এসো নীপবনে, ছায়াবিথীতলে এসো, কর স্নান নবধারাজলে…’। এমন আবাহন বরষার প্রথম দিনে না হলেও ভরা বর্ষায় একদমই মানানসই। আষাঢ়ের প্রথম দিনেই যে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হতে হবে এমন কোন কথা নেই! তবু বাদল দিন এলেই সাথে নিয়ে আসে আষাঢ়ের প্রথম দিবসের একটা উন্মাদনা।
বোশেখের কালবৈশাখীর তাণ্ডবে যদিও বৃষ্টি কখনো সখনো তার পরিচয় করাতে আসে, তথাপি আষাঢ়– শ্রাবণ মাস মানেই বৃষ্টির মাস। ভরা বর্ষার মাস। এই ভরা বাদলের আকাশটাকে আমার অভিমানী প্রিয়ার মতো মনে হয়। কখনো কখনো দেখা যায়, দিনের বেলায়ও কুচকুচে কালো বর্ণ আকাশ। ঠিক যেন কোন প্রেয়সী গভীর অভিমানে মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। প্রিয়তম মানুষটার একটু ছোঁয়াতেই যেন এক্ষুণি কেঁদে ভাসাবে! আবার কখনো মনে হয়, ঠিক যেন সদ্য ফোটা পুষ্পপাপড়িতে জমে থাকা টুপটাপ ঝরে পড়া রাতের শিশির। অসাবধানে ছুঁয়ে দিলেই যেন ঝরঝর করে ঝরে পড়বে মাটিতে।
বৈশাখ–জৈষ্ঠ্যের খর রোদে পুড়ে যাওয়া এই তৃষিত মাটি যেন চাতক পাখির মত আকাশপানে চেয়ে থাকে কবে বৃষ্টির ফোঁটায় সে শীতল হবে, আবার কবে গৃহস্থকে ফুলে ফলে ফসলে ভরিয়ে দেবে! চাতক পাখি এই বর্ষার জল খেয়ে পরিতৃপ্ত হবে বলেই নাকি সে সারাবছর জল খায় না। কী অদ্ভূত না! এই বর্ষা মানুষের মনকে যতখানি উদাস করে তুলতে পারে, আর কোনও ঋতুর সেই ক্ষমতা বোধ করি নেই। বরষার রিমঝিম ধারায় কবি মন যতটা আন্দোলিত হয়, ততটা অন্য ঋতুতে কই!
প্রকৃতি যেন তার সবটুকু সবুজকে নিজের আঁচলে লুকিয়ে রাখে বর্ষা এলে সবুজে সাজবে বলে! বাংলার পাহাড়, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ যেদিকে দুচোখ যায় চারিদিকে সবুজের সমারোহ। বৃষ্টির রকমফেরও কি কম? প্রকৃতিকে ভাসিয়ে নিতে, সাজিয়ে দিতে কতরকমভাবে যে চলে তার প্রচেষ্টা! কখনো রিমঝিম, কখনো রুমঝুম, কখনো ঝমঝম, কড়াৎ কড়্, কখনো ইলশেগুঁড়ি এক এক দিন এক একরকম ছন্দ তার ঝরে পড়ার! ঝমঝম বৃষ্টির সাথে ভোজনরসিক বাঙালির রসনাবিলাসের রসায়ন তো অনবদ্য! ঝুম বৃষ্টি হবে, আর বাঙালির পাতে খিচুড়ি বেগুন ভাজা থাকবে না তাও কি হয়? যদিও এই বর্ষা ভোগায়ও বেশ! খুব বলতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে, ‘বরষা তুমি ঝরোনাকো অমন জোরে…’ কারণ? সে যে দুকুল প্লাবনী বরষা। কখন কোন রাস্তায় পানি হয়ে মানুষের দুর্ভোগ ঘটায়, কোথায় নদীর পানি বিপদসীমা ছাড়িয়ে বন্যা হয়ে আছড়ে পড়ে, কার ঘর বাড়ি ভিটে মাটি নদীর অতলে তলিয়ে যায় তার তো আর ভরসা নেই! বর্ষা ঋতু এক উদাসী, মায়াবী আর অতীতের স্মৃতিজাগানিয়া এক ঋতু। একেবারে কাঠ হৃদয়ের মানুষকেও সজলতায় ভরিয়ে দেয়ার এক অসামান্য ক্ষমতা আছে এই ঋতুর। কাজপাগল মানুষও কখনো কখনো তার শৈশবের কাদামাখা গ্রামীণ মেঠোপথে হারিয়ে যায় বৃষ্টির মোহন শব্দে। রোবটের মত মানসিকতার মানুষের হৃদয়ও ছোটবেলাকার বন্ধুদের সাথে কাটানো বর্ষাস্মৃতিতে দ্রবীভূত হওয়া মনকে আটকাতে পারে না। তার মনও হয়তো ব্যাকুল হয়ে গেয়ে ওঠে ‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়’!
আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন। এই বাদলা দিনগুলো স্বস্তির বৃষ্টির সজলতায় ভরিয়ে দিক বাংলা মাকে। কোন মানুষের যেন রুটি রুজি বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে না হয়, কারো গরু ছাগল ঘর বাড়ি ভেসে গিয়ে তাদের চোখ যেন অশ্রুসজল না হয়, বর্ষা যেন কারো ঘরেই ধ্বংসতাণ্ডব বয়ে নিয়ে না আসে।
বরিষ ধারা শান্তির বারি হয়ে পৌঁছে যাক গৃহ থেকে গৃহান্তরে, মাঠে ঘাটে, খালে বিলে। বাংলা মায়ের সন্তানেরা যেন মাছে ভাতে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে শান্তিতে বাঁচতে পারে!












