আসুন, নিজেদের অন্তরের অশুভকেও বিনাশ করি

সিঞ্চন ভৌমিক | শুক্রবার , ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

দেবী দুর্গার আগমনী বার্তায় স্মরণে আসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার পঙ্‌ক্তি “বুক–ভরা–মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে / মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।” ‘মা’ শব্দটির প্রতি মানুষের চিরন্তন ভালোবাসা, আবেগ ও মমত্ববোধ এখানে গভীরভাবে প্রকাশিত। মায়ের প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসা মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুভূতি।

অন্যদিকে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিজয়া’ নাটিকার পঞ্চম গানে লিখেছেন “খড়ের প্রতিমা পূজিস রে তোরা, মাকে ত’ তোরা পূজিসনে।” কবির এই উচ্চারণে রয়েছে গভীর মানবিক বার্তা। মাটির প্রতিমাকে পূজা করলেও জীবন্ত মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ব পালনে আমরা অনেক সময় ব্যর্থ হই। অথচ প্রতিটি মায়ের মধ্যেই মাতৃশক্তির প্রকাশ। তাই প্রতিমার সামনে ধূপ–দীপ জ্বালানোর পাশাপাশি জীবন্ত মায়ের সেবা, যত্ন ও সম্মান নিশ্চিত করাও প্রকৃত মাতৃভক্তির অংশ।

প্রাচীন ঋষিরা দুর্গাপূজার বিভিন্ন আচার–অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমাদের শুধু দেবীর আরাধনা নয়, কর্তব্য, কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতার শিক্ষাও দিয়েছেন। পূজার আগে তর্পণের বিধানে মাতা–পিতা, মাতামহ–মাতামহী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং অগণিত পূর্বপুরুষকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার শিক্ষা রয়েছে। পরিচিত–অপরিচিত, নাম জানা–না–জানা পূর্বপুরুষের উদ্দেশে জল নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা, অতীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতা। এই শিক্ষা পরিবার, সমাজ ও জাতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে গভীর করে। আমার কাছে তাই দেবী দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি পরিবার, প্রকৃতি, পূর্বপুরুষ, কর্তব্যবোধ ও মানবিকতার সমন্বিত জীবনদর্শন। একে বিজ্ঞানসম্মত জীবনচর্চার দৃষ্টিতেও বিবেচনা করা যায়, যদি এর অন্তর্নিহিত নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষাকে আমরা উপলব্ধি করি। এ প্রসঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইনের বহুল প্রচলিত উক্তিটি স্মরণীয় “ ঝপরবহপব রিঃযড়ঁঃ ৎবষরমরড়হ রং ষধসব, ৎবষরমরড়হ রিঃযড়ঁঃ ংপরবহপব রং নষরহফ” অর্থাৎ, ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু, আর বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ।

দেবী দুর্গা অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়, সাহস, ন্যায় ও কল্যাণের প্রতীক। তাঁর পূজার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন প্রতিমায় দেবীকে দেখার পাশাপাশি জীবন্ত মায়ের মধ্যেও মাতৃশক্তির উপস্থিতি অনুভব করি, পূর্বপুরুষকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। দেবী দুর্গার আরাধনার প্রকৃত সার্থকতা শুধু প্রতিমা পূজায় নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ব পালনে। আসুন, অশুভকে জয় করার পাশাপাশি নিজেদের অন্তরের অশুভকে বিনাশ করি, বিভেদ নয় মানবতার বন্ধন সুদৃঢ় করি। আমাদের পূজা হোক জীবনের পূজা, ভক্তি হোক মানবকল্যাণে নিবেদিত; সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠুক বৈষম্যহীন, অসামপ্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআগমনী : শক্তির বোধন ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান
পরবর্তী নিবন্ধসন্তানের নিরাপত্তা, হেদায়াত ও দ্বীনি সফলতার জন্য যে দোয়া করবেন পিতা-মাতা