতর দিয়ে যে ‘পাওয়ার’ সংগ্রাম দেখেছি, এখানে এসে কবি সেই সংগ্রামের দার্শনিক রূপটি উন্মোচন করেন। ‘সখা’ এখানে বহুমাত্রিক; প্রেমিক, ঈশ্বর, কিংবা জীবনের চূড়ান্ত অর্থ। সকাল থেকে রাত, ভোরের ফোটা থেকে গভীর রাতের বৃষ্টিস্নাত নীলাভ আলো–সময়ের পুরো চক্রটাকেই কবি বেঁধে ফেলেছেন একজনের অপেক্ষায়। ‘যোজন যোজন হেটে সরোবরে পদ্ম তুলি / রূপের বাগানে শিউলি ফুটাই’–এই অতিরঞ্জিত অথচ আবেগঘন আয়োজন প্রমাণ করে, ‘পাওয়া’টা কবির কাছে সাধনার নামান্তর। ‘অবিরত মন্ত্র জপি’, ‘জপ মালা নিয়ে ঘুড়ি’–এসব শব্দে প্রেম আর ভক্তি মিলেমিশে গেছে।
‘তোমাকেই মোহিত করে চলি’ কবিতায় কবি ‘পাওয়ার’ চেষ্টা থেকে একধাপ এগিয়ে ‘মুগ্ধ করার’ ব্রতে নেমেছেন। এখানে প্রেমিক আর ভিখারি নয়, সে একনিষ্ঠ সাধক। ‘অষ্ট প্রহর মঙ্গল শ্লোকে / তোমাকে তুষ্ট করে চলি’, এই পঙ্ক্তিতে প্রেমকে তিনি পূজার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে প্রিয়ই উপাস্য। কবিতার পরিসর বিশাল। কাব্যগ্রন্থের মূল থিমের সঙ্গে এই কবিতা সরাসরি যুক্ত।
‘আমি আর তুমি শুধু রবো’ কবিতায় কবি একান্ত নির্জনতার দিকে হাঁটেন। এখানে আর কোনো উৎসব নেই, কোনো আয়োজন নেই। আছে শুধু রাতের ভার, গোপন টান আর দুজনের পৃথিবীকে ছোট করে আনার তীব্র বাসনা। ‘ইদানীং রাত যত ভারী হয়, / অতি সঙ্গোপনে অলক্ষ্যে সবার / তোমায় তত কাছে পেতে চাই’–এই পঙ্ক্তিগুলোতে শরীরী প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আত্মিক নৈকট্যের আর্তি। ‘তোমাকে পাবার শুদ্ধ মন্ত্রবলে নিজে রত থাকি’ বলে তিনি বুঝিয়ে দেন, এই পাওয়া কোনো সহজলভ্য প্রাপ্তি নয়, এ এক ধ্যান। সবশেষে ‘আমি আর তুমি শুধু / রবো এক সাথে একাত্ম / জন্ম জন্মান্তরে‘-এই শপথ কবিতাটিকে প্রেম থেকে উত্তীর্ণ করে চিরন্তন মিলনের মন্ত্রে।
‘তোমার পরম বন্ধুর সাথী হয়ে‘ কবিতায় কবি এক চরম আত্মত্যাগের প্রস্তাব নিয়ে হাজির। এখানে প্রেমিক বুঝে গেছে, সরাসরি পথে প্রিয়কে পাওয়া সম্ভব নয়। ‘আমার সমস্ত আয়োজন বিফলে যায় / যখন তুমি উজান স্রোতে ভাসাও শরীর’–এই উপলব্ধি থেকেই কবি কৌশল পাল্টান। ‘তুমি কী জেনেছো ভালোবাসা কারে কয়‘-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, ভালোবাসা মানে শুধু উজাড় করে দেওয়া নয়, প্রয়োজনে নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দেওয়াও। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন ‘ তোমার পরম সুহৃদ যে জন, / সাথে তার–পাড়ি দেব এ মহাসাগর’। অর্থাৎ প্রিয়ের সবচেয়ে কাছের মানুষটির সঙ্গী হয়েও, নিজেকে ‘অপরূপ‘ করে সাজিয়েও, শেষমেশ তিনি ‘তোমায় পাব বলে / একান্ত আমার করে’ নিতে চান। ‘তোমাকে পাবার জন্য হে সখা’ বইয়ের মূল দ্বন্দ্বটা এখানে স্পষ্ট। ‘ফেলবে কী অতল জলে / বন্ধু প্রিয়ে’–এই খোলা প্রশ্নে কবিতা শেষ হয় পাঠককে একটা নৈতিক উৎকণ্ঠায় রেখে।
‘তোমাকে পাবার জন্য হে সখা’ কাব্যগ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন রুবেল চৌধুরী। শব্দাঞ্জলি থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটির বহুল প্রচার ও পঠন কামনা করছি।
লেখক: শিশুসাহিত্যিক, গীতিকার।












