আল মাহমুদ : আধুনিক বাংলা কবিতার অনন্য স্রষ্টা

মুহাম্মদ ইয়াকুব

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ
134

“কোন এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।”

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি উচ্চারণের সাথে সাথে আল মাহমুদের নাম অনিবার্যভাবে চলে আসে। সমালোচকদের বক্তব্য মোতাবেক ‘সোনালী কাবিন’, ‘কালের কলস’, ‘লোক-লোকান্তর’ এর পর যদি মায়াবী পর্দা দোলে নাও ওঠতো, যদি নতুন কোন কবিতা না লিখতেন অথবা সাহিত্যের অন্য কোন শাখায় পদার্পণ না করতেন, তবুও আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে সর্বকালের সেরা সাহিত্যিকদের তালিকায় প্রথম শ্রেণিতে থাকতেন।
সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ সালে। মাত্র ১৮ বছর বয়স থেকে তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস, সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৬৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে কবি আল মাহমুদ ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ প্রাপ্ত হয়েছেন।
কবি আল মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধকালে কলকাতা গমনের পর বেশ কিছুদিন খোঁজ পাওয়া না গেলে ১৯৭১ সালে কবি আল মাহমুদের সন্ধান চেয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ঘোষণা পাঠ করেন ভারতের বিখ্যাত বেতার উপস্থাপক দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক জনপ্রিয় বিবেচিত হওয়ায় তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থের সমন্বয়ে কলকাতার বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয় – আল মাহমুদের কবিতা। স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সরকার বিরোধী জাসদের পত্রিকা ‘গণকণ্ঠ’ সম্পাদনার দায়ে আল মাহমুদ প্রায় এক বছর কারাভোগ করেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিদের খুবই ভালোবাসতেন। তিনি কবি আল মাহমুদকে শিল্পকলায় চাকরী দেবার ইচ্ছা পোষণ করলে একজন ব্যক্তি আল মাহমুদের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্ন তোলেন। বঙ্গবন্ধু ঐ ব্যক্তির উপর ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “কবিদের কোন ডিগ্রি লাগে না”। জেল হতে মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু কবি আল মাহমুদকে ডেকে পাঠান এবং শিল্পকলা একাডেমিতে চাকুরী গ্রহণ করতে আদেশ দেন। কবি সাংবাদিকতা পেশায় ফিরার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও বঙ্গবন্ধুর আদেশ অমান্য করতে পারেননি। দীর্ঘদিন চাকুরী করে ১৯৯৩ সালে শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তাঁর প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’।
কবি আহসান হাবীবের হাতে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে লোকজ উপাদান ব্যবহারের সূচনা হলেও এতে ব্যাপকতা দান করে পূর্ণতা দিয়েছেন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। আধুনিক কবিতায় স্বতস্ফূর্তভাবে বিদেশি ও আঞ্চলিক শব্দের সফল প্রয়োগকারী কবি আল মাহমুদ লোকজ উপাদান ব্যবহারে অদ্বিতীয়। আধুনিক শহর নির্ভর কবিতা হতে বের হয়ে এসে তিনি সৃষ্টি করেছেন আধুনিক পল্লী নির্ভর কবিতা। তাঁর কবিতার পরতে পরতে ফুটে উঠে পল্লী বাংলার বিচিত্র রূপ,-
“কতদূর এগোলো মানুষ
কিন্তু আমি ঘোঁরলাগা বর্ষণের মাঝে
আজও উবু হয়ে আছি। ক্ষীরের মতোন গাড় মাটির নরমে
কোমল ধানের চারা রুয়ে দিতে গিয়ে
ভাবলাম, এ-মৃত্তিকা প্রিয়তমা কিষাণী আমার
বিলের জমির মতো জলসিক্ত সুখদ লজ্জায়
যে নারী উদাম করে তার সর্ব উর্বর আধার।” (সোনালী কাবিন)
“শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতেরা উঠিয়েছে হাত
হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাঁদের পোষাকে এসো এঁটে দিই বীরের তকোমা।” এমন সাহসী উচ্চারণ আর কজন কবিই-বা করতে পারে! এখানেই থেমে থাকেননি সোনালী কাবিনের কবি। সাথে সাথে উচ্চারণ করেছেন সাম্যবাদের চূড়ান্ত ইশতেহার। সমাজের স্তরে স্তরে থরে থরে সাজানো বৈষম্যের প্রাচীর গুড়িয়ে দেবার প্রয়াসে লিখেছেন, “আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।”
মানবধর্মের এমন জয়গান যে কবি গাইতে পারেন তাঁর উচ্চতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশই নেই।
আল মাহমুদের কবিতায় দ্রোহ বা প্রতিবাদের বাণীও উচ্চারিত হয়েছে উচ্চকণ্ঠে। সিনিয়র কবিগণের সমালোচনা সাধারণত জুনিয়র কবিগণ করেন না বা করার সাহস পান না। সেই ক্ষেত্রে আল মাহমুদ কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। পূর্বসূরি কবিগণের দরবারি তোষামুদের বিপক্ষে দৃঢ়হস্তে কলম চালিয়েছেন। যুগে যুগে ছিল দরবারি কবিদের ব্যাপক প্রভাব। দরবারি তোষণকারী পদলেহনকারী কবিদের প্রতি প্রচণ্ডঘৃণা জানিয়ে আল মাহমুদের কঠোর বাক্যবাণ,-
“পূর্ব পুরুষেরা কবে ছিল কোন সম্রাটের দাস
বিবেক বিক্রি করে বানাতেন বাক্যের খোঁয়াড়
সেই অপবাদে আজও ফুঁসে উঠে বঙ্গের বাতাস
মুখ ঢাকে আলাওল-রোসাঙ্গের অশ্বের সোয়ার।” প্রসঙ্গতঃ বাংলা সাহিত্যে আরকানকে রোসাঙ্গ বলা হয়। সোনালী কাবিনে পূর্ব পুরুষদের সমালোচনার পাশাপাশি সাহসের প্রশংসাও করেছেন। পূর্ব পুরুষদের গৌরবময় সাহসিকতা ক্রমে বিলুপ্ত হওয়ায় উদ্বেগও প্রকাশিত হয়েছে। “সাহসের সমাচার” শিরোনামে নজরুলকে নিবেদিত কবিতায় লিখেছেন,
“সাহসের সমাচার শেষ হয়ে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমেহে কবি, একদা ভেসে যেতে যেতে কালো তোমার চুলের মতো মেঘ
বড়ো অনুরোধ করে রক্তের ওপারে যেতে প্ররোচনা দিতো
কারাগার ভেদ করে দাঁড়াতো দণ্ডিত।”
শিশু সাহিত্যে কবি আল মাহমুদের তুলনা তিনি নিজেই। কবি লিখছেন,-
“আম্মা বলেন পড়রে সোনা
আব্বা বলেন মন দে,
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে।”সহ অসংখ্য শিশুতোষ।
উপমা প্রয়োগে আল মাহমুদ অনন্য। শিশুতোষ কবিতায়ও আল মাহমুদ চমৎকার উপমার প্রয়োগ করে লিখেছেন,-
“নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মত চাঁদ ওঠেছে ঠাণ্ডা ও গোলগাল।”
ভাষা সৈনিক কবি আল মাহমুদ ভাষাশহিদের রক্তের সুদূর প্রসারী গন্তব্য ও রক্তপ্রবাহের তীব্রতা চমৎকারভাবে বর্ণণা করেছেন,-
“ফেব্রুয়ারী ২১ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথা বরকতের রক্ত।”
লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া, অদৃশ্যবাদীদের রান্নাবান্না, অষ গধযসঁফ ওহ ঊহমষরংয, দিনযাপন, দ্বিতীয় ভাঙ্গন, একটি পাখি লেজ ঝোলা, পাখির কাছে ফুলের কাছে, পানকৌড়ির রক্ত, গন্ধ বণিক, ময়ূরীর মুখ, না কোন শূন্যতা মানি না, নদীর ভেতরের নদী, প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা, প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা, প্রেমের কবিতা সমগ্র, উপমহাদেশ, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ, উড়াল কাব্য, জলবেশ্যাসহ আল মাহমুদের অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবি আল মাহমুদের জলবেশ্য ছোটগল্প অবলম্বনে ভারতে নির্মিত হয়েছে অসাধারণ একটি চলচিত্র। চলচিত্রটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেতে সক্ষম হয়েছে। ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশনী কবির সমগ্র সাহিত্যকর্ম ১১ খণ্ডে প্রকাশ করেছে।
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিই নন, তিনি একাধারে একজন কিংবদন্তী ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। কবি আল মাহমুদ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখ লোক লোকান্তরে চলে গেলেও কালের কলস হয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

x